রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিবির-হিযবুত তাহরীরের বিপক্ষে শিক্ষার্থীরাও

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৪৩ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ইস্যুতে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগের দুদিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার সকাল থেকে অবস্থান ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও তা করেননি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে নিরাপত্তা শঙ্কায় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিতে না পারলেও দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

একই সঙ্গে এ আন্দোলনের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সত্য নয় বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য, তারা নিঃসন্দেহে হিযবুত তাহরীরের সম্পূর্ণ বিপক্ষে এবং এ জাতীয় অপশক্তির উত্থান যেন বুয়েটে না হয় এজন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গতকাল বিকেলে বুয়েট প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরেরও কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে তারা বলেন, যদি এরকম কোনো শিক্ষার্থীর শিবিরসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাৎক্ষণিক তাদের বহিষ্কারের দাবি জানানো হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বুয়েট ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত, অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ফেরত যাবে। নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে গতকালের নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করতে পারেননি তারা। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হুমকির অভিযোগ করেন।

লিখিত বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, দফায় দফায় প্রতিবাদ জানানোর পরও ছাত্রলীগসংশ্লিষ্টরা বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসের ইচ্ছাকে সম্মান না করে বুয়েট ক্যাম্পাসে আবার ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার নানারকম উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রমাগত অসন্তোষ এখন তীব্র আন্দোলনে রূপ নিয়েছে শুধু একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস চাওয়ার দাবি থেকেই। তাই সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে ভুল প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য। শপথ করা হচ্ছে সব রাজনৈতিক ও নিষিদ্ধ সংগঠন থেকে বুয়েটকে মুক্ত রাখার। আবরার ফাহাদ ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।

ছাত্ররাজনীতি শুরু হলে সবাই ক্ষমতার শিকলে আবদ্ধ হবে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা, কমিটি দেওয়া, ক্যাম্পাসে শোডাউন, রাজনৈতিক সংগঠনের জনসমাবেশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রাজনীতিমুক্ত রাখার বিধির লঙ্ঘন। এ ছাড়া রাতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ যেখানে বুয়েটশিক্ষার্থীদের জন্য নিষিদ্ধ, সেখানে রাত ৩টায় একটা রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক নেতারা দলেবলে কর্মসূচি পালন করা অবশ্যই স্বাভাবিক ঘটনা নয় এবং সাংগঠনিক রাজনীতির প্রভাবে ঘটা ঘটনা। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বরাবরই নিরাপদ এবং রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চেয়ে এসেছেন, যেখানে ক্ষমতাচর্চার লোভ-লালসার শিকলে আবারও জিম্মি হয়ে যাবে সবার নিরাপত্তা, শিক্ষাঙ্গনের উপযুক্ত পরিবেশ। খুবই গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ্য, ২০১৯-এর ৭ অক্টোবর আবরার ফাহাদ হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে বুয়েটের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে বুয়েটের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দিলেও ছাত্রলীগ বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়াকে সম্মান করছে না এবং ২০২২ সালে ঢাবি ছাত্রলীগ নেতারা বুয়েটে সমাবেশ বা মিছিল করে হামলার হুমকি দেন।

ছাত্ররাজনীতি না থাকায় ক্যাম্পাসের সব আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, সুস্থ নেতৃত্ব এবং নৈতিকতা বিকাশের সব উপাদান ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির উপস্থিতি ছাড়াও গত কয়েক বছরে উপস্থিত ছিল এবং এতে নেতৃত্বের চর্চায় শিক্ষার্থীরা তাদের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছেন। প্রতিটি বিভাগের বার্ষিক উৎসব আয়োজন, প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং অ্যাকাডেমিক সংগঠন, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, বিভিন্ন ক্লাবের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে আনন্দের সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে। আবাসিক হল এবং ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ক্ষমতাচর্চা ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সভা-সেমিনার আয়োজন, জাতীয় সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্জনসহ, ক্যাম্পাসের ভেতরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সফলতার সঙ্গেই আয়োজিত হয়েছে। রাজনীতিমুক্ত বুয়েট ক্যাম্পাসের গত পাঁচ বছর এতসব সফলতার পরও ক্যাম্পাসকে নিয়ে নানা ধরনের অপবাদ দেওয়া যৌক্তিক বলে মনে করেন না বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।

ছাত্ররাজনীতিবিমুখ মানেই স্বাধীনতাবিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি এমন কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, বুয়েটের সব ব্যাচের সব শিক্ষার্থী সম্মিলিতভাবে দেশবাসীর সামনে সৎ সাহসের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে বলতে চান, বুয়েটের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের এবং স্বাধীনতার চেতনায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী। প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার এবং প্রচেষ্টা তার সঙ্গে বুয়েটের সব শিক্ষার্থীই তাদের একাত্মতা পোষণ করে এবং নিজেদের সুযোগ্য প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে তোলে তার জন্য অবদান রাখতে উদ্যমী। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি না চাওয়া মানেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মতাদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। চাওয়া শুধু ক্ষমতার লোভ এবং অপচর্চা আবারও এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের যেন জিম্মি করে না ফেলুক।

বুয়েটে চলমান ছাত্ররাজনীতিবিহীন নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে ছাত্রলীগসংশ্লিষ্টরা গুজব ও অপপ্রচারের চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত