বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে উত্তপ্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম উপাচার্যের দায়িত্ব নিচ্ছেন অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক। তিনি তার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন দেশ রূপান্তরের কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি প্রতীক ইজাজ
দেশ রূপান্তর: বর্তমান উপাচার্যের (ভিসি) বিগত সময়ে নিয়োগ, পদোন্নতিসহ বেশ কিছু বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ এনে কয়েক দিন ধরেই পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত। বিড়ম্বনার মুখেই বর্তমান ভিসিকে বিদায় নিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক: এখানে প্রথম উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ডা. এম এ কাদেরী স্যার। তারপর এসেছেন অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, এরপর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। আমি সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাতে চাই বিশ্ববিদ্যালয়কে এই পর্যায়ে আনার জন্য প্রত্যেকের কিছু না কিছু অবদান আছে। প্রত্যেকেই ভালো কাজ করেছেন। হয়তো কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। আমি এগুলোকে এখন ব্যক্তিগতভাবে মূল্যায়ন করতে চাই না। আমি মনে করি, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত করা উচিত নয়। কেউ যদি ভুল করে থাকে, অন্যায় করে থাকে, সেটা অন্য কথা। কিন্তু কোনো চিকিৎসক, কর্মচারী বা কর্মকর্তা, একটা নাজুক পরিবেশ সৃষ্টি করুক, সেটা আমি চাই না। এটা জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। এটার মানসম্মান অনেক বড়।
দেশ রূপান্তর: বিগত সময়ে এখানে নিয়োগ, পদোন্নতি, কেনাকাটা নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে বেশ বিপাকে ও সমালোচনায় পড়তে হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনি কী ভাবছেন?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: আমি আপনার মাধ্যমে সবাইকে বলছি, আমি কোনো দুর্নীতি করব না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না। আমার কোনো ব্যক্তিগত এজেন্ডা থাকবে না। আমি নিয়োগ, ভর্তি ও সেবার কাজে কোনো অনিয়ম করব না। প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার– আমি সেই নীতিতে বিশ্বাস করি। যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষ এখানে নিয়োগ পাবে। একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি সৎ থাকেন, তাহলে ৬০ শতাংশের বেশি কাজ হয়ে গেছে, ধরে নেবেন।
দেশ রূপান্তর: এ প্রতিষ্ঠানে সরকারদলীয় চিকিৎসকরা সবকিছুতেই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, এমন আলোচনা আছে। এসব করতে গিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার খবরও পাওয়া যায়। চিকিৎসাসেবাও বিঘ্নিত হয়। এখানে রাজনীতি নিয়ে আপনার অবস্থান কী হবে?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: প্রত্যেক মানুষ সারাজীবন একটা না একটা নীতি ও আদর্শ নিয়ে থাকে। আমি তো সারাজীবন জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে আছি। কিন্তু আমি যখন চিকিৎসা করি, আমার কাছে সারা দেশের সব মতাদর্শের লোকজনই আসে। চিকিৎসক হিসেবে তখন রাজনীতির কোনো স্থান নেই। আমি যখন উপাচার্য হিসেবে বসব, আমার কাছে দলমত-নির্বিশেষে সবাই সমান। আমার ব্যক্তিগত কোনো গ্রুপ থাকবে না। সবাইকে নিয়েই কাজ করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। আমি মনে করি রাজনীতি করা উচিত হবে না কারও। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই জিনিসটা যেন না হয়।
দেশ রূপান্তর: বিএসএমএমইউর ১২তম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন আপনি। কেমন লাগছে?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: এটা তো আমার কাছে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে মনে হচ্ছে। কারণ দায়িত্বটা আমার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী একটা আশা নিয়ে দায়িত্বটা আমাকে দিয়েছেন। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার জন্য যা যা দরকার, সব করার জন্য আমি আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করব।
দেশ রূপান্তর: সেই চ্যালেঞ্জগুলো কী?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ শিক্ষা, সেবা এবং গবেষণা। এই তিনটা কাজই আমি সঠিকভাবে করার চেষ্টা করব। এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তৈরির কারখানা। এখানে যেন মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি হয় আমার সে চেষ্টা থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু চিকিৎসা দিলেই হবে না। কারণ স্বাস্থ্যের উৎকর্ষে গবেষণা খুবই জরুরি এবং চিকিৎসকদের সেই গবেষণার কাজটা করতে হবে। গবেষণার ব্যাপারে তার যে উৎসাহ, সেটাকে আমরা শক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে কাজ করব।
দেশ রূপান্তর: আগে ছিল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান। এখন সঙ্গে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল যুক্ত হয়েছে। দুটো হাসপাতালে দুই ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা। আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব হাসপাতাল ও ক্যাম্পাস আছে। সেটা যে রকম আছে, সেখানে মানুষ যেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়, সমান সুযোগ পায়, চিকিৎসার মান উন্নয়ন হয়, তার জন্য উদ্যোগ নেব। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল অন্য একটা কনসেপ্ট থেকে তৈরি করা হয়েছে। মানুষ যে বিদেশে যায়, তারা যেন সেই সুপার স্পেশালাইজ সেবাটা এখানে পায়, সেজন্য। এটাকে একটা আলাদা প্রশাসনের মধ্যে রেখে এবং দেশি-বিদেশি ভালো ভালো কনসালট্যান্ট এনে যাতে সর্বোচ্চ চিকিৎসাব্যবস্থা করা যায়, সেটা করব।
দেশ রূপান্তর: এ রকম একটি বড় প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব যখন পেলেন, তখন অনুভূতি কেমন ছিল?
অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ: আপনি জানেন চক্ষুরোগ চিকিৎসায় দেশ-বিদেশে আমার অনেক পরিচিতি রয়েছে। সুনামের বিষয়টি রোগীরা বলবেন। কিন্তু আমার কাছে সর্বস্তরের লোকজনই আসে। আমার ইচ্ছা ছিল, শেষ বয়সে আমি একটু রাজনীতির দিকে যাব। আমার যে দক্ষতা ও জ্ঞান আছে, সেটা যেন আমি দেশের কাজে লাগাতে পারি। আমার এই ইচ্ছের কথা আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম। আমি সেজন্য গত এক বছর এলাকায় প্রচুর কাজ করেছি। প্রচুর মানুষের সেবা দিয়েছি। কিন্তু এটা (উপাচার্য পদ) যে আমাকে দেওয়া হবে, সেটা আমি কখনোই ভাবিনি এবং চিন্তার মধ্যেও ছিল না। এটা ধারণার মধ্যেও ছিল না যে আমি উপাচার্য হব। হঠাৎ করেই মনে হয় আমার কাছে একটা উড়ন্ত খবর এলো, যেন মহান আল্লাহতায়ালা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে একটা ওহি নাজিল করলেন যে এখানে আপনি ভাইস চ্যান্সেলর হচ্ছেন।
