কমেছে হজযাত্রী বেড়েছে তদারককারীর বহর

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৪৪ পিএম

এবার পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর কথা রয়েছে আগামী ১৬ জুন। সেই আলোকে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের হজ পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো হজযাত্রীদের বাড়ি ভাড়াসহ অনেক আনুষ্ঠানিকতাই বাকি রয়ে গেছে। যা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা একে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ‘অব্যবস্থাপনা’কে দুষছে হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। আবার মন্ত্রণালয় বলছে, তারা সবকিছু সমাধান করার চেষ্টা করছে। আর এসব সমস্যা দূর করতে মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের সৌদি আরব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ৩৬২ জনের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছেন চিকিৎসক ও নার্সরাও। গত বছর এ সংখ্যা ছিল দুইশর কাছাকাছি। যদিও এবার হজযাত্রীর সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে অনেক কমেছে। সৌদি আরব যাওয়া-আসায় ওই ৩৬২ জনের জন্য সরকারি টাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিট কিনতে গত ১৭ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জেদ্দার বাংলাদেশ হজ অফিসের কাউন্সিলরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, এবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাচ্ছেন ৯ হাজার ৯৬৮ জন। আর বেসরকারিভাবে যাচ্ছেন ৭৮ হাজার ৮৯৫ জন। সব মিলিয়ে হজে যাচ্ছেন ৮৮ হাজার ৮৬৩ জন। বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত বাকি ৪৪ হাজার ৪৩টি কোটা ফেরত যাবে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে হজ করেছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে সরকারিভাবে ১০ হাজার ৩৫ এবং বেসরকারিভাবে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৬০ জন ছিলেন। ৭ হাজার ৫০৩ জন হজযাত্রীর কোটা ফাঁকা ছিল।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, হজ টিম সদস্যদের জন্য বিমানের টিকিট বরাদ্দ করতে হবে। সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনা ও হজযাত্রীদের সেবার কথা উল্লেখ করে এ বছর গঠিত বিভিন্ন হজ টিমের সদস্যদের জন্য কয়েকটি তারিখে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে টিকিট ইস্যু করতে বলা হয়েছে। মোট টিকিট লাগবে ৩৬২টি। ২৮ এপ্রিল থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ঢাকা থেকে জেদ্দা এবং ৫ জুন থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত জেদ্দা থেকে ঢাকায় আসার জন্য বিজনেস ক্লাস ও ইকোনমি ক্লাসের টিকিট প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মুহা. আবু তাহির। তালিকার মধ্যে চিকিৎসক ৮৫, নার্স ৫৫ এবং ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ ১৭৯ জন রয়েছেন। বাকিরা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তবে হজযাত্রীর সংখ্যা কমলেও তদারককারীর সংখ্যা এত বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছরই হজের কাজ তদারকির নামে অনেকটা গণহারে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সৌদি আরব যাচ্ছেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে গত বছরের চেয়ে এবারের সংখ্যা বেশি। সৌদি আরব যেতে কার নাম ঢোকানো যাবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা ও তদবির হয়েছে। তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বেশ কয়েকবার সৌদি আরব গেছেন। হজযাত্রীদের দেখভালের জন্য এত কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকারের টাকা এভাবেই গচ্চা যাচ্ছে।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন হাবের সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম। তিনি বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে যদি হজযাত্রীরা কষ্ট পায় তাহলে তিনি রেহাই পাবেন না, আমরাও রেহাই পাব না। হজ ব্যবস্থাপনায় অনেক অনিয়ম, দুর্নীতি ছিল। আমরা অন্যায় করব না, করতে দেব না এ সেøাগানে কাজ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাব অবস্থান নেয়।’

হাব সভাপতি আরও বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কোনো কর্মকর্তা স্থায়ী না, তারা দুই-তিন বছর পরপর বদলি হন, হজের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে তাদের স্বচ্ছ ধারণা নেই। তাদের কারণে হজ ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা আমরা চাই না। সরকারি কর্মকর্তারা কখনো বেসরকারি হজযাত্রীদের খোঁজ-খবরও নেন না। মিনা, মুজদালিফায় তারা কোনো দায়িত্ব পালন করেন না। সরকারি চার-পাঁচ হাজার হজযাত্রীর সেবার জন্য মাত্র ৪০ জন প্রয়োজন। কিন্তু সহায়তার নামে প্রশাসনিক টিমের বিশালসংখ্যক জনবল দেশ থেকে নেওয়া দেশের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।’

কিছুদিন আগে ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান জাতীয় সংসদে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের পাঠানো হয় হাজিদের খেদমতের জন্য।’

তার আগে হজ ব্যবস্থাপনা ও হাজিদের সেবার জন্য বিভিন্ন টিমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সৌদি আরবে পাঠানোর বিষয়ে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম তার প্রশ্নে বলেন, ‘প্রতি বছর অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি টাকায় হজে যান। সরকারি টাকা/অর্থ জনগণের টাকা। অন্যের টাকায় হজ সঠিক হবে কি না এবং যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী হজে যান তারা হাজিদের কতটুকু খেদমত করেন?’

জবাবে ধর্মমন্ত্রী বলেন, ‘হজ ব্যবস্থাপনা ও হাজিদের সেবা প্রদানের দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন টিমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সৌদি আরবে পাঠানো হয়। বাংলাদেশি হাজিদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের দেশটিতে পাঠানো হয়। সরকারি টাকায় হজ করতে তাদের পাঠানো হয় না। যারা যাচ্ছেন তারা কেউ হজ করতে পারেন না। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যাওয়া ও বয়স্ক হাজিদের চিকিৎসাসেবাসহ সব ক্ষেত্রে টিমের সদস্যরা হাজিদের যথাযথ খেদমত করে থাকেন। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, এবার বাংলাদেশের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮টি কোটা নির্ধারণ করে দেয় সৌদি আরব। হজের খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইলে চলে যাওয়ায় গত দুই বছর ধরে কোটা ফেরত যাচ্ছে। ২০২৩ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ ৬ লাখ ৮৩ হাজার এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা নির্ধারণ হয়। গতবারের তুলনায় এবার প্যাকেজের দাম ৯২ হাজার ৪৫০ টাকা কমানো হয়েছে। এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাওয়ার দুটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪০ টাকা। বিশেষ প্যাকেজের মূল্য ৯ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি প্যাকেজের মূল্য যথাক্রমে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮০০ এবং ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা।

সিভিল অ্যাভিয়েশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছরের চেয়ে ব্যয় কমিয়ে এ বছর হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যাতে সব পেশার মানুষ হজে যেতে পারেন। কিন্তু সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় অনেক এলাকায় বাড়ি ও হোটেল ভেঙে ফেলায় বাড়ি ভাড়া ব্যয় এ বছর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক নানা কারণে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় রিয়ালের মূল্যও বেড়েছে। মিনা আরাফায় তাঁবু ভাড়াসহ মোয়াল্লেম ফি বাড়ানো হয়েছে। বিমানের জ্বালানির দামও বেড়ে গেছে। এসবের কারণে হজের খরচ বেড়ে গেছে। অথচ ভারত ও পাকিস্তানে হজের খরচ অনেক কম। সরকারের উচিত সবদিক বিবেচনা করে হজের খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি দিক।

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, তদারকির নামে ধর্ম ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিমানও বাড়তি লোকজন পাঠায়। দিনে দিনে হজযাত্রীর সংখ্যা কমে আসছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পাঠানো জনবলের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত