বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ থেকে মে মাসকে বছরের উষ্ণতম সময় ধরা হয়। দেখা যায়, তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে এপ্রিল মাসে। রাজধানীসহ দেশের তাপমাত্রা অসহনীয়ভাবে বাড়ছে। এর কারণ কী? পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেমন তেমন, কিন্তু আমাদের এই নাতিশীতোষ্ণ দেশেও এত তাপপ্রবাহের নেপথ্যে রয়েছে সবুজায়ন ধ্বংস, নদী, পুকুর-খাল-বিল ও জলাশয় কমে আসা। আবার পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো, বিচিত্র প্রকৃতির ওপর বিভিন্ন শক্তিধর দেশের যথেচ্ছ কার্যক্রম। ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উষ্ণ করে তুলছে পৃথিবীকে। গাছপালা কমে গেলে বায়ুুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা পৃথিবীকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে, সেটি দীর্ঘদিনের পরিবেশ ধ্বংসেরই একটি ফল।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, প্রাণী ও উদ্ভিদজগতে। পরিবেশবাদী, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, এই হারে তাপ বৃদ্ধির ধারা চলতে থাকলে তার প্রভাব মোকাবিলা করা মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর তাপ বৃদ্ধির ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। সৃষ্টি হবে চরম তাপপ্রবাহ। উৎপাদন ও খাদ্য মজুদ কমে যাবে। প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গলতে থাকবে মেরু অঞ্চলের জমাট বরফ। অনেক অঞ্চল অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের কারণে মরুভূমিতে পরিণত হবে। মানুষের জীবনযাপন হয়ে পড়বে চরম দুর্বিষহ। একসময় আমাদের অসংখ্য নদী ছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নদী হত্যা করা হয়েছে। কোনোটাতে বালু ভরাট আবার কোথাও স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ফলে প্রচুর পরিমাণ তাপ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে বালু থাকার কারণে মরুময় একটি অবস্থার তৈরি হয়েছে। এসব কারণে আশপাশের অঞ্চলে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মৃদু ও মাঝারি মাত্রার তাপপ্রবাহ বইছে। তবে মাসের শেষার্ধে একটি তীব্র তাপপ্রবাহও বয়ে যেতে পারে দেশের ওপর দিয়ে। দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত হয়েছে ‘গরমের তীব্রতা আরও বাড়বে’ প্রতিবেদন।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো সবুজায়ন ধ্বংস করা। একসময় আমাদের ২৫ ভাগের বেশি সবুজায়ন থাকলেও এখন আর তা নেই। গাছপালা কার্বন ডাই-অক্সাইড ও তাপ শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করার ফলে বাতাসে অক্সিজেন ছড়িয়ে আশপাশ শীতল রাখত। কিন্তু বন উজাড় করায় বৃক্ষ কমে গিয়ে এখন অক্সিজেন, জলীয় বাষ্প কমে গিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে একই কারণে বৃষ্টিপাতও কমে গেছে। এর বাইরেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ জলাধার কমে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে জলাধার বা পুকুরের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এটিও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ। আবার রাজধানীর যানবাহনও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। যার মধ্যে রয়েছে রাজধানীতে চলাচলকারী প্রায় ১৫ লাখ গাড়ি। যার এক-তৃতীয়াংশ ফিটনেসবিহীন চলাচল করছে। এগুলোর ইঞ্জিন প্রচণ্ড পরিমাণে উত্তপ্ত হয়ে বাতাসের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়ে শহরকেও উত্তপ্ত করছে। এর সঙ্গে রয়েছে ঢাকা শহরের পিচঢালা রাস্তা। এই রাস্তা দিনের বেলা উত্তপ্ত হচ্ছে আর যখন তাপ রিলিজ করে তখন তাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এজন্য রাস্তার ডিভাইডারে গাছ প্রয়োজন। যা উত্তাপ কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এখন শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ডিভাইডারের গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এপ্রিল মাসে গড়ে সাধারণত দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ ও এক-দুটি তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। কিন্তু এই তাপমাত্রা কবে কমবে? সহজ উত্তর। যখন বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি কবে হবে? আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলছেন- মাসের দ্বিতীয়ার্ধের পর বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বৃষ্টি হলেও হতে পারে।
ডারউইনের সেই কথা ‘সারভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট’কে মেনে নিয়েই আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, এ বছরের তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তিকাল বিগত বছরগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে এটা আসলে নির্ভর করে, মানবদেহের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। তার মানে যে পারবে, সেই-ই টিকে থাকবে। এমন পরিবেশের জন্য আমরাই দায়ী। প্রকৃতি এভাবেই প্রতিশোধ নেয়।
