ঈদবাজারে বেনিয়াদের লালসা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০১:০৯ এএম

শিশুকাল থেকে বাবা ছিল না বলে অর্থনৈতিক টানাপড়েন ছিল আমাদের। এক ঈদে আমার বায়না ছিল ‘টেট্রনের’ একটি শার্টের। স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ার ওই সময়টাতে ‘সিনথেটিক’ জাতীয় এই ‘টেট্রনে’ বাজার সয়লাব। মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসারে মাথার ওপর বাবা নামের ছায়াটা সরে গেলে যে অবস্থা হয়, আমাদের ছিল তেমনি। আমার এমন আবদারে মা ভীষণ সংকটে পড়ে যান। অনেক কষ্টে মা শ্যাওলা রঙের একটি শার্ট কিনে দিয়েছিলেন আমাকে। ফুলহাতা শার্টটির তিনকোনা বোতাম ছিল। খুব প্রিয় ছিল বলে শার্টটির কথা এখনো মনে আছে।

ঘটনাটির উল্লেখ এই কারণে, গত ২৪ মার্চ মিরপুরের একটি ‘মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত’ শ্রেণির ‘মার্কেটে’ গিয়েছিলাম কাজে। হ্যাঁ মেগাসিটিতে ভূরি ভূরি ভিন্নমাত্রার ‘মার্কেট’ এখন। কাজের ভেতর হঠাৎ চোখ পড়ল একটি পরিবারের ওপর।

চার-পাঁচ বছরের একটি মিষ্টি ফুটফুটে মেয়ে। একটু মোটাসোটা মায়ের কোলে বছর খানেক বয়সের একটি ছেলে এবং হালকা-পাতলা গড়নের বাবা। পোশাক-আশাক এবং মা-বাবার মলিন চেহারায় খুব সহজেই বুঝে নেওয়া যায়, পরিবারটি নিম্নবিত্ত। চঞ্চল মেয়েটি বেশ একটু সাজুগুজু করে এসেছে। ওর এই সাজুগুজু আর চঞ্চলতাই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। আর এটাও অনুমেয় যে, বাচ্চাদের বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী এবং দুজনেই হয়তো পোশাক কারখানায় কাজ করেন। বাবা-মা একটি দোকানে শাড়ি দেখছিল। কিন্তু মেয়েটি পাশের দোকানে, বাইরে ‘হ্যাঙ্গারে’ ঝোলানো একটি ফুলতোলা লালা রঙের জামার দিকে ছুটে যায়। পাশের দোকান থেকে মেয়েকে দেখে বাবা ছুটে আসেন। মেয়ে তখন ফুলতোলা লাল জামাটা নেবে বলে আহ্লাদী বায়না ধরে। বাবা জামাটার দিকে একপলক চেয়েই মেয়েকে টেনে সরিয়ে আনেন। এর ফাঁকে দোকানির কাছে জামার দামটাও জানতে চান। মুহূর্তেই মুখটা ব্যাজার হয়ে যায় বাবার। মেয়েকে অনেকটা জোর করে সরিয়ে আনেন আর বলেন, এটা বড়দের জন্য মা। আমরা অন্য দোকানে যাই, আসো...। ঘটনাটায় চকিতে আমার শিশুবেলা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় আমার ‘টেট্রনের’ শার্টটির কথা।

এই পুরো বিষয়টির অন্তর্নিহিত সত্য হলো, বাজারে এখন জিনিসপত্রের দরদাম। বলাইবাহুল্য এই  দরদামের শিকার আমরা মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা। শুধু পোশাক-আশাকের বেলায়ই নয়। এমন কিছু নেই যার মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি। শুধু বৃদ্ধি বললে ভুল বলা হবে। সব জিনিসপত্রের দাম এখন আকাশছোঁয়া! করোনা মহামারী, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ নিঃসন্দেহে এর পেছনে একটি কারণ। বাংলাদেশসহ বিশ্বমন্দায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু যখন স্পষ্টতই প্রতীয়মাণ, আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধিতে রয়েছে ‘বেনিয়াদের’ কারসাজি, তখন? সেই সময় আর কারও মুখে কথা ফোটে না! বেনিয়াদের বেলেল্লাপনা কেবল দাঁত কেলিয়ে নির্লজ্জ হাসিতে সমাজ, সরকার, দেশকে বিদ্রুপ করে। যেখানে সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট বেনিয়াদের কারসাজি- যেখানে একটি বাচ্চাও অঙ্গুলি নির্দেশে চিনিয়ে দিতে পারে এই বেনিয়া চক্রকে। সেখানে, মহারথী কিংবা সরকার শুধুই নিজেদের সাধুবাদের গীত গাইবেন, এ-তো বেনিয়াদের এড়িয়ে যাওয়া-ই!

মাসের পর মাস চক্রবৃদ্ধি হারে বেনিয়ারা এই চক্রান্ত করে গেলেও, রোজার মাস ও ঈদকে কেন্দ্র করে এদের লালসা সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে! নিত্যপণ্য কিংবা পোশাক-আশাক বা প্রয়োজনীয় যে কোনো জিনিস-ই এখন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত’র নাগালের বাইরে। কী করবে এইসব মানুষ? তারা এখন দিশেহারা প্রায়। ধর্মপ্রাণ কোনো মানুষ কখনোই এমন গর্হিত, ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে রোজা এলে জিনিসপত্র কত কম দামে দিতে পারে, এর প্রতিযোগিতা চলে। অথচ আমাদের দেশে? কোথায় সেই বকধার্মিক, ধর্ম ব্যবসায়ীরা? আরব দেশের কোনো মানুষ যদি একটি ‘কাশি’ দেয় তো আমাদের এই বক ধার্মিকদের তখন কুঁতিয়ে-প্যাঁদিয়ে দশটি ‘কাশি’ দিতে প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখি। এখন কোথায় তারা? দৃশ্যত একটি বারও কি এদের আমরা দাম বৃদ্ধি নিয়ে একটি টুঁ শব্দ করতে দেখি? দেখি কি দাম বৃদ্ধি নিয়ে কোনো ‘ওয়াজ-নসিহত’ করতে?

শুধুমাত্র ধর্ম ব্যবসায়ীরা নয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকেই এই বেনিয়া চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে সম্মিলিতভাবে কোনো কোনো জিনিস বর্জনও করতে হবে। বিশেষ করে পচনশীল জিনিস, যেমন পেঁয়াজ, অন্যান্য কাঁচামালের যদি মাত্রাতিরিক্ত দাম বৃদ্ধি পায় তো সাময়িকভাবে এসব জিনিস বর্জন করা যেতে পারে। শুধুই সরকারের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে বসে থাকলে হবে না।

তবে অতি-অবশ্যই সরকারের দায়টা সবচেয়ে বেশি। সরকারকে বেনিয়াদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। এই সরকার দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এ সত্য যেমন মানতে দ্বিধা নেই, তেমনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে বেনিয়া চক্রের বিরুদ্ধে সরকারি কোনো পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়, এ সত্যও আমাদের মানতে হচ্ছে। জনগণ-ই গণতন্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়। জনগণের জন্য সরকারকে অনেক কিছু করতে হয়।  তা যদি হয় গণতন্ত্রের বাইরে তা-ও। দেশের বেনিয়া চক্র গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছে। সরকারকে তাই গণতন্ত্রের বাইরে গিয়ে প্রয়োজনে বেনিয়াদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটা জনগণের চাওয়া, সময়ের দাবি। অনতিবিলম্বে একটি ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে এই বেনিয়া চক্রকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এর ফলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বরং সরকারের পাশেই থাকবে। আর এতে করে যদি সরকারের আঁতে ঘা লাগে, তাহলে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া হবে নিশ্চিত। বিষয়টি কোনোভাবেই আমরা চাই না। আমাদের চাওয়া সরাসরি, এই মুনাফাখোরদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে স্বস্তিতে রাখতে হবে। এটাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। জনগণই দেশ, জনগণই সরকার- এটা যেন কর্তাব্যক্তিরা ভুলে না যান।

কদিন বাদেই ঈদ। মানুষের প্রাণান্তকর চেষ্টা ঈদকে রাঙিয়ে তোলার। কিন্তু মানুষের সাধ বেনিয়াদের উল্লম্ফনে মুখ থুবড়ে পড়ে, সাধ্যে পৌঁছায় না। এই চক্রটিকে ‘বেনিয়া’ বলতে বেশ লাগছে। অসাধু ব্যবসায়ী বললে একটু ‘ভদ্রোচিত’ বলে ধারণা করি। ‘বেনিয়া’তে সামান্য হলেও ঘৃণার মিশ্রণ আছে, আমার অভিমত। আসলে কতটা ঘৃণা দিয়ে কী শব্দে এই বেনিয়াদের সম্বোধন করা যায়, ঠাওর করতে পারছি না। তাই ‘বেনিয়া বেলেল্লাপনা’-ই আমার কাছে যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়েছে। বলছিলাম ঈদের কথা। ঈদ আনন্দের কথা। কিছুদিন আগেও মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতার সমন্বয় ছিল বলা যেতে পারে। কিন্তু বেনিয়াদের চক্রান্তে এখন দিন চলছে ‘কায়ক্লেশে’। কেউ না খেয়ে নেই। কেউ উদোম নেই। কেউ জোড়াতালির কাপড়ও পরে না। তার অর্থ এই নয়, আমরা খুব ভালো আছি, আনন্দ-সুখে আছি। কিন্তু আমরা চাই। এই আনন্দ-সুখটা চাই। ঈদে ওই ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটি বাবাকে নিয়ে গিয়ে সেই ফুলতোলা লাল জামাটা কিনে নিয়ে আসুক। চাই আনন্দ খুশিতে ‘ডগোমগো’ ছোট্ট মেয়েটি ধেইধেই করে নাচুক। সেই মা যে শাড়িটি হাতিয়ে দেখে দীর্ঘশ্বাসে দোকানে রেখে এসেছে, চাই সেই শাড়িটি গায়ে জড়িয়ে ঈদের আনন্দ পরশ আর স্বামীর সোহাগের অপূর্ব ছোঁয়াটুকু পাক। এইটুকু চাওয়া শুধুই বেনিয়াদের লালসায় পূর্ণতা পাবে না, তা কী করে মেনে নেওয়া যায়? মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তর জীবন আঙুলের কড়ায় কিংবা ‘ক্যালকুলেটর’-এর জটিল, কুটিল হিসাবে চলে না। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন চলে সহজ-সরল রেখায়। চলে বহতা নদীর মতো। বেনিয়াদের শ্যেনদৃষ্টি কি এই সরলতাকে রুখে দেবে?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত