মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘রায়ের পর কনডেম সেলে থাকতে চান না আসামিরা’

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ১০:১৬ পিএম

মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আসামিদের কনডেম সেলে রাখা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত করা হয়েছে। আজ বুধবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। আর ওই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল করতে বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তার সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোর্শেদ, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ শিশির মনির।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের পর যারা কারাগারের কনডেম সেলে রয়েছেন তারা অস্থির হয়ে উঠেছেন। সাধারণ সেলে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। সাধারণ সেলে যাওয়ার জন্য বিশৃঙ্খলা করছেন। এই রায় যদি স্থগিত করা না হয় তাহলে পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তা কার্যকরে এক ধরণের বাধ্যবাধকতা চলে আসবে।’

শিশির মনির বলেন, ‘হাইকোর্ট কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় ছাড়া এটার কার্যকারিতা নেই। রায় দেখা ছাড়া কীভাবে সিদ্ধান্ত দেবেন? সমস্যা তৈরি হলে স্থিতাবস্থা দিতে পারেন।’ উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে চেম্বার আদালত আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত করেন।

এর আগে গত সোমবার রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আসামিদের কনডেম সেলে রাখা যাবে না। তিনজন আসামির করা এ সংক্রান্ত রিট নিষ্পত্তি করে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমানের বেঞ্চ ওই রায় দেন। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্জন কারাগারে দীর্ঘদিন রাখা ডাবল সাজা। এটি সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা অনুমোদন করে না। তাই বর্তমানে কনডেম সেলে থাকা আসামিদের দুই বছরের মধ্যে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে যাদের সংক্রামক বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে, তাদের ছাড়া।

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের জামিন আবেদন হাইকোর্ট বিভাগকে অন্য আবেদনের মতো বিবেচনা করতে বলা হয়েছে রায়ে। মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের বিষয়ে তথ্য চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে বলা হয়েছে তা সরবরাহ করতে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য বিস্তারিত উল্লেখ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর শিশির মনির বলেন, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেই কাউকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বলা যাবে না। এর জন্য হাইকোর্ট বিভাগ, আপিল বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির নিকট করা আবেদন খারিজ হতে হবে। আর এসব প্রক্রিয়া শেষে কারও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেই তাকে মৃত্যুর সেলে রাখা যাবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এর আগে রুল শুনানিতে আদালত এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী ও এস এম শাহজাহান বিশেষজ্ঞ মত নেন। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন শুনানি করেন। আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ শিশির মনির। রুল শুনানি শেষে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে দণ্ডিত বা দণ্ডিতদের কনডেম সেলে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা কারাগারের কনডেম সেলের তিন কয়েদি। তারা হলেন সাতকানিয়ার জিল্লুর রহমান, সুনামগঞ্জের আব্দুল বশির ও খাগড়াছড়ির শাহ আলম। ওই রিট শুনানি করে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে দণ্ডিতদের কনডেম সেলে রাখা কেন আইনত বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের কনডেম সেলে বন্দী রাখাসংক্রান্ত কারাবিধির ৯৮০ বিধিটি কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। সেই সঙ্গে কনডেম সেলে রাখা বন্দীদের কী ধরনের সুযোগ—সুবিধা দেওয়া হয়, সে বিষয়ে প্রতিবেদন চান আদালত।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুসারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন নিতে হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১০ ধারা অনুসারে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ পান। হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারেন।

আপিল বিভাগের রায়েও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করার সুযোগ আছে। এ ছাড়া সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। ক্ষমার এই আবেদন রাষ্ট্রপতি যদি নামঞ্জুর করেন অথবা দণ্ডিত যদি আবেদন না করেন, তাহলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে সরকার। অথচ বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরপরই সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কনডেম সেলে বন্দী রাখা হচ্ছে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত