বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ পুরো মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনার ইতিহাসের ওপর মেহেরপুরের মুজিবনগরে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল স্মৃতি মানচিত্র ও কমপ্লেক্স। ২৫ বছর আগে ১৯৯৯ সালে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০ একর জমির ওপর এসব স্থাপনা এবং ম্যুরাল নির্মাণ হলেও আজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। উপরন্তু লোকবল না থাকায় অরক্ষিত মুজিবনগরের শতবর্ষী গাছগুলো আজ শুকিয়ে মরতে বসেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সাদা সিমেন্টে তৈরি মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরালগুলোতে চির ধরেছে। ফাটল ধরেছে স্মৃতিসৌধসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মানচিত্র ভবনের চতুর্দিক। শপিং মল ভবন নির্মাণের ২০ বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় দফাভিত্তিক গোলাপবাগান এখন অনেকটা বিরানভূমি। এভাবে পড়ে থাকা অবস্থায় পুরনো স্থাপনার অনেক কিছুই ভেঙে আবার নতুন করে করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে হাজার কোটি টাকা।
মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন, মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে সরকার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এজন্য নতুন করে আরও ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল জানান, মুজিবনগরে ১১টি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নতুন করে বিভিন্ন কাজ শুরু হবে। মূলত মুক্তিযুদ্ধকে চিরঅম্লান ও জীবন্ত করতে মুজিবনগরকে আন্তর্জাতিকমানের করা হবে। সে ক্ষেত্রে পুরনো অনেক স্থাপনা তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হবে। সাদা সিমেন্টে তৈরি পুরনো ম্যুরালগুলো ভেঙে নতুন করে ধাতব পদার্থে আরও বড় আকারের এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ডের ব্রোঞ্জের দামি টেকসই ম্যুরালে করা হবে। এ ছাড়া ঢাকা হাতিঝিলের চেয়েও মুজিবনগরকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে আন্তর্জাতিকমানের শব্দ, আলো, ফোয়ারা, লেক, টাওয়ার, নিরাপত্তা, ভিআইপি গেস্টহাউজ, পার্কসহ নানা সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। দ্রুত কাজ শুরু করতে ইতিমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের তিন দফা বৈঠক শেষ হয়েছে। নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। দ্রুতই দরপত্র হবে। নতুন এই কাজ শুরু হলে বদলে যাবে মুজিবনগর। তখন মুজিবনগরই হবে দেশের এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গর্বের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র। তখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হবে মুজিবনগর।
জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও মেহেরপুর-১ আসনের এমপি ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘মুজিবের নামে বাংলাদেশে এই একটি মাত্র স্থান। সেটা মুজিবনগর। যে স্থানের গর্ভে বাংলাদেশের জন্ম। মুজিবনগরকে সরকার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্র করতে চায়। সেই লক্ষ্যে বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। কেননা মুজিবনগরের প্রতি এ সরকারের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। এখানে মুজিবনগর নামে চেকপোস্ট, স্থলবন্দর, রেলপথ ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হলে বদলে যাবে এই এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চালচিত্র। ইতিমধ্যে সব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে অচিরেই।
’৭১ সালের এই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা পরবর্তী সময়ে মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, গার্ড অব অনার এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ হয়। সেদিন মুজিবনগরের জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশের জন্ম হতো না। তাই মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাসকে জীবন্ত করে ধরে রাখতে মুজিবনগরে নির্মাণ করা হয়েছে শত শত ম্যুরাল বা ভাস্কর্য। যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়।
দিনটি পালন উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী কর্মসূচিতে ১৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সাড়ে ৯টায় বিভিন্ন বাহিনী সদস্যদের অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ, সন্ধ্যায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র মাঠে ব্যান্ড দল ‘মাইলস’সহ শিল্পী তানিম মাহমুদ, রেশমি মির্জা ও দিলশাদ নাহার কনা সংগীত পরিবেশন করবেন। এর আগে বেলা ১১টায় মুজিবনগরে শেখ হাসিনা মঞ্চে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। বক্তব্য রাখবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন রিমি, রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং ডা. সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপি এমপিসহ কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক নেতারা।
