মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কারা কেএনএফ মদদ কাদের

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৪৫ এএম

জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও আস্থা তৈরিতে সহায়তা দিয়ে গত বছর আলোচনায় আসে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট। এরপর দুর্গম পাহাড়ের গভীর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধাওয়া করে। একপর্যায়ে শান্তি আলোচনাও শুরু করে। এরই মধ্যে একবারেই হঠাৎ রাতের অন্ধকারে বান্দরবানের রুমা সদরের একটি ব্যাংকে হানা দিয়ে ম্যানেজারকে অপহরণ ও আনসারদের অস্ত্র লুট করে ত্রাস ছড়িয়ে দেয়। এখানেই থেমে থাকেনি। পরদিন ভরদুপুরে থানচি উপজেলার দুটি ব্যাংকে হানা দিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদী এই গোষ্ঠীটি।

গত বছর ধারাবাহিকভাবে বান্দরবানে কেএনএফবিরোধী অভিযানের পর থেকে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছিল কড়া নজরদারি। এর মধ্যে এমন দুঃসাহসিক হামলার ঘটনা ঘটল। পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক সূত্র বলছেন, দেশের বাইরে থেকে সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি দেশের বাইরে থেকে পাহাড়ি অঞ্চলকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করছে।

ব্যাংক লুটের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। কেএনএফের আস্তানাগুলো টার্গেট করে অভিযান চলছে। তাদের তৎপরতা নিয়ে গতকাল বুধবার বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে পার্বত্যাঞ্চলে নিরাপত্তায় থাকায় পুলিশ ও র‌্যাবকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও (বিজিবি) কাজ করছে। তা ছাড়া পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বান্দরবান গেছেন। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তা ছাড়া পুলিশের কয়েকটি ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে কেএনএফ ও এর সামরিক শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) তৎপরতা শুরু হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অংশ, মিয়ানমারের চিন ও কাচিন রাজ্য এবং ভারতের মিজোরাম, মণিপুর রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষে তাদের তৎপরতা বেশি। তবে কেএনএফের লোগোতে প্রতিষ্ঠাকাল বলা আছে ২০০৮ সাল। তারা প্রকাশ্যে আসে ২০১৮ সালে। ওই সময় সংগঠনটির সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সবার নজরে আসে। সংগঠনের সদস্যরা খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় জড়িত। সংগঠনটি পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক আয়তনের অঞ্চল নিয়ে বেআইনি ও মনগড়া মানচিত্র তৈরি করেছে। তাদের এই কল্পিত মানচিত্রের তিন পাশে রয়েছে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত। তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। তা ছাড়া সংগঠনটির কর্মকাণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারতের সঙ্গে আলোচনাও চালানো হচ্ছে। মাস দুয়েক আগে বিজিবি মহাপরিচালক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সংগঠনটির একাধিক সদস্যের ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পাহাড়ে আস্তানা গড়ে তোলার বিষয়টিও জানতে পেরেছে বিজিবি।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেএনএফ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে বিদেশ থেকে। তারা পার্বত্যাঞ্চল টার্গেট করেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তাদের ধরতে সমস্যা হচ্ছে। সংগঠনটির সদস্যরা যে সীমান্ত এলাকায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, সেই ছবিও তারা হাতে পেয়েছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, কয়েক মাস আগে পাহাড়ে আস্তানা গাড়া জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই সময় কেএনএফ নেতাসহ বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ফিল হিন্দালের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পায়। র‌্যাব জানতে পারে, অর্থের বিনিময়ে কেএনএফ জঙ্গি গোষ্ঠী জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে আস্তানা গাড়তে সহায়তা করেছে। ওই সব আস্তানায় তারা সংগঠনটির জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিত। পরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

ওই সময় কেএনএফের হামলায় একাধিক সেনাসদস্য নিহত হন। তারপর কেএনএফ সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা মারমার নেতৃত্বে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কমিটি গঠন করা হয় গত বছরের মে মাসে। ওই কমিটির সঙ্গে ৫ মার্চ দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয়।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেএনএফ নামে সন্ত্রাসী সংগঠনটিকে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে তা উদঘাটন করার চেষ্টা চলছে। সশস্ত্র এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নির্মূল করতে ইতিমধ্যে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিজিবি-পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কেএনএফ মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন। পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রায় অর্ধেক আয়তনের লামা, রুমা, আলীকদম, থানচি, রোয়াংছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাইছড়ি, বরকলসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে একটি মনগড়া মানচিত্র তৈরি করেছে ওরা। পাহাড়ের বম নৃ-গোষ্ঠী ছাড়াও পাঙ্খুয়া, খুমি, ম্রো এবং খিয়াং জাতি-গোষ্ঠীর লোকজন নিয়ে কেএনএফ গঠন করা হয়েছে। কেএনএফের মূল নেটওয়ার্ক পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে। রুমা ও রোয়াংছড়ির শিল্পী পাহাড়, সাইজামপাড়া, রনিনপাড়া, কেওক্রাডংয়ের সীমান্তবর্তী পাদদেশ, রাইক্ষ্যং লেকসহ বিভিন্ন এলাকায় এই গোষ্ঠীর সাংগঠনিক বিস্তার।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিভাজনের মধ্য দিয়ে আবার অশান্ত হয়ে ওঠে পাহাড়। এরপর আরও কয়েকটি সংগঠন হয়েছে মূলত পুরনো সংগঠন ভেঙে। নতুন কিছু সংগঠনও গড়ে উঠেছে। এক দশকে পার্বত্য তিন জেলায় আত্মপ্রকাশ ঘটেছে জনসংহতি সমিতি-জেএসএস (সংস্কার), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) (ডেমোক্রেটিক), মগ লিবারেশন পার্টি ও কেএনএফের মতো সংগঠনের। এসব সংগঠনে মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি যোগাযোগের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত