বঙ্গবন্ধুর যুক্তির যথার্থতা মুজিবনগর সরকার গঠনে প্রমাণিত

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৫৮ এএম

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করেছিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার। যে সরকার সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রধান পরামর্শক ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ এই আইনজীবী তুলে ধরেছেন ইতিহাসের নানা অজানা অধ্যায়। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক রাহাত মিনহাজ।

রাহাত মিনহাজ : একটা অস্থায়ী বা প্রবাসী সরকার গঠনের চিন্তা আপনারা কখন শুরু করেন?

আমীর-উল ইসলাম : আমি আর তাজ ভাই অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি পাড়ি দিয়ে ৩০ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তে পৌঁছাই। পরদিন আমাদের নেওয়া হয় দিল্লিতে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠক হয়। তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ১ মার্চে যে দিন গণপরিষদের আহুত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয় সেদিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। তাজ ভাই শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে ও পরে সব বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করেন। এ ছাড়া সে সময় আমরা উপলব্ধি করি, মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নিতে একটা সাংবিধানিক সরকার গঠন জরুরি। ’৭০-৭১-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের বৈধ প্রতিনিধি দ্বারা গঠিত হবে সে সরকার।

রাহাত মিনহাজ : অস্থায়ী সরকার বাদ দিয়ে অনেকে বিপ্লবী পরিষদ গঠনে তৎপর ছিলেন, বিশেষ করে যুবনেতারা। শোনা যায়, এ নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছিল। আসলে এ নিয়ে সে সময় কী ঘটেছিল?

আমীর-উল ইসলাম : বিপ্লবী পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রভাবশালী এক যুবনেতা। তার এ প্রস্তাবে অনেক সিনিয়র নেতারাও সায় দিয়েছিলেন। দিল্লি থেকে তাজউদ্দীন সাহেব ও আমি ফিরে আসার পর কলকাতায় উপস্থিত জনপ্রতিনিধি ও যুবনেতাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। বিপ্লবী পরিষদ গঠন সম্পর্কে আমি যুক্তি সহকারে বলেছিলাম, বাংলাদেশ বারো ভুঁইয়ার দেশ। আজ যদি আমরা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করি, তাহলে এখানে আরও ১১টা বিপ্লবী কাউন্সিল গড়ে ওঠা বিচিত্র কিছু নয়। ভারতবর্ষসহ বিদেশি রাষ্ট্র বা প্রতিনিধিরা কার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে? কীভাবে সাহায্য করবে? আর যেহেতু আমাদের মাঝে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আছেন তাতে আমাদের সরকার গঠনের সাংবিধানিক বৈধতা ছিল। এ ছাড়া বহু দেশেই স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে কিন্তু স্বার্থক বিজয়ের দৃষ্টান্ত খুবই কম। নাইজেরিয়ার বায়াফ্রায় বিচ্ছিন্নতাবাদী ঘোষণা ও অভ্যুত্থানকে কীভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরি। আমি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছিলাম যে, আপনাদের মনে আছে খ. ঋ. ঙ.-এর অধীনে নির্বাচন করার সময় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সামরিক ফরমানের অধীন খ. ঋ. ঙ.-এর মাধ্যমে নির্বাচন করে লাভ কী? নির্বাচনে জয়লাভের পর তারা যদি ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তাহলে কী হবে? সে সময় বঙ্গবন্ধু তার জবাবে বলেছিলেন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এ নির্বাচন নয়। এ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে বাংলাদেশের মানুষের সাংবিধানিক ও আইনগত প্রতিনিধি কারা এবং কারা এ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। আজ এ মুহূর্তে তার যুক্তির যথার্থতা প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতাকে অনুমোদনের মাধ্যমে সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র তৈরি করতে পারি এবং তারই অধীনে সরকার গঠনের সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা পাবে। আন্তর্জাতিক আইনে এর স্বীকৃতি রয়েছে।

রাহাত মিনহাজ : মুজিবনগর সরকারের শপথের আগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। যা এখন বাংলাদেশের সংবিধানের অংশ। আমরা যতদূর জানি, আপনি এ ঘোষণাপত্র রচনায় যুক্ত ছিলেন?

আমীর-উল ইসলাম : কলকাতায় আমি আর তাজ ভাই যে কক্ষে থাকতাম তার কোনায় একটা ছোট্ট টেবিল ছিল। সেখানে লেখালেখির কাজ করতাম। আমার সঙ্গে কোনো বই বা ডকুমেন্ট ছিল না। আমাদের একটি সাংবিধানিক দলিল প্রয়োজন যেটা শপথ অনুষ্ঠানেও পাঠ করা দরকার। তা ছাড়া আমাদের যুদ্ধ ও সরকার গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে একটা সাংবিধানিক দলিল প্রয়োজন। তিনি একমত হলেন। এরপরই আমি ঘোষণাপত্র লেখার কাজ শুরু করি। সেই সঙ্গে আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য Laws Continuance and Enforcement order তাকে দেখালে তিনি অনুমোদন করলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও অন্যদের দেখালাম। তারাও এক কথায় বললেন ঠিক আছে, ভালো হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা কেউ এটাকে পৎরঃরপধষষু দেখলেন না বা আলোচনা করলেন না। আমি বিএসএফের মি. চট্টোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি কলকাতায় সংবিধান বিশেষজ্ঞ কোনো আইনজীবীকে জানেন কিনা? তিনি একজনের নাম সংগ্রহ করে দিলেন। সুব্রত রায় চৌধুরী। বালিগঞ্জের বাসাতেই তার চেম্বার। তিনি আমার হাত থেকে ডকুমেন্টটা নিয়ে পুরোটা পড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানালেন আর বললেন একটা দাড়ি, কমা, সেমিকোলন কিছুই বদলানোর প্রয়োজন নেই। এতে স্বাধীনতা ঘোষণার যুক্তি ও প্রেক্ষিত জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

রাহাত মিনহাজ : শপথ অনুষ্ঠানের স্থান কীভাবে নির্ধারিত হলো?

আমীর-উল ইসলাম : প্রথমে কুষ্টিয়ার আরেক সীমান্তবর্তী মহকুমা চুয়াডাঙ্গায় ১৪ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী সেখানে হামলা চালায়। এরপর আমি তাজ ভাইকে বলি, সাংগঠনিক কাজে আমি মেহেরপুরের ভবেরপাড়ায় একটি মিশনারি স্কুলের অবস্থান জানি। কাছেই একটি বিরাট আমবাগান। সেখানে শপথ অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। বিএসএফের গোলক মজুমদার নিশ্চিত করলেন তারা এয়ার প্রোটেকশন দিতে পারবেন।

রাহাত মিনহাজ : এ শপথ অনুষ্ঠান সফল করতে আপনাদের প্রস্তুতি কেমন ছিল?

আমীর-উল ইসলাম : নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছিল। প্রতিটি বিষয় খুঁটিনাটি দৃষ্টিতে রাখতে হচ্ছে। ১৭ এপ্রিল দুটি ভাগে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিকদের বৈদ্যনাথতলায় পাঠানো হয়। ১৬ এপ্রিল আব্দুল মান্নান এমপি ও আমি কলকাতা প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করি। এটি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম প্রেসব্রিফিং। আমরা বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে শুধু বলেছিলাম, আগামীকাল এখানে উপস্থিত হলে আমরা বাংলাদেশ সরকারের একটা মেসেজ পৌঁছে দিতে পারব। ১৭ এপ্রিল ভোরে উপস্থিত ছিল একশত ট্যাক্সি। ট্যাক্সিচালকরা ছিলেন বিএসএফের লোক।

রাহাত মিনহাজ : আপনারা কখন বৈদ্যনাথতলায়  পৌঁছালেন। কখন অনুষ্ঠান শুরু হলো, কতক্ষণ স্থায়ী ছিল শপথ অনুষ্ঠানটি?

আমীর-উল ইসলাম : সাংবাদিকদের নিয়ে আমরা বৈদ্যনাথতলায় পৌঁছাই সকাল ১০টার দিকে। অনুষ্ঠান শুরু হয় ১১টার দিকে। প্রথমেই গাওয়া হয় আমাদের জাতীয় সংগীত। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ গ্রহণ করেন। তারপর তিনি আবেগময় বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার আজ স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে একটা লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ বক্তব্যটা আমরা দিল্লিতেই তৈরি করেছিলাম। একদল সৈনিক ‘গার্ড অব অনার’ দেয় নবগঠিত মন্ত্রিসভাকে। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

রাহাত মিনহাজ : শপথ অনুষ্ঠান সফলভাবে শেষ হলেও এ সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল, ছিল অনিশ্চয়তা, ছিল ষড়যন্ত্রও। মুজিব বাহিনী নিয়েও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি যদি একটু বিস্তারিত বলেন? 

আমীর-উল ইসলাম : মুজিব বাহিনী গড়ে ওঠে মুজিবনগর সরকারের অগোচরে। এই বাহিনী গঠনের মূল দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল উবান। মুজিব বাহিনীর ছেলেদের আলাদা দুটি স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আমি আজও ঠিক পরিষ্কার না যে, তখন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো বাহিনীর প্রয়োজন ছিল কি না?

রাহাত মিনহাজ : মুজিবনগর সরকারে অনেকটা রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেন খন্দকার মোশতাক। আসলে তার ভূমিকা কী ছিল?

আমীর-উল ইসলাম : প্রথমদিকে মুজিবনগর সরকারের কাঠামো শুনে তিনি মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলেন। তিনি বয়সে সবার বড়। তাই তিনি আরও বড় পদ আশা করেছিলেন। একপর্যায়ে অভিমান করে মক্কায় গিয়ে হজ পালনের কথা বললেও পরে জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন। আমরা তাই মেনে নিই। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি খুব বেশি কাজ করতেন না। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পররাষ্ট্রবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কাজগুলো আমাকেই করতে হতো। যখন সারাবিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে জনমত জোরালে হচ্ছে, আমাদের ছেলেরাও রণাঙ্গনে সাফল্য পাচ্ছে, তখন শুরু হয় আরেক ষড়যন্ত্র। একটি বিশেষ মহলে চলতে থাকে সমঝোতার দেন-দরবার। আমরা তখন সবকিছুই জানতে পারতাম, টের পেতাম। আমরা যখন শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য নানা চেষ্টা করছি তখন আইনি মতামত পরামর্শ বা আমাদের করণীয় সম্পর্কে কোনো আলোচনায় উৎসাহ না দেখিয়ে খন্দকার মোশতাক বলেছিলেন, ‘You have to decide whether you want Sheikh Mujib or independence, you can not have both..’ আমি তাকে উত্তর দিয়েছিলাম আমাদের দুটোই প্রয়োজন ‘Independence’ is incomplete without Bangabandhu and Bangabandhu is incomplete without independence। এটা থেকেই বুঝতে পারা যায় স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালীন তারা কী রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টির নানা কূটকৌশল আঁটছিল।

রাহাত মিনহাজ : আমরা যতদূর জানি, মুজিবনগর সরকার পরিচালনায় তাজউদ্দীন আহমদ অনেক জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কোনটি ছিল?

আমীর-উল ইসলাম : শেষ কয়েক মাসের পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। যুবনেতাদের উসকে দিচ্ছিলেন খন্দকার মোশতাক। তার শিষ্য তাহেরউদ্দীন ঠাকুর স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্রে ধর্মঘট কারার ব্যবস্থাও পাকা করেছিলেন। যদিও সেটা সফল হয়নি। এ ছাড়া যুবনেতাদের চাপে সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব আনার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেটা অবশ্য সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত