শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা-বন্ধে তুঘলকি সার্কাস

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ১১:১৩ এএম

রোদ-গরমের তীব্রতায় বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে বিটুমিন গলতে থাকায় এখন বলা হচ্ছে, এগুলোতে ব্যবহার করা বিটুমিনে গোলমাল ছিল। যা তীব্র গরম সহ্য করার উপযোগী নয়। তার আগ পর্যন্ত এগুলোর গুণমানের প্রশংসা ছিল। অবশ্য, অনেকে তপ্ত রোদে গলে যাওয়া পিচ দিয়ে মার্বেল বানিয়ে খেলার শৈশব কাটিয়েছেন বলেও শোনা যায়। তবু এসব নিয়েই উন্নয়নের তাল-তবলা তো বাজছিলই। তাপপ্রবাহ এখন একটা ভেজাল লাগিয়ে দিয়েছে। গরমের এ ভয়াবহতা না নামলে তা কোনো ব্যাপারই ছিল না। বিটুমিনের গলদও থেকে যেত অজানা। গরমের তোড়ে কয়েকজন শিক্ষকের মৃত্যু, শিক্ষার্থীর কাহিল দশার পর সার্কাসের মতো ধরা পড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ-খোলার মতো সিদ্ধান্তহীনতার অসারতা ও চিন্তার দৈন্য। পুরোটাই যেন এ সেক্টরের মহাময়দের মনমর্জি। কেন বন্ধ, কেন খোলা, কেনই বা খুলে আবার আংশিক বন্ধ-খোলার কানামাছি? বিষয়টি শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে গড়িয়েছে। যেমনটি গিয়েছিল প্রাক-রোজায়।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বন্ধ করে দেওয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার শিডিউল ছিল ২৮ এপ্রিল রবিবার। এর আগের দিন শনিবার দুই মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে পৃথকভাবে এ শিডিউলের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে, বন্ধ ঘোষণার সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরে আলাদা বিজ্ঞপ্তি দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। জানায়, চলমান তাপপ্রবাহে শিশুশিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা বিবেচনায় ২১ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিশুকল্যাণ ট্রাস্টের বিদ্যালয় ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর লার্নিং সেন্টারগুলো বন্ধ থাকবে। যাই হোক, যথারীতি ২৮ এপ্রিল শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। পরিবর্তিত রোটায় সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কারও হাতে পানির বোতল, কারও হাতে তরল খাবার। সেগুলো সঙ্গে নিয়েই তীব্র গরমের মধ্যে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার তোড়জোড় ছিল সবার। কিন্তু একদিন ক্লাসের পর রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি জেলার সব মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সোমবার বন্ধ ঘোষণা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ঢাকা ছাড়া বাকি জেলাগুলো হলো চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা ও রাজশাহী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের বিশেষ অংশে বলা হয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা আছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখা যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর রাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই। যেহেতু প্রাথমিকের সব ক্লাস সকালে হবে, তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলাই থাকবে।

প্যাঁচ-প্যাঁচালের অন্ত আছে? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া বিভাগসহ কত কিছু নিয়ে টান দেওয়া বিজ্ঞপ্তি! ভাষার কী বহর? ভাবা যায়, কোথায় কেমন তুঘলকের খড়গে ঝুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো? কত হুকুমের যে শিকার! মহামারী করোনার সময় শিক্ষার পাঠদান অনলাইনে আনা হয়েছিল। পাক্কা বছর গেছে অফলাইনে ফিরতে। করোনাকালে এসএসসি-এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা পর্যন্ত হয়ে গেছে আগের পরীক্ষার গড় মার্কের হিসাবে। যা দুনিয়ার আরও অনেক দেশেই হয়েছে। পরিস্থিতির অনিবার্যতায় তা সয়ে গেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা নিয়তির মতো তাতে অভ্যস্তও হয়েছে।

এবারের পরিস্থিতিটাও করুণ। করোনার সঙ্গে তুল্য না হলেও তাপপ্রবাহে কষ্টের ব্যাপকতায় অনেক। কিন্তু এ সময় এসে শিশু,  প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি মিলিয়ে একটা কাউর বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে গৎবাঁধা আরও কত কী? কাজ নাই তো খই ভাজার এক উৎকৃষ্ট ও টাটকা উদাহরণ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির এক জায়গায় বলা হয়, এক পালায় (শিফটে) পরিচালিত বিদ্যালয়গুলো প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলবে। আর দুই পালায় বিদ্যালয়গুলোয় প্রথম পালা সকাল ৮টা থেকে সকাল সাড়ে ৯টা এবং দ্বিতীয় পালা সকাল পৌনে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলমান থাকবে। তবে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। আর দাবদাহ সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত অ্যাসেম্বলি বন্ধ থাকবে। বিবৃতিগুলো পড়লে সামান্য বাংলা জানা লোকদের পক্ষেই বোঝা সম্ভব যে, কী নিয়ে আছে বা থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ এর সঙ্গী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো। গরমের ছুটিছাটার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পর্যন্ত এ হিসাবের বাইরে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসহ সামগ্রিক নমুনায় ইউজিসি অনেকটা রয়ে-সয়ে চলছে। সামনে কী হয় আল্লাহ মালুম।

স্কুলপর্যায়ে রোজার আগে কদিন এমন ছুটির ঘোষণায় তর্ক চলেছে ক্লাস চলা না চলা নিয়ে। বিষয়টিকে আদালতে পর্যন্ত ঠেলে নেওয়া হয়েছে। মানুষকে দেওয়া হয়েছে ঈদপূর্ব বাড়তি বিনোদন। ঈদের ছুটি শেষে গত ২১ এপ্রিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে তা পেছানো হয় আরেক সপ্তাহ। এর মাঝে তাপপ্রবাহ চলাকালেই ২৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২৮ এপ্রিল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথারীতি ক্লাস শুরুর কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী ক্যাটাগরি অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ক্লাসে এসে অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকলে বাধে বিপত্তি। বিশেষ করে দুজন শিক্ষকের হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোন জেলার তাপমাত্রা কেমন, তা জেনে অঞ্চলভেদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। মানে মরলে এক হিসাব, না মরলে আরেক। মরা-না মরার ওপর সিদ্ধান্তের আচানক কায়কারবার।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর নিজস্ব কিছু ভাবনা আছে। তা তিনি বলেছেনও।  কোনো একটি বা দুটি জেলার বা ঢাকার তাপমাত্রা বিবেচনা করে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে বলেছেন তিনি। প্রশ্ন রেখে এও বলেছেন, কিছু হলেই স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার এত আলোচনা কেন আসে? বাংলাদেশে কি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই? এখন সবকিছু খোলা থাকবে আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে, তা ঠিক নয়। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনো জেলায় যদি ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা যায় সেখানকার আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আলোচনা করে স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। চাইলে তারা পাঠদানের সময়ও পরিবর্তন করতে পারেন।’ মন্ত্রীর কথা ও বোধ একদম পরিষ্কার। তার এ ধরনের কথায় কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কারও কাছে তা উচিত এবং সময়োপযোগী কথা। বিপরীতে কারও কারও কাছে মনোকষ্টের-বিরক্তির। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে মন্দকথা অনেক। ট্রলও হয়েছে। জবাবও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, এসব দিয়ে রাষ্ট্র চলে না।

তাপপ্রবাহে স্কুল-কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপত্তি ছিল না। এটি বাস্তবতার অনিবার্যতা। তালগোলটা হুট করে খোলা আবার বন্ধের মনগড়া সিদ্ধান্ত আরোপ নিয়ে। মনের এই অবাধ গড়নের মাঝেও আবার ফের। ঢাকাসহ ৫ জেলার মাধ্যমিক স্কুল-কলেজ সোমবার বন্ধ, তবে প্রাথমিক স্কুল খোলা।  বাচ্চাদের কি গরম লাগে না? আবার এসি থাকলে ক্লাস। তালগোল বা আউলা-ঝাউলা পাকিয়ে ফেলার নতুন নজির। সকালে হেভি কনফিডেন্সে এক কথা। বিকেলে আরেক। গরমের গোলমাল না, বড় কেদারায় আসীন থাকলে যা ইচ্ছা মনে করার যথেচ্ছ স্বাধীনতা? শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কেবলই শিকার?

আবহাওয়াবিদ না হলেও যে কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব, বৃষ্টি না নামা পর্যন্ত তাপপ্রবাহ কমবে না। বিষয় অনেকটা ‘রোগ সেরে গেলে রোগী ভালো হয়ে যাবে ইনশাল্লাহর’ মতো। সেই পর্যন্ত অন্তত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের কথা ভাবনায় নিলেও এমন বিপত্তি বাধত না। ততক্ষণ পর্যন্ত অনলাইনে তাদের পাঠদানের ফের একটি রিহার্সেল চলতে পারত। এরপরও গরমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের সুস্থতার দিকটাও মাথায় রাখা দরকার ছিল। অফিসে, গাড়িতে, বাসায় এসিতে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অভ্যস্তদের এসব ভাবনা না আসাও স্বাভাবিক। মাঠের চিত্র জানলে, আলো-বাতাসের সহচর হলে ভাবনায় নেওয়ার মতো আরও অনেক বিষয়ই আছে। শহরে প্রায় সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিভাবকরা স্কুলে যাতায়াত করেন। অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে দাদা-নানার মতো বয়সী স্বজন থাকেন। বহু স্কুলে বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাইরে ছুটি হওয়ার আগ পর্যন্ত রোদে অপেক্ষা করেন। সবার এসি গাড়ি নেই। অনেকে হেঁটেও আসে। গরমে রাস্তায় যারা হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছেন তারা প্রায় সবাই পূর্ণবয়সী। তাপদহনের সহ্য করার ক্ষমতা না থাকার মতো। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখলে এখন এত ক্যাচাল-কাউর নাও লাগতে পারত। যার একটিও অনিবার্য ছিল না।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত