বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এক দ্বিতীয় জীবনের আখ্যান

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৯ এএম

বাংলা ভাষায় ছুরি আর চাকু শব্দ দুইটা শুনলে কি আলাদা আলাদা দ্যোতনা হয়? ছুরি শুনলে মনে হয় একটা ভয়ংকর অস্ত্র, যা দিয়ে ছুরিকাঘাত করা হয়। অন্যদিকে চাকু শুনলে মনে হয় একটা নিরীহ যন্ত্র, যা দিয়ে ফল কাটা হয়। হয়তো মনে হয় না। হয়তো এই মনে করাটা একেবারেই অবান্তর। তবে শব্দের দ্যোতনা খুব জরুরি একটা ব্যাপার। এর শক্তি দারুণ। এই শক্তিকে যেসব সাহিত্যিকরা দারুণভাবে ব্যবহার করতে পারেন তাদের একজন সালমান রুশদি। অথচ, উনার নতুন বই, যার আলোচনা করতে এই লেখাটির অবতারণা, তা শব্দের মারপ্যাঁচের চেয়ে প্রগাঢ় অনুভূতি, ভালোবাসার শক্তি আর অশুভের বিরুদ্ধে এক সুন্দর দুনিয়ার বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছে দারুণ আবেগ আর সরাসরি শব্দচয়নে।

ছুরি : এক হত্যাচেষ্টার পর ধ্যানসমূহ (নাইফ : মেডিটেশনস আফটার এন এটেম্পটেড মার্ডার) বইটি অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ছুরি কী? রুশদির ভাষায় ছুরি দিয়ে বিয়ের কেক কেটে দুজন মানুষের জীবনকে একত্রিত করা যায়। রান্নাঘরে চাকু লাগে, এমনকি দর্শনের ভাষায় ওকাম’স রেজর নামে একটা দার্শনিক ধারণা আছে। এর অর্থ চাকুর মতো এক চিন্তা, যা দিয়ে সব জটিল ধারণা আর সন্দেহকে কেটে ফেলে সহজতম ব্যাখ্যাকেই কেবল ধারণ করা হয়। ছুরি কেবলই একটি যন্ত্র, যার ভালোমন্দ নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। পরক্ষণেই আবার রুশদি ভাবেন, এত বড্ড ক্লিশে আলাপ। বন্দুকও কি আসলে তাই না? মানুষই তো খুন করে, বন্দুক তো আর না?

কিন্তু তিনি উত্তর দেন বন্দুক আর ছুরি এক না। বন্দুকের কেবল একটাই উদ্দেশ্য হত্যা করা, তা মানুষ হোক বা অন্য কোনো প্রাণী। কিন্তু ছুরি তেমন না। ভাষাও অনেকটা ছুরির মতো। ভাষা দুনিয়াকে কেটে উন্মুক্ত করে দিতে পারে এর সব, গোপনীয়তা, সব সত্য। ভাষা এক বাস্তবতা থেকে অন্য বাস্তবতাকে ফালি ফালি করে দিতে পারে। চিরে দিতে পারে সব রকম অশুভ চিন্তা আর উন্মোচন করতে পারে সত্য সুন্দরের। যেই ছুরির আঘাত প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হয়েছিল রুশদির, সেই ছুরির দর্শনেই তিনি আবার উজ্জীবিত হন গোটা দুনিয়ার সামনে ভালোবাসা, অদম্য মনোভাব আর অশুভের সঙ্গে শুভের লড়াইয়ে শামিল হতে । তার ভাষা দিয়ে।

রুশদি এক নির্মম আক্রমণের শিকার হন ২০২২ সালের ১২ আগস্ট। কাকতালীয়ভাবে, বিশ্বব্যাপী লেখকদের নিরাপত্তা দেওয়ার এক সেমিনারে তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে অন্তত পনেরোবার ছুরিকাঘাত করেন এক ২৪ বছর বয়সী তরুণ। সেই তরুণ নিজেই দাবি করেছেন তিনি কখনো এই ৭৫ বছর বয়সী লেখকের কোনো লেখা দুই পাতার বেশি পড়েননি, কিন্তু ইউটিউবের কিছু ভিডিও শুনে এই মুসলিম তরুণের মনে হয়েছে, রুশদি একটা শয়তান আর তাই তাকে হত্যা করতে হবে।

অথচ পরিবার থেকে প্রতিবেশী সবাই জানতো এই তরুণ বেশ ভদ্র, একাকি থাকতে পছন্দ করে। রুশদি এক অর্থে সৌভাগ্যবান যে, এই আক্রমণকারীর তেমন প্রশিক্ষণ ছিল না। ফলে ১৫টি আঘাতেও উনি বেঁচে যান। যদিও ডান চোখটা চিরদিনের জন্য হারান। আর প্রায় বছরখানেক অগণিত মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায়, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে লেখার মতো সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সেই গল্পটাই রুশদি করেন পুরো বইয়ে। যারা রুশদি পড়ে অভ্যস্ত তাদের কাছে বেশ এক অচেনা রুশদি। স্বভাবসুলভ উইট থাকলেও তা অনেকটাই পরিশীলিত। ভাষা কিংবা ম্যাজিক রিয়ালিজমের জাদুর চেয়ে স্পষ্ট করে নিজের অভিজ্ঞতা বলার দিকেই পুরো মনোযোগ। বিশ্বসাহিত্যের নানারকম রেফারেন্সে দুর্দান্ত সাবলীল বর্ণনা।

একেবারে তরুণদের মতো উচ্ছ্বাসে তিনি বিবরণ দেন বছর তিরিশের ছোট স্ত্রীর সঙ্গে দারুণ এক প্রেমের গল্পের। স্ত্রী এলিজার সুবাদে কাব্যজগৎ আর ব্ল্যাক আমেরিকান সমাজের সঙ্গে পরিচয়। এরপর পুরোটা বইয়ে কীভাবে এই স্ত্রী উনার সুস্থ হয়ে ওঠার পুরো সংগ্রামে ছিলেন সেই ভালোবাসাময় বর্ণনা। দিন শেষে পরিবারই সব, রুশদি তা প্রমাণ করে ছাড়েন, সঙ্গে বহুদিনের বন্ধুদের শর্তহীন ভালোবাসা।

অনেকগুলো গতিশীল অধ্যায়ে এসেছে এক চোখ হারিয়ে, নিদারুণ শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে নিজের সুস্থ হয়ে ওঠার বিবরণ। নিজের দ্বিতীয় জীবনে তিনি ফিরে ফিরে তাকিয়েছেন তার আগের সৃষ্টির দিকে। অক্লেশে বলেছেন একই সঙ্গে নিজের গৌরব আর গ্লানির গল্প। রুশদি যেন হয়ে গেছেন এক শিশু।

পিকাসো যেমনটা বলতেন যে শিশুর মতো আঁকতে পারাটাই মাস্টার আর্টিস্টের লক্ষণ। রুশদির নবজন্ম তাকে যেন সেই বোধিসত্তে লাভ করিয়েছে। শেষ উপন্যাস ভিক্টোরি সিটির পর পরিকল্পিত আরেকটি উপন্যাসের বদলে তাই তিনি আত্মজীবনী লিখেই নিজের পুনর্জন্মকে উদযাপন করলেন।

লেখাই লেখকের উজ্জীবনী শক্তি। কিন্তু রুশদি, যার নাম রাখা হয়েছিল দার্শনিক আবু রুশদের নামে, তিনি মনে করেন না লেখা দিয়ে উপশম সম্ভব। আবার একই সঙ্গে তিনি মানেন যে, লিখে যেতে হবে। লেখা দিয়ে বুলেট রোখা যায় না, বোমা ঠেকানো যায় না, কিন্তু লেখা রয়ে যায়। সন্ত্রাসের চেয়ে, অত্যাচারের চেয়ে লেখার স্থায়িত্ব বেশি। চিন্তাকে কখনো মেরে ফেলা যায় না,  জিওর্দানো ব্রুনো, নাজিম হিকমত, লোরকা কিংবা নাগিব মাহফুজরা বারবার তা প্রমাণ দিয়ে গেছেন।

মিলান কুন্ডেরা যদিও বলতেন, জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ বলে কিছু নেই। জীবন একটাই। লিখতে গিয়ে কুন্ডেরার মতো অস্তিত্বে লঘুতার অসহনীয়তা টের পেলেও তাকে ভুল প্রমাণিত করতে পেরে রুশদি উজ্জীবিত। দ্বিতীয় জীবনে তিনি আরও উচ্ছল, ওকাম রেজারের মতো আরও বেশি ক্ষুরধার। তিনি সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জটা নেন সুখী জীবনের গল্প বলার।

তাই তো, এক কাল্পনিক সংলাপের মাধ্যমে তিনি তার হত্যাচেষ্টাকারীকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলেন। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা নয়, স্রেফ অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। এই শক্তি দ্বিতীয় জীবনের, এই শক্তি জীবনসংগ্রামের, এই শক্তি লেখকের দর্পের।

অর্ফিয়াসকে খুন করার পর তার কাটা মাথা যখন নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল তখনো তাতে লেগেছিল হাসি। সেই হাসি শেলের মতো বিধে হত্যাকারীদের, হত্যা করতে চাওয়া অশুভ চিন্তাকে। ছুরি দিয়ে কেটে ফেললেও, সেই ক্ষত দিয়ে বরং আলো ঢোকে, আরও উজ্জ্বল হয় লেখা আর চিন্তা। যা তোমাকে মারতে পারে না, তা তোমাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

এক সুপাঠ্য বইয়ের এই মনে হয় মূল কথা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত