এপ্রিল ও মেকে ঘূর্ণিঝড়ের মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এবার পুরো এপ্রিল মাসে বঙ্গোপসাগরে কোনো লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়নি। এমনকি চলতি মে মাসের ১৮ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো লঘুচাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২২ মের পর সাগরে একটি লঘুচাপ তৈরির অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা। কিন্তু সেই লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপের স্তর পেরিয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে আবহাওয়াবিদরাই সন্দিহান।
তাহলে কি এবার ‘মৌসুমি’ ঘূর্ণিঝড় হবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একাধিক অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার এখন পর্যন্ত যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে মাসের শেষ সপ্তাহে সাগরে একটি লঘু বা নিম্নচাপ হয়তো সৃষ্টি হতে পারে। তবে তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের কেউ কেউ বলছেন, এবার সাগরে কোনো লঘু বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ নেই। অন্য কেউ কেউ মনে করছেন, লঘু বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হলেও হতে পারে। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় না হলেও একটি লঘু বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে।’
এমন মনে করার কারণ জানতে চাইলে সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘দেশে প্রতি বছরই মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগমুহূর্তে লঘু বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে থাকে। অনেক সময় তা জুনের প্রথম সপ্তাহেও সৃষ্টি হয়। তখন মৌসুমি বায়ু প্রবেশ বিলম্বিত হয়ে যায়।’
তাহলে কি লঘু বা নিম্নচাপ ছাড়া মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করবে না? এ প্রশ্নের উত্তরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘মৌসুমি বায়ু তার স্বাভাবিক গতিতেই দেশে প্রবেশ করবে। ইতিমধ্যে তা আন্দামান পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং ২ জুন টেকনাফ এবং ১৪ বা ১৫ জুনের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
তাহলে মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে লঘু বা নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের প্রশ্ন কেন আসছে? এ বিষয়ে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘লঘু বা নিম্নচাপ মৌসুমি বায়ুকে আরও শক্তিশালী করে। লঘু বা নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়টি কেটে গেলে প্রবল বেগে মৌসুমি বায়ু একটু দেরিতে প্রবেশ করে।
গত ৩০ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ মে সৃষ্টি হয়ে ১৫ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘আকাশ’, ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল সৃষ্টি হয়ে ৩ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’, ২০০৯ সালের ১৩ এপ্রিল সৃষ্টি হয়ে ১৭ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘বিজলি’, একই বছরের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ আঘাত করেছিল, ২০১০ সালের ১৬ মে সৃষ্টি হয়ে ২১ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘লায়লা’, ২০১৩ সালের ৮ মে সৃষ্টি হয়ে ১৬ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানা’ ১৪ মে সৃষ্টি হয়ে ২২ মে আঘাত করেছিল, ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ২৫ মে সৃষ্টি হয়ে ৩১ মে আঘাত করেছিল। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ‘ফনি’ ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে এবং ২০২০ সালে আম্পান ১৩ থেকে ২১ মের মধ্যে আঘাত করেছিল। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ও কিন্তু হয়েছিল ২৯ এপ্রিল। দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ ঘূর্ণিঝড় এপ্রিল ও মে মাসে হয়ে থাকে। এবার এখনো এ ধরনের কোনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। তবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ধারণা করছি ২২ মের পর লঘুচাপ তৈরির একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে সেই লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ পেরিয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা এখনো বলার সময় হয়নি।’
এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিকও এমন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এপ্রিল ও মে মাস ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। তবে মাসের ২২ মের পর একটি ঘূর্ণিবায়ুর সৃষ্টি হতে পারে সাগরে, যা লঘুচাপে রূপ নিতে পারে।
তবে এই লঘুচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মন্তব্য করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার। তিনি বলেন, ‘লঘুচাপটি হয়তো নিম্নচাপে রূপ নিলেও নিতে পারে। তবে সেই ঝড় শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’
উল্লেখ্য, বর্ষার আগমুহূর্তে বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর ঝড় কেটে গেলেই মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। আবার বর্ষা চলে যাওয়ার সময় সাগরে একটি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় এবং তখন বর্ষা বিদায় নিয়ে শীতের আগমন ঘটে। এমনটাই হয়ে আসছে। সেটা এবার না-ও হতে পারে।
