শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিব্রতকর ব্যাটিংয়ের পর পেস বোলিংয়ে স্বস্তি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১০ এএম

শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের কুড়ি ওভার পেরিয়েছে। পরের ওভার করতে এলেন হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় বলে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস শট খেললেন পয়েন্ট ও গালি অঞ্চলের মাঝ দিয়ে। বাউন্ডারি লাইনের দিকে ছুটে যাওয়া সেই বলের পেছনে ছোটেন বাংলাদেশের পাঁচজন ফিল্ডার। চাক্ষুষ বা টেলিভিশনের পর্দায় যারাই এ দৃশ্য দেখেছেন, তাদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া কাজ করার কথা। প্রথমত, এ কেমন ছেলেমানুষি! দ্বিতীয়ত, এতটাই উজ্জীবিত বাংলার ফিল্ডাররা!

উজ্জীবিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ততক্ষণে বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে লঙ্কানদের ছয়টি উইকেট। সাগরিকায় তিন দিনে দুবার ফিল্ডিংয়ে নেমে আটটি ক্যাচ ফসকানো বাংলাদেশের ফিল্ডাররা সাগরিকায় তৃতীয় দিনের শেষবেলায় উত্তেজনা আটকে রাখতে পারেননি। এক বলের পেছনে ছুটে গেছেন পাঁচজন। এ থেকে উত্তেজনার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয়। টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বনেদি সংস্করণ হলেও বাংলাদেশের এই দলটা বড্ড অপেশাদার। নইলে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের ব্যাটিং স্বর্গ বিবেচিত উইকেটে শ্রীলঙ্কা ৫৩১ রান তোলার পর বাংলাদেশের ১৭৮ রানে অলআউট হওয়ার কথা নয়। অথচ হয়েছে তাই-ই।

চট্টগ্রাম টেস্ট যেভাবে এগিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হারতে পারত। সেটা হচ্ছে না শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক ধনঞ্জয়া ডি সিলভার বদান্যতায়। কিংবা বলা যেতে পারে চট্টগ্রামে এপ্রিল মাসের দাবদাহের কল্যাণে। দিনের দুই সেশনে বাংলাদেশকে অলআউট করার পর বোলারদের বিশ্রাম দিতেই হয়তো দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে নামায়নি শ্রীলঙ্কা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের সমীকরণও রয়েছে। যেখানে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে জয়টাই মুখ্য। নিশ্চিত জয় পেতে ৩৫৩ রানের লিডটাকে আরও বাড়িয়ে নেওয়াই বেশি যৌক্তিক মনে হয়েছে শ্রীলঙ্কা দলের নীতিনির্ধারকদের। শেষ সেশনে ব্যাটিং করে ১০২ রান তুলতে ৬ উইকেট হারানোর পরও সাগরিকায় লঙ্কানরা এগিয়ে রয়েছে ৪৫৫ রানে।

শেষবেলায় হাসান মাহমুদের সঙ্গে জ¦লে ওঠেন সৈয়দ খালেদ আহমেদ। অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট শিকার হাসান মাহমুদের। খালেদের দুটো। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই দিমুথ করুনারতেœকে বোল্ড করে উইকেট এনে দেন হাসান মাহমুদ। এই টেস্টে দুবারই হাসানের বলে বোল্ড হলেন করুনারত্নে। পরের ওভারে খালেদ আহমেদ ফেরান কুশল মেন্ডিসকে। করুনারত্নে ৪ ও কুশল ২ রান করেন।

দলীয় ৩৪ রানেই আরও একটি উইকেট পেতে পারত বাংলাদেশ। ৭ম ওভারে হাসান মাহমুদের চমৎকার ডেলিভারি ম্যাথিউসের ব্যাটের কানা ছুঁয়ে গেলেও প্রথম স্লিপে তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন শাহাদাত হোসেন দীপু। ৭ রানেই জীবন পান ম্যাথিউস।

সেই তৃতীয় উইকেটের দেখা মেলে ৬০ রানে। ৪৫ রানের জুটি গড়ার পর ফেরেন নিশান মাদুশকা। হাসানের বলে এক্সট্রা কাভারে মেহেদী হাসান মিরাজ ক্যাচ নিলে থামে নিশানের ৩৪ রানের ইনিংস। আগের ক্যাচ মিস করার প্রায়শ্চিত্ত দীপু করেন দিনেশ চান্দিমালের ক্যাচ নিয়ে। এ উইকেটটিও নেন হাসান। ৭ বলে ৯ রান করা চান্দিমাল ফেরেন দলীয় ৭২ রানে।

ক্যারিয়ারের প্রথম চার ইনিংসে ২টি করে ফিফটি ও সেঞ্চুরি হাঁকানো কামিন্দু মেন্ডিসও এবার পারেননি ইনিংস বড় করতে। তাকে ফিরিয়েছেন খালেদ আহমেদ। লিটনকে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে কামিন্দু করেন ৯ রান। ৮৯ রানে ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। ক্যারিয়ারের প্রথম চার ইনিংসেই ৪০০ পেরোনো তৃতীয় ব্যাটার কামিন্দু। চার ইনিংস শেষে তার রান ছিল পাকিস্তান কিংবদন্তি জাভেদ মিয়াঁদাদের সমান ৪১৯। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ার হয়ে অভিষেকের পর প্রথম চার ইনিংসে ৪০০ পেরিয়েছিলেন হার্বি কলিন্স। প্রথম ৫ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রান ভারতের বিনোদ কাম্বলির ৫৪৪। গতকাল ৯ রানে আউট হয়ে যাওয়ায় কাম্বলিকে ছুঁতে পারেননি কামিন্দু।

চট্টগ্রামে দ্বিতীয় দিনশেষে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ ডেভিড হেম্প টেস্ট জয়ের উচ্চাশা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘দুদিন ঠিকমতো ব্যাটিং করলে বাংলাদেশ জিততেও পারে সাগরিকা টেস্ট।’ গতকাল জাকির ও তাইজুল মিলে অবশ্য দিনের শুরুটা সেভাবেই করেছিলেন, অন্তত প্রথম ঘণ্টাটি। তবে সব সময় ভোরের সূর্য সারা দিনের আগাম বার্তা দিতে পারে না।

জাকির ও তাইজুলের ৪৯ রানের জুটি ভেঙে দিনের প্রথম সাফল্য এনে দেন বিশ্ব ফার্নান্দো। ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফিফটি তুলে জাকির আউট হন ৫৪ রানে। পরের ৯ রানের মধ্যে আরও ২ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। প্রভাত জয়সুরিয়ার ফুল লেংথ ডেলিভারি সোজা শর্ট মিড উইকেটে থাকা করুনারত্নের হাতে ক্যাচ দেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ১১ বল ক্রিজে থেকে বাংলাদেশ অধিনায়ক করেন ১ রান। এরপর জাকিরের কায়দায় তাইজুল ইসলামকেও শিকার বানান বিশ্ব। বাংলাদেশের নাইটওয়াচম্যান করেন ৬১ বলে ২২ রান। ১০৫ রানে ৪ উইকেট হারানো বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল বড় জুটির। কোচ হেম্পের মতো সমর্থকরাও তাই তাকিয়ে ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ সাকিব আল হাসানের দিকে। সেই আশা বিনষ্ট হয় আসিথা ফার্নান্দোর ডেলিভারিতে। এক বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে সাকিব পড়েন এলবিডব্লিউর ফাঁদে। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। আম্পায়ার্স কলের বলি হয়ে ফিরতে হয় ২৩ বলে ১৫ রান করেই।

ঠিক দুই বল পর যথারীতি হতাশ করেন লিটন দাস। আসা-যাওয়ার খেলায় প্রথম বল ডিফেন্স, দ্বিতীয় বল কাভার দিয়ে দর্শনীয় চারের পর তৃতীয় বলেই ব্যাটের কানা ছুঁয়ে কিপার কুশলের হাতে ক্যাচ। ১৩০ রানেই নেই ৬ উইকেট। ওই চাপ থেকে বাংলাদেশ আর বের হতে পারেনি। দীপু-মিরাজসহ বাকি সবাই ফিরেছেন এক অঙ্কে থাকতেই। কেবল মুমিনুল হকের ৮৪ বলে ৩৩ রানের ইনিংসটি কিছু সময় পার করেছে। ২০ রানের মধ্যে শেষ ৪ উইকেট খুইয়ে টেস্টে এ নিয়ে টানা পাঁচ ইনিংসে ২০০ রানের নিচে অলআউট হয় বাংলাদেশ। আসিথা ফার্নান্দো ৩৪ রানে নেন ৪ উইকেট। দুটি করে উইকেট নেন বিশ^ ফার্নান্দো, লাহিরু কুমারা ও প্রভাত জয়সুরিয়া।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত