রনোতে বামতন্ত্রের অসমাপ্ত রেখা

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০২:০০ পিএম

রাজনীতি ও জীবন লড়াইয়ের একটা অসমাপ্ত রেখা টেনে গেছেন হায়দার আকবর খান রনো। কেবল বাম নয়, ডান, মধ্যম সবদিকেই এমন ধাতুর ব্যক্তির সংখ্যা খুব কম। ৮২ বছর বয়সে রনোর মৃত্যুটা আকস্মিক ছিল না। শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন। সঙ্গে কাশিও। চব্বিশ ঘণ্টাই থাকতে হতো অক্সিজেন নিয়ে। ভুল চিকিৎসায় একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে আগেই। আরেক চোখে ঝাপসা দেখতেন। এ অবস্থায়ও ডিকটেশন দিয়ে উপসম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। বই লেখার কাজও করেছেন। অসংখ্য বইয়ের লেখক হায়দার আকবর খান রনো মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা বইয়ের কাজও শেষ করে এনেছিলেন। সব পেছনে ফেলে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন লড়াইয়ের মাঠে আমৃত্যু নিজেকে সঁপে দেওয়া কমরেড হায়দার আকবর খান রনো। তিনি কখনো মন্ত্রী-এমপি ছিলেন না। সেই পথে পাও বাড়াননি। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পর তার জন্য কারও অতল শ্রদ্ধা, কারও গভীর শোক। এই শ্রদ্ধা, শোক কি বলার জন্যই বলা? না-কি মন থেকে? জীবিতাবস্থায় অবহেলা-অচেনা থাকাদের নিয়ে শোকবার্তা এই নিয়তি নিত্য রিক্ত নিঃস্ব হওয়া মেহনতি মানুষের গণআন্দোলনের নেতা রনো ভাইয়ের ললাটেও জুটেছে।

ছাত্রজীবনে দুর্দান্ত মেধাবী ছিলেন হায়দার আকবর খান রনো। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে মেধা তালিকায় ১২তম হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে। হুলিয়া, কারাবাস ও অন্যান্য কারণে পদার্থবিদ্যার পাঠ শেষ করতে পারেননি। পরে কারাগারে থেকেই আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি পান। কিন্তু, ওকালতি পেশায়ও যাননি। থেকেছেন রাজনীতি আর লেখালেখি নিয়েই। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন এমনকি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ওপরও তার বহু লেখা রয়েছে। সংখ্যায় অন্তত ২৫টি। তার প্রথম বই প্রকাশ হয় ২৪ বছর বয়সে। নাম ‘সাম্রাজ্যবাদের রূপরেখা’। ভাবা যায় ২৪ বছরের যুবকের চিন্তা ও ভাবনার দৌড় সীমানা? 

রাজনৈতিক ফায়দা না নিয়ে জুলুমমুক্ত দেশ গঠনের লড়াইয়ের অগ্রভাগের সৈনিক তিনি। কিন্তু, নিজে তা জাহির করতেন না। গণমাধ্যমেও সেই প্রচার-প্রকাশনা নেই বললেই চলে। আমাদের প্রজন্মের অন্যতম এই আদর্শিক মেন্টর রনো ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়টা ছাত্রজীবনে। তা কিছুটা রাজনৈতিক কারণে, বাকি বেশিটা একেবারেই পেশাগত। মাঝেমধ্যে দেখা, মাঝেমধ্যে কথা হতো। বহুবার তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে তাকে কমরেডের চেয়ে আরও কিছু মনে হয়েছে আমার। রাজনীতিকের চেয়েও বেশি মনে হয়েছে একজন অগ্রসর চিন্তার সাধক হিসেবে। আপাদমস্তক সজ্জন-বিনয়ী। পরিশীলিত, সুনাগরিক, সর্বোপরি অগ্রসর চিন্তাশীল মানুষ। প্রগতিশীলতা হচ্ছে গতির দিকে, আলোর দিকে অগ্রসর হওয়া। নানা বাঁকবদল করতে হয় প্রগতিশীলতাকে। প্রগতিশীলতার মূল মানদণ্ড মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতীয়তা, ভাষা দিয়ে বিচার না করা। প্রগতিশীলতা মানুষকে দেখে শ্রেণির দৃষ্টিতে। শোষক-শোষিত, অত্যাচারী-অত্যাচারিত, বেশি পাওয়া-বঞ্চিত, ক্ষমতার অধিকারী-ক্ষমতাহীন এই মোটাদাগের বাইনারিতে। বাইনারিতে স্থির থাকাই প্রগতিশীলতা নয়। শোষিতের ভেতরেও উপশোষণের নানা ফের বিবেচনায় নিতে হয় তাকে। রনো তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন নীরবে। এক সন্তানের জনক হায়দার আকবর খান রনো তার কর্নিয়া দান করে গেছেন।

রনোর পৈতৃক নিবাস নড়াইলের বরাশুলা গ্রামে। জন্ম নানার বাড়িতে ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের কলকাতায়। তার নানা সৈয়দ নওশের আলী তখন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ। কংগ্রেস ছেড়ে ঝুঁকেছিলেন বামপন্থার দিকে। মামা ট্রেড ইউনিয়ন নেতা সৈয়দ মনসুর জিলানি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে। ওই আবহ রনোর মধ্যে কমিউনিজমের প্রতি বেশির চেয়েও বেশি টান তৈরি করে থাকতে পারে। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বামপন্থি আন্দোলনের পুরোধা রনো শেষ জীবনেও ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠ। রাজনীতির ক্লেদ- খেদের মাঠে নিজেকে লোভমুক্ত রেখে আজীবন করে গেছেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াই। কিন্তু, সেই মুক্তি না আসায় হতাশ হননি। ব্যক্তিত্ব ও আদর্শিক জায়গায় অটুট থাকা রনো ভাই তার স্বপ্নের রাজনীতির বাস্তব প্রতিফলন না দেখেও কখনো হতাশা ব্যক্ত করেননি। তার প্রধান মনোযোগ ছিল মার্ক্সবাদী তত্ত্বমূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনায়, বই লেখায়, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের ওপর নানা বিষয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিদের ভূমিকা নিয়ে গ্রন্থ রচনায়। তার লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ ষাটের দশক ও সত্তরের দশকের প্রথমার্ধকে মূর্ত করে তোলে পাঠকের কাছে। রাজনীতি ও সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০২১ সালে হায়দার আকবর খানকে ভূষিত করা হয় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে।

একাত্তরে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরে কেন্দ্রীয় ঘাঁটি করে মুক্তিযুদ্ধ করা কথিত পিকিংপন্থিদের একত্র করে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গঠনের অন্যতম ব্যক্তি তিনি। মওলানা ভাসানীর অবর্তমানে তাকেই প্রধান করে এই কমিটির ২ জুন ১৯৭১ তারিখে ঘোষিত ঘোষণাপত্রের  রচয়িতাও ছিলেন রনো। সঙ্গে কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, আবদুল মান্নান ভূঁইয়ারা। পরবর্তীকালে এই ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ অপর দুটি কমিউনিস্ট গ্রুপ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার) ও কমিউনিস্ট সংহতি কেন্দ্র একত্র হয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী) নামে প্রকাশ্য কমিউনিস্ট পার্টির  সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন তিনি। এরপর ভাসানী ন্যাপ থেকে বেরিয়ে এসে ইউপিপি গঠন করলেন কাজী জাফর। সেই ইউপিপিকে নিয়ে তিনি জেনারেল জিয়ার ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে’ যোগ দিলে রনো-মেনন অন্যদের নিয়ে গঠন করেন ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ নামের প্ল্যাটফর্ম। সেটিই পরে ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পুনর্গঠন করে রনো হন সাধারণ সম্পাদক।

এরপর বহু ভাগ-বিভক্তি ঐক্যের মধ্য দিয়ে রনো উদ্যোগী হন বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোকে ওয়ার্কার্স পার্টিতে ঐক্যবদ্ধ করতে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বাঁক-মোড়ে, ষাটের দশকের মহাবিতর্কের সময়ও বাম আদর্শে অটল ছিলেন তিনি। একটা সময় পর্যন্ত আলোচিত ছিল রনো-মেনন জুটি। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তারা রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। সেই ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে রনো ২০০৮ সালে বিদায় নিয়ে যোগ দেন সিপিবিতে। এ পার্টির উপদেষ্টা হিসেবে মৃত্যুবরণ তার। 

বাংলাদেশে বামধারার রাজনীতি এগিয়ে নেওয়ার উজ্জ্বল নাম রনো। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ তার। ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসে রাখা হয়েছিল। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। যেখানে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ছাত্র থাকাকালে ১৯৬০ সালে যুক্ত হন গোপন কমিউনিস্ট পার্টিতে। এদেশের মানুষের জীবন মান উন্নয়ন, শোষণ, বঞ্চনামুক্ত অর্থনীতি, বৈষম্যহীন সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্রততে অটুট থাকার রেকর্ড আ ফ ম মাহবুব, নির্মল সেন, আবদুল্লাহ সরকার, জসিম মন্ডলদের মধ্যেও ছিল। আছেন খালেকুজ্জামানও। অন্য বাম সহযোগীদের মতো সময়ের স্রোতে অনুপযুক্ত হয়ে শত প্রতিকূলতায়ও খেই হারা হননি তারা। সুখ-সম্ভোগের জন্য রডের কাজ বাঁশে সারেন না তারা। বিত্তবান দলের উঠানে চাষাবাদ করেননি। তারা ডুব-সাঁতারে স্নান করেন না বুর্জোয়াদের পুকুর-দিঘিতে। দানে বা প্রাপ্তিতে এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে? দেউটি হয়ে জ্বলতে থাকা এই শ্রেণি একে একে নিভছে। বামে-ডানে-মধ্যমে তাদের বড়ই খরা। এমন জীবন্ত বীজের আর উদগমনের নমুনাও নেই। রাজনীতির বাজারে তাদের চাহিদাও কম। ক্ষমতার বলয়ে না হলেও সমাজে ইতিবাচক প্রভাবে যে তাদের কত দরকার, তাও ভাবনার সীমানায় আসছে না সময়ের অসুস্থতা ও অস্থিরতায়। জীবদ্দশায় উপেক্ষা আর মৃত্যুর পর উহ-আহ, বড় ভালো লোক ছিল, অতল শ্রদ্ধা, বিনম্র শোকবার্তা পাওয়াই যেন তাদের পাওনা। কারও কারও কারণে এই গোত্রের বামরা এক ধরনের শিকারের পাত্র।

স্বাধীনতার পর থেকেই এদেশের বামপন্থি সংগঠনগুলো অস্তিত্বহীন অবস্থায় রাজনীতির মাঠে কোনো রকমে টিকে আছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কোনো সময় নিজেদের মধ্যে জোট করে আবার কোনো সময় বামপন্থিদের ঠিকানা হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের ছায়ায় আশ্রয় নেয়। আওয়ামী লীগের নৌকায় পা দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতার পিঠে চড়েন তাদের কয়েকজন। হাতেগোনা সেই কয়েকজন ও তাদের মুরিদদের বদনাম টানতে হচ্ছে বাম গলির বাদবাকিদেরও। দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য-দ্বন্দ্বও তুলনামূলক বেশি। মস্কোপন্থি ভার্সেস পিকিংপন্থি বিভক্তিসহ আন্তর্জাতিক বিষয়াদির সঙ্গে স্থানিক রাজনীতি নিয়েও তারা অসহিষ্ণু। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তো আছেই। সেইসঙ্গে প্রতিযোগিতাও। যে প্রতিযোগিতায় জিততে নৌকা, ধানের শীষ, লাঙলে মঙ্গল খুঁজতেও শরমিন্দা হন না তাদের কয়েকজন। তারা বামপাড়াকে ছোট করতে করতে কানাগলিতে ঢুকিয়ে ফেলেছেন।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত