গোলাপ ও আগুন

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০২:০৩ এএম

লাতিন আমেরিকার বুম সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক, জাদুবাস্তবতার অন্যতম প্রবক্তা হলেন আলেহ কার্পেন্তিয়ের (১৯০২-১৯৮০)। ষাটের দশকে একদল দুঃসাহসিক ঔপন্যাসিক গদ্যিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটান। তাদের সামষ্টিক অভ্যুত্থান ‘বুম’ (Latin American Boom) নামে সমধিক পরিচিত।

বলিষ্ঠ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে বৈষম্য ও সামাজিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আস্তুরিয়াসের মতো আলেহ কার্পেন্তিয়ের (মাত্র একুশ বছর বয়সে) নিজের দেশ কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক আদলে গড়ার লক্ষ্যে রাজনীতিতে জড়ান এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য জেলে যান।

সপ্তদশ শতকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে প্রায় আট লাখ মানুষ হাইতিতে ধরে এনে দাস বানিয়ে খামারে ও খনিতে কলুর বলদের মতো খাটানো হয়। উল্লেখ্য, সিলেট-মৌলভীবাজারের চা শ্রমিকদেরও একই ইতিহাস। ১৭৯১ সালের ২২ আগস্ট হাইতির দাসেরা তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং গোটা উপনিবেশ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ১৮০৪ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তা শেষ হয়। ফরাসি উপনিবেশে ক্রীতদাসদের স্বাধীনতা লাভের জন্য যে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়, তা হাইতি বিপ্লব নামে পরিচিত। বিপ্লবকালে ক্রীতদাসদের বন্ধন মুক্তির এই ঐতিহাসিক ঘটনাবলম্বনে আলেহ কার্পেন্তিয়ের লেখেন তার সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘এই জগতের রাজত্ব।’ পৃথিবীতে এটিই একমাত্র দাস বিদ্রোহ, যার মাধ্যমে দাসেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সারা পৃথিবীর দাসপ্রথা উচ্ছেদে অনুপ্রেরণা জোগায়।

‘এই জগতের রাজত্ব’ উপন্যাসে বিদ্রোহের প্রথমে নেতৃত্ব দেয় ক্রীতদাস মাকান্দাল। সে কাজ করত মঁসিয়ে মেজির খামারে। আকস্মিক এক দুর্ঘটনায় একটি হাত হারায় এবং অক্ষম বলে গুরুত্বহীন হয়ে যায়। তার উধাও হয়ে যাওয়া কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না মালিকের মনে। অন্য নিগ্রোদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য গঠন করা হয় তল্লাশি দল, তবে তারা নির্বিকার থাকে। কারণ, ‘সব মাদিংগাই (অবাধ্য, একগুঁয়ে, বিদ্রোহী, শয়তান) নিজের ভেতর লালন করে এক দুর্বিনীত পলায়নাকাক্সক্ষী জন্তু।’ একসময় মাকান্দাল নানারকম ভেষজ গবেষণা করে বিষ আবিষ্কার করে। তি নোয়েলসহ বেশ কিছু ক্রীতদাসকে নিয়ে কৌশলে খোঁয়াড়ে বিষ দিয়ে পশুহত্যার মধ্যে দিয়ে শুরু হওয়া বিদ্রোহ ক্রমে খামার মালিকদের অন্দরে ঢুকে পড়ে। লক্ষ্য ছিল সাদাদের নির্মূল করে স্বাধীন নিগ্রোদের রাজত্ব কায়েম করা। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টার পর বিষের উৎস জানতে পারে এবং এর নেপথ্যে থাকা মাকান্দাল শিকার করার জন্য ‘সবুজ মাংসের দুর্গন্ধ, অর্ধপোড়া খুর, কর্মরত কীটের দখলের সমভূমি ভরে উঠল ডালকুত্তার ডাক ও খিস্তিখেউড়ে।’ অবশ্য তাকে তখন ধরা যায় না। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আবার মৌজ-মাস্তিতে মেতে ওঠে খামার মালিক দল।

অন্যদিকে দাসদের কাছে মাকান্দাল ততদিনে প্রায় রূপকথার চরিত্র। চার বছর পর জাদু-জগৎ থেকে বাস্তবের জমিতে আবির্ভূত হয় মাকান্দাল, এবার সে ধরা পড়ে, তার হত্যার আয়োজন করা হয় অসংখ্য ক্রীতদাসের সামনে। বিদ্রোহের শাস্তি সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মাকান্দালকে। ‘দশজন সৈন্য মাকান্দালকে ধরে মাথা গুঁজে দিয়েছে জ্বলন্ত আগুনে চুলে আগুন ধরা এক লেলিহান শিখা চাপা দেয় ওর শেষ চিৎকার।’ কয়েকজন কেবল প্রকৃত ঘটনাটা দেখতে পায়, বাকিদের কল্পনায় মাকান্দাল বাস্তবের বধ্যভূমি থেকে যেন রহস্যের রাজ্যে মিলিয়ে যায়।

পৃথিবীর পুঁজিপতিরা মূলত ভোগী। পুঁজির কাছে সুকুমারবৃত্তি থেকে শুরু করে নারী মাত্রই খেলনা। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান, ক্ষমতাধর বসদের স্বেচ্ছাচার ও নারী লোলুপতা সীমাহীন। তেমনই, ‘মঁসিয়ে লেনরম দ্য মেজি হয়ে উঠেছে মাতাল ও বায়ুগ্রস্ত। সারাক্ষণই এক ক্রনিক রতি-কামনায় ভোগে সে, অল্পবয়সী ক্রীতদাস মেয়েদের গায়ের রঙ ও গন্ধ ওকে পাগল করে তোলে।’ তবে তি নোয়েলরা তাদের সন্তানদের কাছে পৌঁছে দেয় মাকান্দালের বিদ্রোহের আখ্যান। এ সময় ক্রীতদাসদের মুক্তিদূত হিসেবে এগিয়ে আসে বুকমান। সে বলে, ‘আমাদের ঈশ্বর চান যেন প্রতিশোধ নিই। আমাদের অশ্রুপিপাসু সাদাদের ঈশ্বরের প্রতিমা ভেঙে ফেল, নিজেদের ভেতরেই যেন শুনি মুক্তির আহ্বান।’ অতর্কিত সমবেত আক্রমণে শত শত শ্বেতাঙ্গকে কচুকাটা করা হয়। নিগ্রোদের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত দমন করে জোতদার শ্বেতাঙ্গরা। যেখানে মাকান্দালকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানেই হত্যা করা হয় বুকমানকেও।

হাইতি স্বাধীন হলে অঁরি ক্রিস্তফ রাজা হয়। চালু হয় নতুন ধরনের দাসত্ব। স্বেচ্ছাশ্রম বাধ্যতামূলক করা হয়। শ্রমিকরা বন্দি হয় নতুন শ্রমদাসত্বের নিগড়ে। শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বদলে কালো আফ্রিকানরাই স্বজাতিদের সামনে চাবুক হাতে দাঁড়িয়ে যায়। ক্রিস্তফের শোচনীয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বিশৃঙ্খলার সূত্র ধরে আবার যে নতুন শাসকরা এলো, তাদের হাতেও তি নোয়েল দেখল সেই চাবুক, সেই দাসত্বের শৃঙ্খল, সেই নিষ্পেষণ।

‘এই জগতের রাজত্ব’র তি নোয়েল, দাসবিদ্রোহী মাকান্দাল, অঁরি ক্রিস্তফ, বুকমান, দাস মালিক পুরুষ চরিত্রই বেশি, একমাত্র উজ্জ্বল নারী চরিত্র পাউলিনা বোনোপার্ট যৌনতা তথা ধর্ষণের ভয়াবহতা দেখানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সলিমনকে নিয়ে পাউলিনার মাধ্যমে প্রেমময় যৌনতা উপন্যাসে যথার্থভাবে এসেছে। আলেহ কার্পেন্তিয়ের দাস বিদ্রোহের একমুখী মেদহীন বর্ণনার পাশাপাশি করুণ পরিণতিকে বাক্সময় করে তুলেছেন আখ্যানে। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে শোষণ-শাসনের রূপও বদলায়, কিন্তু শেষ হয় না উপন্যাসে এই দর্শনের গভীর অভিব্যক্তি ফল্গুধারার মতো বহমান। দাসবিদ্রোহের উত্থান, দাসদের সিংহাসন আরোহণ এবং দাসরাই ফের নিষ্ঠুর শাসকরূপে অবতীর্ণ হয়।

হোর্হে লুইস বোর্হেসের পাশাপাশি জাদুবাস্তবতার অন্যতম উৎস হলো আলেহ কার্পেন্তিয়েরের আখ্যান, ‘এই জগতের রাজত্ব’র মতো ধ্রুপদি উপন্যাস। লাতিন আমেরিকার নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিস্ময় ও বাস্তব, আদিম কল্পনা আর ঐতিহাসিক সময়কে যুগপৎ মিথস্ক্রিয়া ঘটানোয় লেখকের জুড়ি মেলা ভার। ন্যারেটিভ রীতির অভিনবত্বের কারণে বিশ্বসাহিত্যে এবং নতুন লেখকদের কাছে এক পরম আশ্রয় ও বিস্ময়ের নাম আলেহ কার্পেন্তিয়ের।

আলেহ কার্পেন্তিয়েরের ‘এই জগতের রাজত্ব’ স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন হালের অন্যতম দক্ষ, অভিজ্ঞ, পরিশ্রমী অনুবাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুজজামান। উপন্যাসটি পড়ার সময় বারবার গোলাপবাগান ও আগ্নেয়গিরির দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। এমনই এর শিল্পসৌন্দর্য ও সময়োপযোগিতা, যা যুগে যুগে সমকালীন, চিরকালীনও বলা যায়। বলিষ্ঠ ভাষা, শব্দচয়ন, বাক্যনির্মাণে মুন্সিয়ানা, বিষয় ও নান্দনিকতার গভীরে অনুধ্যান করে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির একটা মাস্টারপিসকে নিজস্ব সংস্কৃতির মঞ্চে সর্বাত্মক সুন্দর ও সুচারুভাবে হাজির করার জন্য পাঠক ও লেখক মহলের পক্ষ থেকে আপনাকে টুপি খোলা অভিবাদন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত