অটোরিকশাচালক পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র মিরপুর

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ০৬:২০ এএম

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা, ভ্যানসহ থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমে মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন চালকরা। গতকাল রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে পুলিশের এ সংঘর্ষ চলে। চালকরা যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছেন। কালশীতে পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাস-মিনিবাস-প্রাইভেট কারসহ প্রায় ৫০টির মতো যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। অন্যদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।

পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, মুহুর্মুহু টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপে পুরো এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা রাস্তা আটকে রাখার ফলে ভোগান্তিতে পড়েন বাসযাত্রী ও পথচারীরা। প্রচণ্ড গরমে যাত্রীরা পড়েন চরম বিপাকে। অনেকে দীর্ঘসময় আটকে থেকে শেষ পর্যন্ত হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের প্রতিবাদে মিরপুর-১০ নম্বরের গোলচত্বর এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন চালকরা। তারা রাস্তা অবরোধ করে অটোরিকশা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা বাতিলের দাবি জানান। পরে বিকেলে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে সংঘর্ষ বাধে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীরা সরে যান। এরপর বিক্ষোভকারীরা কালশীতে রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। সন্ধ্যা ৬টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। সংঘর্ষের সময় পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালাতে দেখা গেছে।

বিক্ষোভকারীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রাস্তায় অটোরিকশা চলতে দিচ্ছে না পুলিশ। কয়েক দিন ধরে মিরপুর এলাকায় অনেক চালককে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে অটোরিকশা। রাতে গ্যারেজে ঢুকে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। হুট করে একদিনের সিদ্ধান্তে অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে যাওয়া পুলিশের কাজ নয়। অনেক সময় পুলিশ তাদের কাছে টাকাও দাবি করছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ১০টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন অটোরিকশাচালকরা। পরে মিরপুর-১১, মিরপুর-১, আগারগাঁও ও কালশী এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার শত শত চালক বিক্ষোভে যোগ দেন। আন্দোলনকারী মিরপুর-১৩ নম্বরের অটোরিকশাচালক নাসির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কথা হলো, যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয় তাহলে সেই গাড়িগুলো বাদ দিয়ে ভালো ব্রেকিং সিস্টেমের গাড়ি ছাড়া হোক। আমাদের সেই গাড়ি যেভাবেই দেওয়া হোক, কিস্তি বা লাইসেন্সের মাধ্যমে দেওয়া হলেও আমরা নেব। ঢাকা শহরে ১৫-১৬ বছর ধরে অটোরিকশা চলছে। হঠাৎ করে ঘোষণা দিয়েছে রাজধানীতে অটোরিকশা চলবে না। অনেকেই ঋণ করে গাড়ি কিনে সংসার চালাচ্ছে। আমাদের সময় না দিয়ে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হটকারিতা। সরকার এ বিষয়ে সুরাহা না করলে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’

অটোরিকশা যদি অবৈধই হয় তাহলে এতদিন ধরে চলছে কীভাবে প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, ‘অটোরিকশা পুলিশের সামনে দিয়ে চলছে। তারা অনেক সময় টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যেহেতু লাখ লাখ মানুষ জড়িত, তাহলে এটাকে বৈধতা দিতে সমস্যা কোথায়।’

সবুজ নামে এক আন্দোলনকারী জানান, তার ৩৫টি অটোরিকশা রয়েছে। শনিবার মধ্যরাতে টহল পুলিশ বাউনিয়াবাদ গ্যারেজে ঢুকে তার তিনটি রিকশা নিয়ে গেছে।

কাজীপাড়া এলাকার রিকশাচালক হাবিব বলেন, ‘দুই মাস আগে ৫৫ হাজার টাকা ধার করে একটা পুরনো অটোরিকশা কিনি। দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ, ঘরভাড়া দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছিল। দুদিন ধরে রাস্তায় গাড়ি বের করতে পারি না। এভাবে চলাচল বন্ধ করে দিলে তো আমাদের পথে বসতে হবে।’

মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকার চালক দিদার হোসেন বলেন, ‘থানা পুলিশ ও তাদের সোর্সরা রাতে গ্যারেজে গ্যারেজে ঢুকে রিকশা নিয়ে যাচ্ছে। শনিবার রাত ১২টার পর গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি, রূপনগর থেকে ধাওয়া করে টহল পুলিশ লালমাটিয়ায় নিয়ে আসছে। রাতে চালিয়ে রোজগার করব সেই সুযোগও নেই আমাদের। আমার একার রোজগারে পাঁচজনের পরিবার চলে। আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হয়নি। এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ জড়িত। সবাই পথে বসে যাবে।’

গতকাল দুপুরে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, আন্দোলনকারীরা পুরো চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে তারা সড়ক প্রদক্ষিণ করছেন। কেউ কেউ যানবাহনের সামনে শুয়ে-বসে রয়েছেন। এ কারণে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। অনেকে হেঁটে গন্তব্যে যান। পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ বেধে যায়। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় চলাচলরত যানবাহন ভাঙচুর করতে থাকেন। এ সময় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। সংঘর্ষ বেধে গেলে চালকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ টিয়ার শেল ও লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। এ সময় ইনডোর স্টেডিয়ামের সামনে তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, একটি মোটরসাইকেল ও একটি প্রাইভেট কার ভাঙচুর করেন বিক্ষোভকারীরা।

দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর গোল চত্বরে আসেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। তিনি আন্দোলনকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশ আমাদের মানতে হবে। পাশাপাশি অটোরিকশা চালকদের মানবিক দিকটিও দেখতে হবে।’ তিনি দুদিনের সময় নিয়ে অটোরিকশা চলাচলের বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দেন। তার আশ্বাসে চালকদের একটি অংশ আন্দোলন শেষ করে ফিরতে সম্মত হয়। এরপর ইলিয়াস মোল্লা ও তার সঙ্গে নেতাকর্মীরা মিরপুর গালর্স আইডিয়াল কলেজের রাস্তা থেকে মিরপুর-২ নম্বরের সড়কের দিকে বাস চলাচলের নির্দেশ দেন। এ সময় বেশ কয়েকটি বাস চলা শুরু করলেই শেওড়াপাড়া দিক থেকে আসা কিছু আন্দোলনকারী বাস আটকে চালক ও হেলপারদের মারধর এবং গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা চালান। শেওড়াপাড়া থেকে আসা চালকদের একাংশ লাঠি হাতে এসে আবারও অবরোধ শুরু করে। এ সময় পুলিশ তাদের সরে যেতে বললে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দেয়। একপর্যায়ে পুলিশও পাল্টা ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপরই মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে থেমে থেমে যান চলাচল শুরু করে। পুলিশ জলকামান নিয়ে ধাওয়া করে বিক্ষোভকারীদের মিরপুর-১১-এর দিকে নিয়ে যায়। বিক্ষোভকারীদের অন্য একটি অংশ দৌড়ে মিরপুর-২ নম্বরের দিকে যেতে পথে বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে। বিকেলের দিকে মিরপুর গোল চত্বর দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়।

পুলিশের ধাওয়া খেয়ে বিক্ষোভকারীরা মিরপুর গোলচত্বর এলাকা ছেড়ে কালশী মোড় এলাকায় অবস্থান নেন। বিকেল ৪টার দিকে সেখানকার পুলিশ বক্সে আগুন দেন তারা। এর ঘণ্টাখানেক পর পুলিশ গিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ মুহুর্মুহু টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে পথচারী সাগর মিয়া গুলিবিদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত সাগর একটি পাঞ্জাবির কারখানায় চাকরি করেন।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। প্রথমে সড়কে আগুন দেয় তারা। তাদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা সহিংস হয়ে ওঠায় পুলিশ বাধ্য হয়ে বলপ্রয়োগ করেছে।’

সংঘর্ষের বিষয়ে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্ল্যা বলেন, ‘পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে এসে চালকদের বুঝিয়ে সরানোর চেষ্টা করেন। অনেকে সড়ক ছেড়ে চলেও যায়, কিন্তু একটা গ্রুপ সহিংস হয়ে ওঠে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা ও সড়কে থাকা যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। তখন বাধ্য হয়ে আমাদের বলপ্রয়োগ করতে হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত