ইসরায়েলি হামলা থেকে নিজেদের কতটুকু রক্ষা করতে পারবে ইরান

  • কয়েক দশক ধরে, ইরান অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতার উপর নির্ভর করার জন্য জোর দিয়ে আসছে
  • এক্ষেত্রে ইরান স্থানীয়ভাবে তৈরি নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও চালু রেখেছে
আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩১ পিএম

চলতি মাসের শুরুতে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেটে হামলার জবাবে গত শনিবার গভীর রাতে শত শত মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের ভূখণ্ডে প্রথমবারের মত হামলা চালায় ইরান।

ইরানের এই নজিরবিহীন হামলার প্রতিশোধ সঠিক মূল্যে নেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান। এমনকি কোন দেশ সমর্থন না দিলেও একাই নিজেদের আত্নরক্ষা করতে পারে ইসরায়েল, এমন মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ইরানের হামলার সম্ভাব্য জবাবের ধরন নিয়ে পরিকল্পনা করতে ইতিমধ্যে কয়েকদফা বৈঠক করেছে ইসরায়েলি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা। সামরিকভাবে ইরানকে জবাব দেওয়া হবে তা নিশ্চিত করেছেন  ইসরায়েলি সেনাপ্রধান হারজি হালেভি।

তবে ইরানের মাটিতে ইসরায়েল সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে এর জবাবে ব্যাপক এবং কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বুধবার ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি।

এখন প্রশ্ন হল এ ধরনের হামলা হলে ইরান কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের আত্মরক্ষা করতে পারবে?

স্থানীয় প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের উপর নির্ভর

কয়েক দশক ধরে, ইরান তার অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতার উপর নির্ভর করার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে জোর দিয়ে আসছে। দেশটির সামরিক খাতেও দেখা যাচ্ছে একই রকমের পদক্ষেপ নিতে।

নিজস্ব সক্ষমতায় নির্ভরশীল হওয়ার পেছনে বড় কারণ প্রতিবেশী ইরাকের সঙ্গে ইরানের আট বছর ধরে চলা যুদ্ধ। ১৯৮০ সালে ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ইরানে হামলা চালায় বাগদাদ। তখন তাকে সামরিকভাবে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি কিছু শক্তি।

এরই মধ্যে দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলোর নানামুখী নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কবলে পড়েছে ইরান। এতে তার আকাশপথের আধিপত্য এখন পর্যন্ত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দেশটির বিমানবাহিনীতে আছে জঙ্গি বিমান ও অন্য সমরাস্ত্র। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত এফ–৪ ও এফ–৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এগুলো আবার ১৯৭৯ সালে ইরানে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবের আগের সময়কার।

ইরান বর্তমানে রাশিয়া–নির্মিত সুখোই ও মিগ যুদ্ধবিমানের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এগুলো সাবেক সোভিয়েত আমলের। এছাড়া ইরানের বিমানবাহিনী মার্কিন নকশায় সায়েকাহ ও কাওসারের মতো যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। যদিও ইসরায়েলের মোতায়েন করা শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধবিমান এফ–৩৫–এর সঙ্গে এগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না।

রাশিয়া–নির্মিত ২৪টি এসইউ–৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে কিছুকাল ধরে চলা সমঝোতা ইরানের বিমানবাহিনীকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে। কিন্তু দেশটির শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এটি মিটিয়ে দেবে না।

দূরপাল্লার মিসাইল

ইরান উচ্চাভিলাষী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের পুরোনো যুদ্ধবিমান বহরের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এর ধারাবাহিকতায় তেহরান বিশেষভাবে নজর দিয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে। এর বাইরে কিছু বিমানঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম ও পারমাণবিক স্থাপনা গহিন পার্বত্য অঞ্চলে গড়ে তুলছে তারা।

ইরানের কাছে সর্বোচ্চ দূরপাল্লার যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তা স্থানীয়ভাবে তৈরি বাভার–৩৭৩। এক দশক ধরে উন্নয়ন ও পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর ২০১৯ সাল থেকে এটি ব্যবহার করা হয়। এর পর থেকে এটির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে উন্নত সংস্করণের বাভার–৩৭৩ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রদর্শন করেন ইরানি কর্মকর্তারা। সে সময় তাঁরা বলেন, এর রাডার শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ৩৫০ কিলোমিটার (২১৭ মাইল) থেকে ৪৫০ কিলোমিটারে (২৮০ মাইল) উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে আধুনিক ‘সায়াদ ৪বি’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়েছে দূরপাল্লার এ ব্যবস্থায়।

এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও স্টিলথ জঙ্গি বিমানসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। একসঙ্গে ৬০টি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ৩০০ কিলোমিটার (১৮৬ মাইল) পর্যন্ত দূরের ছয়টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে তা প্রতিহত করা সম্ভব এ ব্যবস্থায়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, বাফার ৩৭৩ উন্নত সিস্টেমটি কিছু দিক থেকে রাশিয়ান তৈরি এস-৩০০ সিস্টেমের চেয়ে উচ্চতর। এমনকি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি ‘এস–৪০০’–এর সঙ্গে এটি তুলনীয়।

ইরানের সামরিক মহড়ার বাইরে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে দ্য বাভার–৩৭৩–এর ব্যবহার হতে দেখা যায়নি। তবে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে নিবিড় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের একটি উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।

এ ছাড়া রাশিয়ার সরবরাহ করা ‘টর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা’র বাইরে ইরান এস–৩০০ ব্যবস্থা ব্যবহার করে। ২০১৬ সালে ৬ বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের করা পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এস–৩০০ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তেহরান।

১৫০ কিলোমিটারের (৯৩ মাইল) মধ্যে থাকা যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ধেয়ে আসা ক্রুজ ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার উপযোগী করে এটির নকশা করা হয়েছে। সেখানে টর স্বল্প থেকে মধ্যম পাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্তর

ইরান স্থানীয়ভাবে তৈরি নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও চালু রেখেছে। সবচেয়ে দীর্ঘ পাল্লার ব্যবস্থার পেছনে স্তরে স্তরে সজ্জিত এ ব্যবস্থায় এক গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

মধ্যম পাল্লার এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে আরমান, ট্যাকটিক্যাল সায়াদ ও খোরদাদ–১৫। এগুলো বিভিন্ন উচ্চতায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দূরের লক্ষ্যবস্তু থেকে ইরানের আকাশ রক্ষা করতে সক্ষম।

মধ্যম পাল্লার এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পেছনে আছে আজারাখস, মাজিদ ও জুবিনের মতো স্বল্পপাল্লার ব্যবস্থা।

এছাড়া ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও সেনাবাহিনীর কাছেও আছে নানা ধরনের ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোর পাল্লা ২০০০ কিলোমিটার (১,২৪৩ মাইল) পর্যন্ত। এসব বাহিনীর আছে হামলাকারী ড্রোনও; যার কিছু শনিবার ইসরায়েলে হামলায় কাজে লাগানো হয়।

নাশকতা, সাইবার আক্রমণ

এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সঙ্গে চলে আসা ছায়াযুদ্ধে ইসরায়েল ইরানি স্বার্থ লক্ষ্য করে অপ্রচলিত যুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে বলে ধারণা করা হয়। ক্রমেই বেশি প্রকাশ্য হচ্ছে এ ছায়াযুদ্ধ।

ইসরায়েল বহুবার ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, বোমা বিস্ফোরণ ও স্যাটেলাইট মেশিনগানের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। এমনকি সামরিক স্থাপনাগুলোতেও চোরাগুপ্ত হামলার পাশাপাশি একটি গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়া বহু বছর ধরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা, পেট্রোল স্টেশনগুলোতে সক্রিয় জাতীয় নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন খাতে বড় পরিসরে একাধিক সাইবার হামলা চালানোর পেছনেও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে ইরান।

এসব হামলার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর ধরেই উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়ে আসছে ইরান। সেই সঙ্গে রপ্ত করেছে হামলা ঠেকিয়ে দেওয়া ও মজবুত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কৌশলও।

ইরানে সাইবার হামলা ঠেকানোর দায়িত্বে রয়েছে দ্য ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর প্যাসিভ ডিফেন্স নামের সংস্থা। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বলছেন, সংস্থাটি দিনে হাজার হাজার না হলেও শত শত হামলা প্রতিহত করে থাকে।

অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি সাইবার হামলার পেছনে ইরানি হ্যাকারদেরও সন্দেহ করা হচ্ছে। ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে ইরান–সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে; যেখানে আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের একটি দল এমন সব তথ্য প্রকাশ করছেন, যা ইসরায়েলের স্পর্শকাতর তথ্যভান্ডার ও ওয়েবসাইটগুলো হ্যাক করে পাওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত