শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ছাত্ররাজনীতির ‘অপ’ সমস্যা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৮ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি করায় আইনগত বাধা আর থাকছে না, কারণ বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। কিন্তু বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি সত্যি করা যাবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। এ ব্যাপারে ছাত্রদের একাংশের প্রবল আপত্তি যেমন আছে, তেমনি আরেক অংশের (তারা নানা ছাত্রসংগঠনে সক্রিয়) অনাপত্তিও আছে। ছাত্ররাজনীতিটা কীভাবে সচল থাকবে বা থাকা উচিত, বিতর্কটা ঠিক সেখানে।

এই মুহূর্তে ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং তৎপর ছাত্রলীগ। ইতিমধ্যে সংগঠনটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে না হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থার কথা বলেনি, কর্মসূচির কথাও তারা জানায়নি। ছাত্রনেতাদের আশঙ্কা বুয়েট ক্যাম্পাসে আবার ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের দখলদারি কায়েম হতে যাচ্ছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস এবং সহাবস্থানের ছাত্ররাজনীতি চালুর দাবি তাদের।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে  ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ক্ষোভে ফুঁঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির মুখে ওই বছরের ১১ অক্টোবর ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বুয়েট প্রশাসন। চার বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকে ছাত্ররাজনীতি। গত ২৮ মার্চ ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশকে ঘিরে আবারও আলোচনায় আসে বুয়েটের ছাত্ররাজনীতির প্রসঙ্গ। রাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার থাকলেও বুয়েটেরই এক শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগ নেতা ১ এপ্রিল সকালে হাইকোর্টে রিট দাখিল করলে জারিকৃত প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে রায় দেওয়া হয়। ফলে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি করার ব্যাপারে কোনো বাধা আর কার্যকর নেই।

বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলমান রেখেছেন। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে এখনো বিরত রয়েছেন তারা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়ে প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করে বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে ছাত্রলীগ বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি শুরুর সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বুয়েটে কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে বলে ছাত্রলীগের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আধুনিক, যুগোপযোগী, বৈচিত্র্যময়-সৃষ্টিশীল, জ্ঞান-যুক্তি-তথ্য-তত্ত্বনির্ভর ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলছে ছাত্রলীগ। ছাত্ররাজনীতির মডেল প্ল্যাটফরম হিসেবে ছাত্রলীগ বুয়েটকে গ্রহণ করবে উল্লেখ করে সংগঠনের সভাপতি বলেছেন, ‘বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে এনেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তার দায়িত্ব শেষ করবে না। দেশরত্ন শেখ হাসিনার পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নত, স্মার্ট বাংলাদেশে উন্নত ও স্মার্ট ছাত্ররাজনীতি উপহার দেওয়ার জন্য মডেল প্ল্যাটফরম হিসেবে বুয়েটকে গ্রহণ করা হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়েও বুয়েট প্রশাসনের সঙ্গে ছাত্রলীগ আলোচনা করবে।’

অন্যান্য ছাত্রসংগঠন অবশ্য শঙ্কা ব্যক্ত করছে, ছাত্রলীগ আবার দখলদারির রাজনীতি শুরু করবে। সহাবস্থান নিশ্চিত করার এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি ছাত্রনেতাদের।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে বুয়েটে ঢুকতে পারছিল না। তারা আদালতকে ব্যবহার করে সেখানে ঢোকার চেষ্টা করছে। বুয়েটে যদি ছাত্রলীগের রাজনীতি আবার শুরু হয় তাহলে আবরার হত্যাকা-ের মতো ঘটনা আবারও ঘটবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সহাবস্থানের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। সহাবস্থানের রাজনীতির মাধ্যমে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি চালু রাখার দাবি জানাচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বুয়েটসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার লড়াই জারি রেখেছে ছাত্রদল।’

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দীপক শীল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে হলে ছাত্র আন্দোলনের বিকল্প নেই, সেই জায়গা থেকে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন। তবে এ বিষয়টি শুধু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্যের বিষয় নয়। ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সেটি নিশ্চিত করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা অপরাজনীতির শিকার হবে না, অবিচারের শিকার হবে না। ক্ষমতাসীনদের ছাত্রসংগঠন যাতে দখলদারি কায়েম করতে না পারে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ক্যাম্পাস পায়, সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নজর রাখতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের লড়াই চালু রাখতে হবে উল্লেখ করে ছাত্রফ্রন্ট সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির এখন যে পরিস্থিতি তার দায় ছাত্রলীগ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির নামে ছাত্রলীগ যে অপরাজনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করেছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হয়েছিল। ছাত্রলীগ গণতন্ত্রের কথা বলে, সাংবিধানিক অধিকারের কথা বলে বুয়েটে ঢোকার চেষ্টা করলেও শিক্ষাঙ্গনে তারা অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের অধিকারকে অস্বীকার করে এবং তাদের তৎপরতায় বাধা দেয়। ছাত্ররাজনীতির নামে ক্যাম্পাসগুলোতে তারা দখলদারি কায়েম করবে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করা জরুরি। এর চেয়েও জরুরি বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ছাত্রদের পক্ষের রাজনীতি, শিক্ষার পক্ষের রাজনীতি চালু রাখা এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই অব্যাহত রাখা। তাহলে কেউ অপরাজনীতির সুযোগ পাবে না।’

ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, ‘ছাত্রলীগের কারণেই বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ফেরা মানে আবারও ছাত্রলীগের দখলদারি কায়েম হওয়া। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোকে তারা বুয়েটে দাঁড়াতেই দেবে না। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি, আপনারা যদি সত্যি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে চান তাহলে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত