জলবায়ু মামলা ও পৃথিবী রক্ষায় জেগে ওঠা প্রজন্ম

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ এএম

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে বিশে^র বিভিন্ন দেশের সরকার ও করপোরেশনের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটছে। পৃথিবী রক্ষায় সচেতন মহলের এই জেগে ওঠাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন অভিযোগে সরকার ও করপোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের এক হাজার চারশর বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা এক হাজারের বেশি।

পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এটা এখন ধ্রুব সত্য। জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ। আর কার্বন নিঃসরণের উৎস হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান উৎপাদন হলো উন্নত দেশসমূহ। প্রকৃতি-পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন করতে গিয়ে কখন যে পৃথিবী নামক গ্রহটির বারোটা বেজে গেছে তা টেরই পাওয়া যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সব ক্ষেত্রে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ওপর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। তাই তো এখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প উৎস সন্ধানে নেমে পড়েছে গোটা বিশ্ব।

এই জলবায়ু পরিবর্তন অনেক আগ থেকে শুরু হয়েছে। প্রথম শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই একটু একটু করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ৮৫০ কোটি মানুষের জন্য এখন বিশে^র প্রধান সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন। দাবানল, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় থেকে কোনো দেশই এখন আর নিরাপদ নয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই গ্রহটির ভবিষ্যৎ যে হুমকির মুখে পড়বে এ ব্যাপারে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি নিশ্চিত। তাই জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবেশকর্মীরা বিশে^র নীতিনির্ধারকদের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার আহ্বান জানালেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

সাধারণ মানুষও এখন জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবগত। তাই টেকসই পৃথিবী গড়তে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ গ্রহ রেখে যেতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে প্রকৃতিপ্রেমীরা ফুঁসে উঠেছে। চাপ তৈরি হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের জন্য। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জোর দাবি উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেই সচেতন মহলও চুপ করে বসে নেই। এটা সুনিশ্চিত যে, মানুষের প্রকৃতিবিনাশী কর্মকা-ের ফসল জলবায়ু পরিবর্তন। আর এর পেছনে উন্নত যেসব দেশ ও তাদের নীতিনির্ধারকরা বেশি ভূমিকা পালন করছে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী উন্নত দেশসমূহের মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের জন্যই হচ্ছে মামলা। এককথায় কার্বন নিঃসরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর ব্যর্থতাই একমাত্র কারণ।

এবার কয়েকটি জলবায়ু মামলার কথা তুলে ধরা যাক। অতি সম্প্রতি দুই হাজারের  বেশি বয়স্ক নারী ইউরোপের শীর্ষ মানবাধিকার আদালতে ইতিহাসের প্রথম জলবায়ু মামলায় জয় পেয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের জলবায়ু নীতিমালা নাগরিকদের জীবন ও স্বাস্থ্যের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে এ মামলা ঠুকেছিলেন একদল সুইস নারী। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনরোধে অবহেলার অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশ এবং রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ছয় পর্তুগিজ। ২০২০ সালে পর্তুগালের লেইরিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানল থেকে এই মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গের ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটসে (ইসিএইচআর) ২০২৩ সালে মামলাটি করা হয়। বর্তমানে এ মামলার শুনানি চলমান রয়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক দল আমেরিকান শিশু জলবায়ু মামলা করে। শিশুরা দাবি জানিয়েছিল  যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা গুরুত্ব সহকারে মাথায় রাখতে হবে। এদিকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মহাসাগরগুলোর সুরক্ষা চেয়ে ৯টি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের নেতারা মামলা করেন। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (আইটিএলওএস) এ মামলার প্রথম শুনানি হয়। সাগরে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনকে দূষণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না তা নির্ধারণ এবং যদি নির্ধারণ সম্ভব হয় তবে তা প্রতিরোধ করার জন্য জাতিসংঘের সামুদ্রিক আদালতে বিশ্বের প্রথম জলবায়ু এ মামলা করা হয়। এমন মামলার উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যাবে।

বাস্তবতা হলো, জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করছে। এ লড়াই কার্বন নিঃসরণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে যারা উন্নয়নের কথা বলছে তাদের বিরুদ্ধে। এ লড়াই টেকসই ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার জন্য। প্রশ্ন হলো, যে প্রকৃতিবিনাশী উন্নয়ন জনসাধারণের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে সে উন্নয়ন করে লাভ কী? জলবায়ু সমস্যা কোনো দেশেরই একক সমস্যা নয়। এটি পৃথিবীতে থাকা ৮৫০ কোটি মানুষ ও আগামী প্রজন্মের জন্য মহাবিপদ সংকেত। পরিবেশবাদীদের আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে নীতিনির্ধারকদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর উপায় বের করার পথ দেখাবে বলে মনে করি। দেখা যাচ্ছে জলবায়ু মামলার প্রতিটিরই বাদীপক্ষ ভুক্তভোগী জনগণ কিংবা পরিবেশকর্মী। বিশে^র প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেই দেখা গেছে যখন সাধারণ জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে ঠিক তখনই তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা যুদ্ধের থেকে কোনো অংশে কম নয়। পৃথিবী যে হুমকির সম্মুখীন উন্নত দেশের অনেক নীতিনির্ধারক এটা মানতে নারাজ!

জাতিসংঘ থেকে বারবার উদ্বেগ জানিয়ে বলা হচ্ছে, সময় ফুরিয়ে আসছে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পৃথিবী নামক গ্রহটি বাসযোগ্যতা হারাবে। প্রশ্ন হলো, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয় তারা কেন উন্নত দেশসমূহের পরিবেশবিনাশী কর্মকা-ের খেসারত দেবে। সমাপ্ত হওয়া ‘কপ-২৮’ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের ব্যাপারে জোর দাবি উঠলেও শেষ পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের ঘোষণা আসেনি। তবে এটাও ঠিক নবায়নযোগ্য সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ছে। সেদিন বেশি দূরে নয় যখন ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমে আসবে আর নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবী টেকসই ও নিরাপদ হয়ে উঠবে।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও সদস্য

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত