দুই লেনের সঙ্গে বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০৯ এএম

দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর দেশের বেশ কয়েকটি মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। চার লেনের সড়কে গাড়ির গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি নিরাপত্তাব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে। তবে সে তুলনায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৪ বছরে দেশে সড়কপথের অবকাঠামোগত বিপুল উন্নয়ন হলেও চলাচলে শৃঙ্খলা না আসার কারণেই মূলত দুর্ঘটনা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তারা আরও বলেন, শৃঙ্খলার দিকে নজর না দিলে সড়কের অবকাঠামোগত যতই উন্নয়ন করা হোক না কেন তা খুব একটা সুফল দেবে না।

রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের জন্য এরই মধ্যে চার লেনের একাধিক সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি সড়ক চার লেনে উন্নীতের কাজ চলমান রয়েছে। এমনকি চার লেন থেকে আট লেনেও উন্নীত হয়েছে মহাসড়কের অংশবিশেষ। চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সমীক্ষা শেষে শিগগিরই এর চূড়ান্ত নকশা জমা দেওয়া হবে।

২০১৭ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দুই লেন থাকার সময়কার দুর্ঘটনা, মৃত্যু ও হতাহতের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার সংখ্যা গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে মৃত্যু ও হতাহতের সংখ্যা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কের প্রশস্ততার সঙ্গে দুর্ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। রাস্তায় বিশৃঙ্খলা থেকেই মূলত দুর্ঘটনা ঘটে। দ্রুতগতির উন্নয়নে যেতে হলে সড়কগুলো মাল্টিলেন (বহুমুখী) হতে হবে। কিন্তু এতে যে দুর্ঘটনা ঘটবে না, সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। সড়কের উন্নয়ন হলেও এর ব্যবহারবিধি যদি চালকরা না জানেন, হাইওয়ে পুলিশ না জানে, তাহলে দ্রুতগতির সড়ক তৈরি করলেও সেখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা কম হবে, কিন্তু হতাহতের ভয়াবহতা অনেক বেশি হবে। টেকসইভাবে দুর্ঘটনা কমাতে সুশৃঙ্খল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে হাইওয়েতে (মহাসড়ক) ১২০ কিলোমিটার, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলে। সেখানে কিন্তু এত দুর্ঘটনা ঘটে না। কিন্তু আমরা গতি কমিয়ে ৮০তে নামিয়ে আনছি। এটা কোনো স্মার্ট চিন্তা না। হাইওয়ে পুলিশের যদি প্রশিক্ষণ থাকত তাহলে তারা শুধু কাগজ পরীক্ষা আর রাডার গান দিয়ে গাড়ির গতি পরিমাপ না করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নজর দিত।’

‘একের অধিক লেনবিশিষ্ট সড়কে তুলনামূলক ধীরগতির ভারী যানবাহনগুলো প্রথম লেন বা বাম দিকের লেনে চলাচল করবে। এর পরের লেনে চলবে উচ্চগতির যানবাহন। কেউ লেন না মানলে অন্যান্য দেশে জরিমানা করা হলেও আমাদের দেশে করা হয় না। এটা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটা গাড়ি থেকে আরেকটা গাড়ির মধ্যবর্তী নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা খুবই জরুরি। হাইওয়ে পুলিশকে চৌকস হতে হবে। বিআরটিএকে দক্ষ ও নিরাপদ চালক তৈরি করতে হবে। হাইওয়ে পুলিশ যদি শুধু কাগজপত্র দেখা ছাড়া বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বিজ্ঞানভিত্তিক অন্যান্য নিয়মকানুন না মানে, তাহলে যত ভালো রাস্তাই হোক না তাহলে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।’ যোগ করেন এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।

প্রায় একই ধরনের মত দেন আরেক পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লেনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নিরাপত্তার দিক থেকে ভালো। কারণ যখনই কোনো সড়ক দুই লেন থেকে চার লেন হচ্ছে, তখন মাঝখানে বিভাজন দিতেই হবে। এই বিভাজনের ফলে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় না। কিন্তু শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন করে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এর সঙ্গে অন্যান্য অনুষঙ্গ রয়েছে। যেমন প্রশিক্ষিত চালক, ধীরগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। চার লেন করার কারণে মুখোমুখি সংঘর্ষ না হলেও পেছন দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে গেছে। সড়ক আধুনিক হলেও যানবাহন আধুনিক নয়। চালকের প্রশিক্ষণ নেই, পথচারীবান্ধব যে অবকাঠামো দরকার, সেটারও অভাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘চার লেন করা হচ্ছে গতি বাড়ানোর জন্য। আমরা চার লেন করলেও এর পাশে ভূমির সঠিক ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেই। রাস্তার দুই পাশের মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে হাট-বাজারসহ নানা স্থাপনা রয়েছে। পথচারীদের বিষয়টি সড়কের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উপেক্ষিত। হাট-বাজার থেকে অনেক সময় বিপরীত দিক থেকে যানবাহন চলে আসছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনার এসব অনুষঙ্গও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আধুনিক সড়ক নির্মাণ করা হলেও এর ব্যবস্থাপনা এখনো সেকেলেই রয়ে গেছে।’

‘দ্রুতগতির আধুনিক সড়ক নির্মাণ হলেও যানবাহন আধুনিক হচ্ছে না। পাশাপাশি মহাসড়কে খোলা ট্রাকে কিংবা কাভার্ড ভ্যানে মানুষ পরিবহন হচ্ছে। এতে তো দুর্ঘটনা বাড়বেই। আমাদের দেশে এখন মহাসড়কে গতি নির্ধারণ করা হচ্ছে ৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। এই গতি আসলে কোন যানবাহনের জন্য? ট্রাকের জন্য, বাসের জন্য নাকি অন্য যানবাহনের জন্য? এখানে কিন্তু বিভ্রান্তি আছে। কারণ চার চাকাবিশিষ্ট যানবাহন আর দুই চাকাবিশিষ্ট যানবাহনের গতিসীমা এক হতে পারে না।’ যোগ করেন এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।

পুলিশ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটওভার ব্রিজের অভাবের কারণেই এখনো অনেক মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেনি। অনেকেই রাস্তা পার হওয়ার সময়ে দৌড়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে ও দুর্ঘটনার মুখে পড়ে।

২০২১ সালে পেছন দিক থেকে সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৭৯৩টি। অন্যদিকে মুখোমুখি সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল ২৮৭। কাভার্ড ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা এবং অন্যরা বেশিরভাগ মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণ ছিল।

হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে সকাল ৭টা-৮টার মধ্যে। অন্যদিকে মধ্যরাতে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটে। কারণ চালকরা সারা রাত গাড়ি চালানোর পর সকালে তাদের ঘুম পেতে শুরু করে। এ ছাড়া সকালে যানবাহনের প্রচুর ভিড় থাকে। অন্যদিকে, মধ্যরাতে রাস্তাগুলোয় তুলনামূলক কম যানজট থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত