১৯ বছর পর শীর্ষ লিগে সেই ওয়ান্ডারার্স

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৩০ পিএম

২০০৫ সালে ৫ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছে ৬-১ গোলে হেরে শীর্ষ লিগ থেকে অবনমন হয়েছিল ঢাকার ফুটবলের এক সময়ের সেরা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের। সেই নেমে যাওয়ার পর ফেরার অপেক্ষাটা যে এতটা দীর্ঘ হবে, কে ভেবেছিল? প্রায় দুই দশকের অপেক্ষা শেষে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি ফিরেছে শীর্ষ ফুটবলে। বুধবার কমলাপুর স্টেডিয়ামে বাফুফে এলিট অ্যাকাডেমির সঙ্গে গোলশূণ্য ড্র করে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের রানার্স-আপ হয়েছে তারা। আগের দিন পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাবকে হারিয়ে এই লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পেশাদার লিগের শীর্ষ স্তরে উঠেছে ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব। 

পেশাদার লিগের দ্বিতীয় স্তর থেকে এবার শীর্ষ লিগে জায়গা পাওয়া দু'টি দলের মধ্যে আছে অনেক মিল। দু'টি ক্লাবই এক সময় ঢাকার ফুটবলের আলোচিত নাম ছিল। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সফল ক্লাবগুলোর একটি ওয়ান্ডারার্স। প্রথম হ্যাটট্রিক লিগ শিরোপা জয়ের অনন্য রেকর্ড তাদের দখলে। অন্যদিকে ফকিরেরপুলের গায়ে ছিল জায়ান্ট কিলার তকমা। আবার অনেক তারকা ফুটবলারদের হাতেখড়িও হয়েছে এই ক্লাবে।

আবার দুটি ক্লাবই একটা সময় যোগ্য নের্তৃত্বের অভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। শীর্ষ ফুটবলে তাদের অনুপস্থিতিও অনেক দিনের। দুটি ক্লাব একই সঙ্গে কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে পাঁচ বছর আগে। ক্লাব পাড়ায় ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হলে যে ছ'টি ক্লাব সিলগালা হয়েছিল, সেগুলোর অন্যতম ফকিরেরপুল ও ওয়ান্ডারার্স। ক্যাসিনোকান্ডের কুশিলবদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৯ মাস এই ক্লাবগুলোতে অবাধে হয়েছে অবৈধ ক্যাসিনো কারবার। তাতে ভাবমূর্তী চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ক্লাব দু'টির। এরাই ক্যাসিনোর কলঙ্ক পেছনে ফেলে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে খেলা দিয়েই ফিরেছে শীর্ষ পর্যায়ে। 

যদিও সেরা হওয়ার পথটা মোটেও সহজ ছিল না দু'দলের। শেষ রাউন্ডে এসে তারা নিশ্চিত করতে পারে প্রিমিয়ারের টিকিট। মঙ্গলবার পিডব্লিউডিকে হারিয়ে ১৪ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ফকিরেরপুল। ওই হারের পরও প্রিমিয়ারের রেসে ছিল পিডব্লিউডি। আবার রানার্স-আপ হতে পারতো বাফুফে এলিট অ্যাকাডেমিও। তবে বুধবার ওয়ান্ডারার্সকে হারাতে না পারায় সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি এলিট অ্যাকাডেমির। পিডব্লিউডিরও শীর্ষস্তরে ফেরার স্বপ্ন ভেস্তে যায় তাতে। 

ওয়ান্ডারার্স ১৪ ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে হয়েছে রানার্স-আপ। এখন তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকার মতো দল গড়া। দলটির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, '২০২১ সালে বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রিমিয়ার লিগে নাম লিখানো। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে এ নিয়ে আমরা চতুর্থবারের মতো খেললাম এবং শেষবার এসে লক্ষ্যপূরণ করতে পেরেছি। এখন আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকার মতো দল গড়তে।'

এই ক্লাবে একসময় ফুটবল খেলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্লাবটির প্রধান পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর দলকে পুনরায় শীর্ষ লিগে ফিরিয়ে আনার বড় কৃতিত্ব অভিজ্ঞ কোচ ও সাবেক ফুটবল তারকা আবু ইউসুফের। তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর দলকে শীর্ষ লিগে ফিরিয়ে আনতে পারাটা বিশেষ ব্যপার। কোচিং ক্যারিয়ারে আমার অনেক সাফল্য আছে। তবে এটাকে আমি আলাদা করে রাখতে চাই।' বরাবরই স্পষ্টভাষী আবু ইউসুফ আরও বলেন, 'অনেক ঝড় ঝাপ্টা এসেছে। পেছন থেকে এসেছে নানা বাধা। ক্লাবের অনেকের অনেকরকম আবদার ছিল, নির্দেশনা ছিল। তবে আমি ছিলাম অটল। বলতে গেলে আকড়ে ধরে থেকে দলকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পেরেছি, এটাই আমার স্বার্থকতা।'

আর্থিকভাবে ভঙ্গুর দু'টি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সর্বোচ্চ স্তরে ফিরেছে প্রায় আড়াই মাসের লিগ শেষে। আসছে মৌসুমে দল গড়ার লক্ষ্যে তাই এখন থেকেই কাজ শুরুর করতে হবে তাদের। ভাবমূর্তী ও আর্থিক দু'টি সঙ্কটকে মোকাবেলা করেই টিকে থাকতে হবে তাদের। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও পেশাদার লিগ কমিটির প্রধান ইমরুল হাসানের বিশ্বাস, সকল প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে দু'টি ক্লাবই ভালোমানের দল গড়বে।

ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের খেলোয়াড়রা

বিজয়ীদের হাতে শিরোপা তুলে দেওয়ার পর এই কর্মকর্তা একটা হুশিয়ারিও দিয়ে দিলেন, 'ক্যাসিনো কান্ডে তাদের যতটুকু ভাবমূর্তী ক্ষুন্ন হয়েছিল, চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপ হয়ে শীর্ষ লিগে নাম লিখানোর মাধ্যমে সেট তারা পেছনে ফেলতে পেরেছে। আমরা আশা করবো তারা ভালো দল গড়বে। প্রিমিয়ারে সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত না খেলা অতীতে একটা অভ্যাসে রূপ নিয়েছিল। এরকমটা এবার হলে তিন বছর কোন পর্যায়েই ক্লাব লাইসেন্সিং করতে পারবে না। সেটা আমরা মনে করি অনেক বড় শাস্তি।'

দু'টি ক্লাবের কর্তারাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যে করেই হোক তারা দল গড়বে প্রিমিয়ার লিগে। তারপরও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের শেষ দিনে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দু'টির শীর্ষ লিগে খেলা এবং টিকে থাকাই এখন বড় প্রশ্ন।

এদিকে ঐতিহ্যবাহী দুই ক্লাবের উত্থানের আসর থেকে অবনমনের বিষাদে ডুবতে হয়েছে আরেক পুরানো ক্লাব ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিংকে। তাদের সঙ্গী হয়েছে নবাগত উত্তরা ফুটবল ক্লাব লিমিটেড। দু'টি দলকে সামনের বছর খেলতে হবে সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লিগ। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত