মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্মার্ট রাস্তায় আনস্মার্ট দুর্ভোগ

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫৫ এএম

দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষই থাকেন ঢাকায়। এই ছোট্ট দেশে এমন কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এবং অবৈজ্ঞানিক। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতি শহরগুলোর একটি ঢাকা। অল্প কিছু আদি ঢাকাবাসী ছাড়া, অধিকাংশ মানুষের নাড়ি পোঁতা দূর গ্রামে। জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় ছুটে এলেও তাদের মন পড়ে থাকে সেখানে। সুযোগ পেলেই ঢাকার নাগরিক জঙ্গলে আটকেপড়া মানুষগুলো সেই মাটির ঘ্রাণে, নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে চায়। বাংলাদেশে দুই ঈদে লম্বা ছুটি মেলে। তাই ঈদ এলেই সবার বাড়ি ফেরার তাড়া। কিন্তু একসঙ্গে সব মানুষ বাড়ি ফিরতে চাইলেই ভেঙে পড়ে সব ব্যবস্থা। ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দ অনেকটাই মাটি হয়ে যায়, পথের অন্তহীন দুর্ভোগে।

ঈদে বাড়ি ফেরার সময় দুর্ভোগ হবে এটা সবাই জানেন। যারা বাড়ি ফিরবেন, তারা তো জানেনই, যাদের বাড়ি নির্বিঘ্ন রাখার কথা- তারা আরও ভালো জানেন। দুর্ভোগের কম বেশি হয়, কিন্তু দুর্ভোগ কখনো শেষ হয় না। সরকার একেবারে বসে আছে, এমনটি ঠিক নয়। এরই মধ্যে বাড়ি ফেরা নির্বিঘ্ন করতে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে সম্ভাব্য যানজটের স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ঈদে বাড়ি ফেরার সময় অন্তত ১৫৫ স্থানে যানজট ও ঘরমুখী মানুষের ভোগান্তি হতে পারে। এরমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রয়েছে ৪৮টি জায়গা। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের পথের মহাসড়কে রয়েছে ৫৫টি যানজটের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। এর মধ্যে বাইপাইল ও চন্দ্রা মোড় অন্যতম। ঢাকা-সিলেট পথে যানজটের ভোগান্তি হতে পারে এমন জায়গা রয়েছে ৪১টি। এই মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় চার লেনের কাজ চলছে। ফলে পূর্ণগতিতে যানবাহন চলতে পারবে না। ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে ঝুঁকির জায়গা ৬টি। ঢাকা-আরিচা সড়কে ৮টি যানজটপ্রবণ জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে থাকা ১১টি সেতু এবং ২টি সড়কে টোল আদায় করা হয়। টোল আদায় কেন্দ্রে যানবাহনের চাপ পড়লে যানজট লেগে যায়। এসব স্থানে ভোগান্তি কমাতে সড়ক ও সেতু মেরামত এবং সেতুর টোল প্লাজা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মানুষের প্রবল স্রোতে সব ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামানের করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছাড়েন অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। সে হিসেবে ঈদের সময় প্রতিদিন গড়ে বাড়ি যান ৩০ লাখ মানুষ। কিন্তু ঢাকাকেন্দ্রিক যে গণপরিবহনব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো দিয়ে বড়জোর দিনে ২২ লাখ লোক পরিবহন সম্ভব। তার মানে প্রতিদিন ৮ লাখ লোকের বাড়ি ফেরার কোনো ব্যবস্থা নেই। এরা বাসে-ট্রেনে-লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে; ছাদে, রডে ঝুলে বাড়ি যাবেন, ট্রাক ভাড়া করে যাবেন, মোটরসাইকেলে যাবেন। ভেঙে ভেঙে নানান মাধ্যমে যাবেন। ঈদের জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা করা সম্ভবও না, বাস্তবও নয়। তারপরও সরকারকে বিকল্প ভাবতে হবে। যত মানুষই বাড়ি যেতে চাক, তাদের সবাইকে নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

এটা মানতেই হবে আগের চেয়ে ভোগান্তি এখন অনেক কমেছে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। দেশে এখন আর দুর্গম বলে কোনো জায়গা নেই। সড়কে, সেতুতে আরও ছোট হয়ে গেছে বাংলাদেশ। এখন ঢাকা থেকে বাংলাদেশের প্রান্তের সর্বোচ্চ দূরত্ব ৯ ঘণ্টা। এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, টানেল সব মিলিয়ে গোটা বাংলাদেশ অন্তত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিবেচনায় এখন দারুণ স্মার্ট। ফলে ভোগান্তি এখন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভোগান্তি কমেনি।    

রাস্তা স্মার্ট হলেও ব্যবস্থাপনা এখনো সেই মান্ধাতার আমলেই রয়ে গেছে। একের পর এক চমৎকার মহাসড়ক বানানো হয়েছে। কিন্তু সেই চমৎকারিত্বটা আমরা রাখতে পারিনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম আমার নিয়মিত যাওয়া হয়। ডিভাইডারসহ চার লেনের এই মহাসড়কের গা ঘেঁষেই দোকানপাট, এমনকি ঘরবাড়িও বানিয়ে রেখেছি আমরা। একসময় এই মহাসড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি হতো। ডিভাইডারসহ চার লেনে উন্নীত করার পর দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। এখন আর মুখোমুখি সংঘর্ষের সুযোগ নেই বললেই চলে। মহাসড়ক বানানোই হয়েছে দ্রুতগতির যান চলাচলের জন্য। কিন্তু আমরা রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি নিয়েও মহাসড়কে উঠে যাই। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, উল্টো দিক থেকে যানবাহন। ডিভাইডারসহ চার লেনে উন্নীত হওয়ার পরও আমরা উল্টো দিকে গাড়ি চালাই। ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলা একটি গাড়ির সামনে যখন উল্টো দিক থেকে আসা একটি রিকশা পড়ে, তখন দুর্ঘটনা ঠেকানো কঠিন। আমি নিজে বহুবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। কোনোরকমে দুর্ঘটনা ঠেকানো গেছে বটে, তবে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর আনন্দটা আর থাকে না। সারাক্ষণই তটস্থ থাকতে হয়, উল্টো দিক থেকে কিছু এলো কি না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফুটওভার ব্রিজ আছে, নির্দিষ্ট স্থান পরপর উইটার্নও আছে। কিন্তু আমরা ফুটওভার ব্রিজে ওঠার কষ্টটুকুও করি না। রাস্তা পেরুতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ি। দুই কিলোমিটার দূরের ইউটার্ন ব্যবহার না করে উল্টো দিকে চালিয়ে দিই। শুধু যে রিকশা, ঠেলাগাড়ি তাই নয়; মাঝে মাঝে প্রাইভেট কার, এমনকি বড় বড় বাস-ট্রাকও উল্টোদিকে চলে আসে। আর এই প্রবণতা শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নয়; সবগুলো মহাসড়ক, এমনকি এক্সপ্রেসওয়েতেও উল্টোদিকে গাড়ি চলার প্রবণতা আছে। ঢাকার ভেতরেই যে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, সেখানেও সমানে উল্টোদিক থেকে গাড়ি চলে। এমনকি পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতেও একই চিত্র দেখেছি।

ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে আমাদের গর্বের নির্মাণ। এটি আমাদের দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। আমার মন খারাপ থাকলেই আমি বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়েতে যাই। মন ভালো হয়ে যায়। বিদেশ বিদেশ লাগে। পদ্মা সেতুকে সংযুক্ত করা এই গর্বের এক্সপ্রেসওয়ে এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুর মহাসড়কে। এক বছরে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩১ জন মানুষ মারা গেছে। সত্যিকারের এক্সপ্রেসওয়েতে মানুষের ঢোকারই সুযোগ থাকার কথা নয়। সেখানে আমরা ইচ্ছামতো যেখানে সেখানে রাস্তা পার হাই। ইচ্ছামতো বাসস্টপ বানিয়ে নিয়েছি।

শুধু দ্রুত বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করলেই হবে না। পথটা নিরাপদ ও আরামদায়ক হওয়া চাই। ঈদের ছুটিতে প্রতিবার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ দেন। এটা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। শুধু ঈদের জন্য গাড়ি কেনা সম্ভব নয়, এটা আমরাও জানি। কিন্তু ঈদের সময় বিভিন্ন ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারের পরিবহন পুলের সব গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তাতে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। সড়কে বেশি জোর দেওয়া হলেও পাশাপাশি রেল ও নৌপথকে গুরুত্ব দিলেও ভোগান্তি কিছুটা কমানো যেতে পারে। আগে স্টেশনে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে টিকিট কাটতে হতো। এখন অনলাইনে আসার পর সেই দুর্ভোগ কমেছে বটে, তবে এখন ট্রেনের টিকিট পাওয়া আর লটারি পাওয়া সমান কথা।

স্মার্ট রাস্তা হয়েছে। ব্যবস্থাপনাটা একটু স্মার্ট হলেই দুর্ভোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যে ১৫৫টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে বাড়তি ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা করতে হবে। উল্টোদিকের গাড়ি চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। টোল আদায় সিস্টেম আধুনিক করতে হবে। মানুষ আনন্দ করতে বাড়ি যাবে। তাদের আনন্দটা যেন পথেই মাটি না হয়।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত