সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

যে করে ‘জবরদস্তি’ সে হয় বিজয়ী

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৮ এএম

এক সমীক্ষা বলছে ছোটবেলায় যে অন্যদের পীড়ন করে পেশার ক্ষেত্রে সে সফল হয়। তবে এ ব্যবস্থা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত। যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ, ভূমে রণিবে না’। যদিও বিদ্রোহী কবির এ প্রত্যাশা পূরণ হয়নি পৃথিবীতে আজও। বরং উল্টো ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা সমাজে উৎপীড়ন চালায়, মাস্তানি করে, অন্যকে দমন করতে চায় শেষ পর্যন্ত তারা বিজয়ী হয়। শুধু সামাজিকভাবে নয়, করপোরেট পদে এমনকি রাজনীতিতেও তাদের বিজয় ঘটে।

এ প্রসঙ্গে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য গার্ডিয়ান। যাতে বলা হয়, যারা স্কুলে উৎপীড়ন চালায় (বুলি) এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করে তাদের কর্মক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনা বেশি। তারা কর্মজীবনে ভালো চাকরি পায় এবং বেশি উপার্জন করে। গবেষকরা দাবি করছেন, উৎপীড়ন এবং আধিপত্যবাদী আচরণের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পদ পাওয়ার যোগসূত্র নিঃসন্দেহে অনেকের চিন্তায় একটি ধাক্কা দেবে।

তবে এর প্রতিবাদ করে একটি নিবন্ধ লিখেছেন জর্জ মনবিওট। তিনি গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। তার ভাষ্যে, পৃথিবীর সব দেশে খেলার মাঠের মতো শিক্ষা, সামাজিকতা, রাজনীতি, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে জবরদস্তির জয় দেখতে পাওয়া যায়। যা এক অসুস্থ বিশ্ব তৈরি করছে। সহনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে দিনে দিনে। যে জিতছে সে জিতেই চলেছে, আর হেরে যাওয়ার লোকসমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ আর তার খোঁজ করছে না। জীবনের শুরু থেকে এ চর্চা হয়ে আসছে। কম বয়সে যে শিশু আরেকজনকে হেয় করছে, তার ওপর জবরদস্তি চালাচ্ছে; সমাজ সে শিশুকে গুরুত্ব দেয়। দুর্বলের ওপর সবলের বিজয় মেনে নিয়েছে সবাই। এমনকি সমীক্ষায়ও যার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এর সমালোচনা করে লিখেছেন মনবিওট।

গবেষণা

গার্ডিয়ান গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, যেসব শিশু স্কুলে আক্রমণাত্মক আচরণ করে, যেমন ধমকানো বা মেজাজ দেখানো, তারা মধ্যবয়সে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারে। এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের গবেষকরা বলছেন, এ মানসিকতার শিশুরা উচ্চতর পদ এবং কাক্সিক্ষত চাকরি বেশি পেয়েছে। ওই গবেষণাপত্র ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সাত হাজার লোকের তথ্য ব্যবহার করেছে। যাদের জীবন ব্রিটিশ কোর্ট স্টাডি দ্বারা অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণা দলটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে তাদের তথ্য পরীক্ষা করেছে, ১৯৮০ সালে যাদের বয়স ছিল ১০ এবং ২০১৬ সালে ৪৬ বছর।

ওই গবেষণায় যুক্ত অধ্যাপক এমিলিয়া ডেল বোনো বলেন, ‘আমরা দেখেছি যেসব শিশু মনোযোগ এবং মানসিক অস্থিরতার সমস্যা অনুভব করেছিল তারা ভবিষ্যতে কম উপার্জন করেছে। কিন্তু আমরা স্কুলে আক্রমণাত্মক আচরণ এবং পরবর্তী সময় উচ্চ উপার্জনের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র খুঁজে পেয়ে অবাক হয়েছি। তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে কারণ আমাদের শ্রেণিকক্ষ হলো প্রতিযোগিতার জায়গা এবং বাচ্চারা আগ্রাসনের সঙ্গে সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার জন্য নিজেদের মানিয়ে নেয়; তারপর এ আচরণ কর্মক্ষেত্রেও নিয়ে যায়, যেখানে তারা সেরা বেতনের চাকরির জন্য আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যায়।’

টকিং ট্যালেন্টের প্রধান নির্বাহী এবং মনোবিজ্ঞানী মেরি-ক্লেয়ার রেস বলেন, ২০১৬ ছিল কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিতে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। সেই সময়ের আগে আমরা সাধারণত বসরা টেবিলের ওপর মুষ্টি মেরে বা চিৎকার করে কথা বলছে এমন পুরুষালি বা আক্রমণাত্মক আচরণকে পুরস্কৃত করতাম। কিন্তু ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’ আন্দোলনের উত্থান করপোরেট সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের দুবারের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে তার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এমন অনেক সফল ব্যক্তি আছেন, যাদের বহিষ্কার করা হয়। ডেল বোনো বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, শিশুদের খারাপ আচরণের প্রতি উৎসাহিত করা উচিত। আমি মনে করি সন্তানকে আক্রমণাত্মক হওয়ার পরিবর্তে তার ভূমিতে দাঁড়াতে উৎসাহিত করা উচিত।

সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট

জর্জ মনবিওট মনে করেন, নয়া-উদারনীতিবাদ (নিওলিবারেলিজম) আধুনিক সমাজে একটি সংকট তৈরি করেছে। যেখানে এমন মানসিকতা তৈরি হয় যে, যোগ্যরা জিতবে এবং অযোগ্যরা হেরে যাবে। তিনি লেখেন, গত ৪৫ বছর ধরে নব্য উদারনীতিবাদ মানুষের জীবনকে এমন একটি সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাউকে অবশ্যই জিততে হবে এবং অন্যদের হারতে হবে। যা অনেকটা ধর্মের মতো যে, কারা যোগ্য এবং অযোগ্য তা নির্ধারণ করা যায়। তিনি লেখেন, নিওলিবারেলিজমের মূল বিষয় হলো একটি অসম ও জবরদস্তিমূলক সমাজের ন্যায্যতা প্রদান করা, যেখানে উৎপীড়করা শাসন করে। তার মতে, চার্লস ডারউইন যেমন বলেছিলেন, ‘সভ্য জাতিগুলো প্রায় নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে, যাদের প্রতিস্থাপন করবে বিশ্বের অসভ্য জাতি।’ সূক্ষ্ম উপায়ে ধনী দেশগুলো এখনো একই খেলা খেলে; তাদের সম্পদ অনেকাংশে অন্যান্য দেশ থেকে আহরণের ওপর নির্ভরশীল।

এ প্রসঙ্গে জর্জ মনবিওট ২০২১ সালে লেখা তার আরেকটি নিবন্ধ উল্লেখ করেন। যখন প্যান্ডোরা পেপার্স ফাঁস হয়। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বিদেশে নিয়ে লুকানোর এবং কর ফাঁকির গোপন জগৎ নিয়ে অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনের নাম দেওয়া হয় প্যান্ডোরা পেপারস। কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ আছে এমন প্রত্যন্ত দ্বীপে ধনী ব্যক্তিরা তাদের অর্থ লুকিয়ে রাখে। যা পরে ফাঁস হয়। মনবিওট বলছেন, রাজনীতিবিদরা একে ‘পুঁজিবাদের অগ্রহণযোগ্য মুখ’ হিসেবে নিন্দা করেন। কিন্তু না, এটাই পুঁজিবাদের চেহারা। তিনি জানান, পুঁজিবাদ একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিল। ১৪২০ সালে পর্তুগিজরা মাদেইরায় উপনিবেশ স্থাপনের কয়েক দশক পরে। সেখানে তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা আলাদা ছিল। তারা আফ্রিকা থেকে চিনি উৎপাদন ও প্রক্রিয়া করার জন্য ক্রীতদাস এনেছিল। তারা এমন এক অর্থনীতি গড়ে তোলে যেখানে জমি, শ্রম এবং অর্থ তাদের আগের সামাজিক অর্থ হারিয়ে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হয়।

প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা

মনবিওট জানাচ্ছেন, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমরা ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায় বাধ্য হচ্ছি। শিশুরা স্কুলেও বারবার বিজয়ী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। উদাহরণস্বরূপ তিনি ইংল্যান্ডে বছর বছর শিশুদের উন্নতির পরীক্ষা এবং সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল তদারকির কথা বলেন। সরকার ইংল্যান্ডের কয়েক হাজার স্কুল পর্যবেক্ষণ করে তাদের ভালো, মাঝারি এ হিসেবে চিহ্নিত করে। যার মাধ্যমে ইংল্যান্ডের অভিভাবকরা সন্তানকে কোন স্কুলে ভর্তি করাবেন তা নির্বাচন করে থাকেন। তবে মনবিওটের মতে, এসব প্রতিযোগিতা শিশু এবং শিক্ষকদের ক্ষতি করে। ধনী এবং ক্ষমতাবানদের সহজে জেতার সুযোগ করে দেয়। তিনি জানান, ব্রিটিশ লেখক চার্লস স্পেন্সার তার ‘বোর্ডিং স্কুলের স্মৃতিচারণ’-এ উল্লেখ করেছেন, জেতার অর্থ হেরে যাওয়াও। যে বাবা-মায়েরা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তৈরির জন্য তাদের সন্তানদের প্রাইভেট স্কুলে পাঠাচ্ছেন টাকা খরচ করে, খেয়াল করছেন না ভেতর থেকে তারা ভয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং রাগ পোষণ করে রাখে।

মনবিওট বিষয়টি বোঝানোর জন্য সমাজবিজ্ঞানী লুসিও বাফালমানোর একটি বইয়ের কথা বলেন। যার নাম ‘আরও প্রভাবশালী হওয়ার ১০ উপায়’। সেখানে বলা আছে, ‘নারী সেই পুরুষদের সঙ্গে যায় যারা তাদের বশীভূত করে’।  বাফালমানো যে কৌশল প্রচার করেছেন তার মধ্যে রয়েছে, ‘যদি সে আপনাকে চুম্বনে অস্বীকার করে তবে তার মুখ ধরে রাখুন’, ‘তামাশা করে তাকে একটি অনুভূমিক অবস্থানে ঠেলে দিন’, ‘তামাশা করে তাকে টেনে আনুন’ এবং ‘আধিপত্য দিয়ে তার মন জয় করুন’।

এর বিপরীতে মনবিওট বলছেন, আমাদের জবরদস্তি এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ উদযাপন করা বন্ধ করা উচিত। শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আমাদের উচিত প্রতিযোগিতামূলক নীতিকে সহযোগিতামূলক নীতিতে প্রতিস্থাপন করা। তার মতে, এর মানে এই নয় যে, ভালো চাকরি করছেন বা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন এমন সবাই নিপীড়ক। আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো, ভালো নেতৃত্ব, সাংগঠনিক সাফল্য, উদ্ভাবন, অন্তর্দৃষ্টি বা দূরদর্শিতার জন্য আধিপত্যের মানসিকতার প্রয়োজন হয় না। কারণ উৎপীড়কদের জয় অন্য সবার জন্য পরাজয়। স্কুল যারা বুলিং করে, পরবর্তী জীবনে অ্যালকোহল, ধূমপান, আইনভঙ্গ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা তাদের বেশি থাকে।

বিশ্ব রাজনীতিতে

তিনি আরও লিখেছেন, ‘গু-ামি’ রাজনীতিতে পুনরুত্থিত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভøাদিমির পুতিন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ভিক্তর অরবান, হাভিয়ে মাইলি এবং অন্যরা তাদের আধিপত্যমূলক আচরণ প্রকাশ করেন, যেমন ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিতর্কে হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে অশোভন মন্তব্য করেন, একজন সাংবাদিকের অক্ষমতাকে অপমানজনকভাবে উপহাস করেন। মনবিওট বলছেন, ট্রাম্প হয়তো শিশু থাকা অবস্থায় এমনই ছিলেন এবং এখনো সেই শিশু রয়ে গেছেন। ‘আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বুলিদের দ্বারা শোষণের জন্য উপযুক্ত। পুরনো স্কুলের খেলার মাঠের মতো, সবচেয়ে খারাপ লোকেরা ওপরে উঠে যায়।’ তার মতে, বিশ্বব্যাপীও এটি কাজ করে। যেমন “সরকারগুলো তাদের জনগণকে আশ^স্ত করে যে, তারা একটি ‘গ্লোবাল রেসে’ জড়িত, আমরা যদি পিছিয়ে পড়ি, অন্য একটি জাতি আমাদের ছাড়িয়ে যাবে।”

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত