কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪২ এএম

পবিত্র রমজানের ২০তম দিন আজ। রমজানের রহমত ও মাগফিরাতের দিনগুলো পেরিয়ে কাল থেকে শুরু হবে নাজাতের ১০ দিন। রমজানের দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ায় রোজার বিদায়ী আবহ সৃষ্টি হচ্ছে, অনুভূত হচ্ছে ঈদের আমেজ। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এই খুশিতে যেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিতে পারে, সে জন্য ইসলাম যেমন সদকাতুল ফিতর, জাকাত ও দান-খয়রাতের বিধান দিয়েছে, তেমনি ঈদ আনন্দের উপলক্ষ বানিয়ে মানুষের দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বাভাবিক নিয়মে শ্রমিকরা কাজ করে বেতন-বোনাসসহ তার প্রাপ্য তিনি লাভ করবেন, এটা তার অধিকার। সেখানে কোনো ধরনের টালবাহানা, দেনদরবার, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ছলচাতুরী কাম্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা যেন সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবরে প্রকাশ, ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার আগেই তৈরি পোশাকসহ সব খাতের শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধ করতে মালিকপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি এই নির্দেশই প্রমাণ করে, ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়; যেমনটা আমরা অতীতে দেখেছি।

মনে রাখতে হবে, দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে বিপুলসংখ্যক মানুষ। খুবই স্বল্পসংখ্যক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থবৃত্ত। ঈদের সর্বজনীনতার পথে এই বৈষম্য পথের কাঁটা। সেটাকে দূর করতে হবে সহানুভূতির চর্চা এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার মধ্য দিয়ে। ঈদের সময় বিভিন্ন সেক্টরের প্রচুর শ্রমজীবী মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার বেতন-বোনাস থেকে বঞ্চিত থাকেন; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রমজান সহমর্মিতার মাস। এ মাসে নিজের অধীন ও কর্মচারীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো মুমিন বান্দার দায়িত্ব ও কর্তব্য। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের পার্থিব কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন।’ সহিহ মুসলিম : ৭০২৮

এ ছাড়া রোজাদারের প্রতি সম্মান ও রমজানে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গৃহকর্মীদের প্রতি সদয় ও সদাচারের দাবি হলো, তার কাজ কমিয়ে দিয়ে পারিশ্রমিক বেশি দেওয়া। তাহলেই আপনি সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের অধীনদের কাজের চাপ কমিয়ে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।’-শোয়াবুল ইমান : ৩৩৩৬

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকরা মালিকের পরিবারভুক্ত। ইসলাম শ্রমিককে ‘ভাই’ স্বীকৃতি দিয়ে তার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে বলেছে। হাদিসের আলোকে ‘অধীন’ যে কেউ ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য। সেই সঙ্গে শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকের। আর বেতন ও পারিশ্রমিক কর্মজীবীর অধিকার, ইসলাম দ্রুততম সময়ে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩০

শ্রমিককে বেতন-ভাতা ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ভয়ংকর অপরাধ। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপক্ষে থাকব। ...আর একজন সে, যে কাউকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার পর তা থেকে কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ তার প্রাপ্য দেয়নি।’ সহিহ বোখারি : ২২২৭

ইসলাম সাধারণভাবেই দুর্দিনে অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আর অসহায় ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হয় তার সেবাদানকারী শ্রমিক, তবে এই দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) মালিকপক্ষকে শ্রমিকের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছেন। শ্রমিক ঠকানো ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম পাপ। ইসলামের নির্দেশনা হলো, শ্রমিক তার প্রাপ্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হলেও মালিক তাকে প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবেন। অথচ বর্তমানে অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হয়। নবী কারিম (সা.) এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোরজবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সেই জাতি কখনো পবিত্র হতে পারে না।’ ইবনে মাজাহ : ২৪২৬

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত