শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সড়কে এপ্রিলে মানবসম্পদের ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:২৬ এএম

সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে হতাহতের খবর প্রায়ই শোনা যায়। শুধু হতাহতই নয়, এসব দুর্ঘটনায় মাসে হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতিও হয়। শুধু গত এপ্রিল মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ২ হাজার ১১৯ কোটি ১১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার মতো। গতকাল রবিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশন থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এমন হিসাব দেওয়া হয়েছে। দেশের সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এ সংগঠনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।  

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনার অনেক তথ্য অপ্রকাশিত থাকে, সে জন্য ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাবের সঙ্গে আরও ৩০ শতাংশ যোগ করতে হবে। আইআরএপি (ইন্টারন্যাশনাল রোড অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম) মেথড অনুযায়ী হিসাবটি করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ যানবাহন বা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তার তথ্য না পাওয়ার কারণে সম্পদের আর্থিক পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে গণমাধ্যমে যতগুলো দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এপ্রিল মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬৭২টি। এতে নিহত হয় ৬৭৯ জন এবং আহতের সংখ্যা ৯৩৪। (তবে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ২ হাজারের বেশি হবে) নিহতের মধ্যে নারী ৯৩ ও শিশু ১০৮ জন। ৩১৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২৫৯ জন, যা মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৭ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১১৩ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৯৬ জন, অর্থাৎ ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এই সময়ে ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছে (একটি লঞ্চে আগুন ধরলে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ৬০ জন আহত হয়)। ৩৮টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছে।   

দুর্ঘটনার যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ২৫৯ জন (৩৮.১৪%), বাসের যাত্রী ৩৪ জন (৫%), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-ড্রামট্রাক আরোহী ৬৫ জন (৯.৫৭%), প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস-পাজেরো জিপ আরোহী ৪৫ জন (৬.৬২%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ১৩১ জন (১৯.২৯%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-পাওয়ারটিলার) ২২ জন (৩.২৪%) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা আরোহী ১০ জন (১.৪৭%) নিহত হয়েছে।  

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনার মধ্যে ২৩৫টি (৩৪.৯৭%) জাতীয় মহাসড়কে, ২৬৬টি (৩৯.৫৮%) আঞ্চলিক সড়কে, ৮৭টি (১২.৯৪%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৭৯টি (১১.৭৫%) শহরের সড়কে এবং ৫টি (০.৭৪%) অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। 

দুর্ঘটনার মধ্যে ১৭৪টি (২৫.৮৯%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৬২টি (৩৯%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১২০টি (১৭.৮৫%) পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৯৭টি (১৪.৪৩%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৯টি (২.৮২%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে। 

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে ভোরে ৫.৩৫%, সকালে ২৪.৮৫%, দুপুরে ২০.৫৩%, বিকেলে ১৫%, সন্ধ্যায় ১০.২৬% এবং রাতে ২৩.৯৫%। 

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে ১৯.০৪%, প্রাণহানি ২৬.১৯%; রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪.৭৩%, প্রাণহানি ১১.৪৫%; চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯.৬৪%, প্রাণহানি ১৭.৪১%; খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪.২৮%, প্রাণহানি ১১.৬০%; বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.৬৯%, প্রাণহানি ৮.৭৭%; সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.০৫%, প্রাণহানি ৭%; রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.১১%, প্রাণহানি ১০.২৬% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৪১% ও প্রাণহানি ৮.৩৩% ঘটেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৭৬ জন নিহত হয়েছে। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৩৪টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত হয়েছে। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪৩টি দুর্ঘটনায় ৪৯ জন নিহত হয়েছে। সবচেয়ে কম শরীয়তপুর ও বান্দরবান জেলায়। এই দুটি জেলায় স্বল্প মাত্রার ৫টি দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যায়নি।

রাজধানী ঢাকায় ৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ৬৬ জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৭৩ জন নিহত হয়েছিল। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৮ দশমিক ৪৮ জন। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ২২ দশমিক ৬৩ জন। এই হিসাবে এপ্রিল মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ২২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮টি পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কেউ বেঁচে নেই। 

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্তির সঙ্গে তার পুরো পরিবার ভুক্তভোগী হয়। এই ক্ষতি নির্ধারণ করা খুব কঠিন হয়ে যায়। তবে ২ হাজার কোটির টাকার বেশি যে হিসাব আছে, সেটার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হয় সব মিলিয়ে। এখন সড়ক নিরাপদ না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেমন একদিকে বাড়তে থাকবে, অন্যদিকে এই ক্ষতির পরমিাণও বাড়তে থাকবে। তাই সড়ককে নিরাপদ করতে হলে বিজ্ঞানসম্মত অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত