সিন্ডিকেটে জিম্মি বেওয়ারিশ লাশ

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৫১ পিএম

মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মানুষের মরদেহের বিভিন্ন অংশ ব্যবচ্ছেদ করার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় মরণোত্তর দেহ অথবা বেওয়ারিশ লাশ। নানা কারণে দেশে মরণোত্তর দেহ দান বাড়ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের ভরসা বেওয়ারিশ লাশ। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় শনাক্তের কারণে বেওয়ারিশ লাশও এখন কম পাওয়া যাচ্ছে। 

অপরদিকে সরকারি হাসপাতালে বেওয়ারিশ লাশ বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে যারা বেওয়ারিশ লাশের স্বজন বানিয়ে চক্রের সহযোগীদের নিয়ে আসে এবং লাশ বুঝে নেয়। এরপর সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ও শিক্ষার্থীদের কাছে টাকার বিনিময়ে সেই লাশ বিক্রি করে দেয়। 

জানা যায়, শিক্ষার্থীরা মানুষের শরীরের কোন অংশ দিয়ে কি গিয়েছে তা এই মরদেহ থেকে হাতে কলমে শিক্ষা পায়। ১ম ও ২য় বর্ষের এনাটমির শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাই হচ্ছে এর উপরে। এনাটমির শিক্ষার্থীদের মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। এই শিক্ষার্থীদের ৫ম বর্ষে গিয়ে সার্জারী করতে হয়, তারা যাতে সার্জারীতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে সে জন্য মরদেহে কাচি চালিয়ে তাদের সেই দক্ষতা অর্জন করতে হয়। 

দেশের মেডিকেলগুলো মূলত ২টি উপায়ে মানুষের মরদেহ পেয়ে থাকে। প্রথমত, যারা মৃত্যুর আগে মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করে যান এবং দ্বিতীয়ত বেওয়ারিশ লাশ। আমাদের দেশে সামাজিক ও পারিবারিক কারণে মরণোত্তর দেহ দানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে মেডিকেলের এনাটমি বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বেওয়ারিশ লাশই ছিল পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য ভরসা। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে বেওয়ারিশ লাশ কমে যাচ্ছে, এখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত বাড়ছে। ফলে কমছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা।

বেওয়ারিশ লাশ কমার আরও একটা বড় কারণ হচ্ছে, মেডিকেলের লাশ বাণিজ্য। মেডিকেলে যখন পরিচয়বিহীন কোনো লাশ আসে তখন নানা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। এই চক্র মূলত গড়ে উঠে মর্গের নিয়োগপ্রাপ্ত ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের (ডোম) সমন্বয়ে। এই চক্রের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে হাসপাতালের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। এই চক্র দেশের সরকারি ও বেসরকারী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে বেওয়ারিশ লাশের কঙ্কাল বিক্রি করে এবং বেসরকারী মেডিকেলে বেওয়ারিশ লাশ বিক্রি করে।

এই চক্র বেওয়ারিশ লাশ মেডিকেলের মর্গে আসার পর থেকে টার্গেট করে। তারা লাশের স্বজন বানিয়ে চক্রের সহযোগীদের নিয়ে আসে এবং লাশ বুঝে নেয়। এরপর ডোমরা মেডিসিন ব্যবহার করে লাশ পঁচিয়ে কঙ্কাল বানায় এবং তা বিক্রি করে। আবার যে লাশের অবস্থা ভালো থাকে সেটা লাশ হিসেবেই বিক্রি করে বেসরকারী মেডিকেলে। লাশ ও কঙ্কালের প্রধান গ্রাহক হচ্ছেন বেসরকারী মেডিকেলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। একেকটি লাশ বিক্রি করতে ৩৫ থেকে ৭০ হাজার টাকার লেনদেন হয়। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লায়লা আঞ্জুমান বানু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে প্রচুর বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যেত যা আমরা মেডিকেল থেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় ব্যবহার করতাম। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রচুর লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে বেওয়ারিশ লাশ কমছে। এছাড়া আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে তা দাফন করে। ফলে বেওয়ারিশ লাশ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। 

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম গত ১২ বছরে ১৩ হাজার ৩২৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ১০০–এর বেশি লাশ দাফন করে সংস্থাটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুগধা মেডিকেলের এনাটমি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, আমি ৯ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। আগে প্রচুর বেওয়ারিশ মৃতদেহ পাওয়া যেত, এখন তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করায় আমরা বেওয়ারিশ লাশ ও পাচ্ছি না। অপরদিকে মেডিকেলে বেওয়ারিশ লাশ বিক্রির একটা চক্র কাজ করে তাদের জন্য বেওয়ারিশ লাশ আমরা নিতে পারি না। তারা বিভিন্ন পন্থায় এই লাশ বিক্রি করে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেলের এনাটমি বিভাগের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই বছরের শুরুতে আমি এক সিনিয়রের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে একটা কঙ্কাল কিনি। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিছু দালাল আছে আমার অনেক বন্ধুরা তাদের কাছ থেকে কঙ্কাল কিনেছে। 

গত এক দশক ধরে মরণোত্তর দেহ ও অঙ্গদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মৃত্যুঞ্জয়। সংগঠনটির সমন্বয়ক সাগর লোহানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেওয়ারিশ লাশ বিক্রির একটা চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র চায় না দেশে মরণোত্তর দেহদানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক। এ জন্য তারা নানা ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা চালায়। বিভিন্নভাবে মরণোত্তর দেহ দানের বিপক্ষে প্রচারণা চালায়। 

একটা মেডিকেলের উদাহরণ দিয়ে সাগর লোহানী বলেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বামীর মরদেহ মেডিকেলে দিতে গেলে ওই মেডিকেলের এনাটমি বিভাগের অফিস সহকারী ওই মহিলাকে মরদেহ দান না করে কবর দিতে প্ররোচণা করেন। 

তিনি বলেন, মরণোত্তর দেহ দানের বিরুদ্ধে যে প্রচারণা বা প্রচেষ্টা এটা সামাজিক বা ধর্মীয় নয় এটা সম্পূর্ণ আর্থিক। যতদিন মরণোত্তর দেহ দান বাড়বে না ততদিন তাদের লাশ বাণিজ্য চলবে।ৎ

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত