বৃষ্টি ও মাধবীর কবিতা

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ১২:৩১ এএম

চড়া রোদ শেষে নিমগ্ন আকাশ। নিমগ্ন, বৃষ্টির আয়োজনে। কদাচিৎ বিজলি চকমকি খেলে কালো মেঘের ফাঁকে। মাধবী তাকায় মেঘের নয়ন তারায়। ঝকমকে আভরণ যেন স্থির হয়ে থাকে। বৃষ্টিকে বুকে ধরে। যেন হাতে অমৃত সুধার পাত্র। সহসাই ছলকে পড়বে খানিকটা। ধুইয়ে যাবে পৃথিবী। চঞ্চল বৃষ্টিরা ঝরঝর ঝরবে সারাক্ষণ, ক্লান্তিহীন। অথচ সকালেও সূর্য ছিল। বেশ প্রতাপ ছিল তার। এখন ব্যর্থ সূর্যবিলাসী হয়। আকাশের দখল ছেড়ে দেয় মেঘের হাতে। অভিশপ্ত সূর্য। যদিও আলোর পিপাসা আছে তার বুকে। মাধবী তাকায় বকুল গাছের ডালে। কদিন আগেও সেখানে ছিল শোভিত, সুবাসিত কুঁড়ি। আজ শূন্য ডালে কেবলই কয়েকটি ফল। ঠিক তখনই সেই ছেলেটি আসে। পাতাল ফুঁড়ে যেন। বিরক্ত মাধবী। উশকো-খুশকো, ত্যানা-ত্যানা জামা-কাপড়। কবিতা লেখে। ছাই-ভস্ম। বলে, আমি পারি না লিখতে কবিতা। তৃষ্ণার্ত মাঠের মতো মন। শূন্য খাতা।

       আমার কী করার আছে? পছন্দও করি না এসব কথা।

       তোমার স্পর্শে ভরে উঠবে শূন্য খাতা।

        শব্দরা ঝংকার তুলবে সেখানে।

        কবিতার খাতায়। তোমার স্পর্শে।

       বেশরম। অপদার্থ, কূপমন্ডূক।

গালি তুমি যত দাও শুনব। দোষ যত দাও নেব। কিন্তু কবিতার খাতা পড়ে থাকে একা। শূন্য মাঠেরা যেমন ছটফট করে কচি ঘাসের অভাবে। কবিতার খাতাও আমার তেমনই শূন্য পড়ে থাকে। মাধবী তোমারই অপেক্ষায়। তোমারই অভাবে।

         মরো তুমি। অভদ্র কাহাকা।

         মরতে রাজি। শুধু একটু স্পর্শ তোমার। আর নয় কিছু। নয় বেশি কিছু আবদার। স্পর্শের স্পর্ধা কিংবা অধিকার। তোমার পায়ে সমর্পিত হবে কবিতার শব্দমালা, কবিতার খাতা। শব্দের অহংকার। মাধবী, শুধু একবার।

         ইতর জন্ম তোমার।

         নিশ্চিত তাই।

         কী গুণ তোমার আছে?

         কিছু মাত্র না। কবিতার খাতাও শূন্য।

         ছাই-ভস্মের খাতা।

     না, মাধবী। নাহ। ওখানে তোমাকে নিয়ে খেলা করে আমার শব্দরা। প্রতি পঙ্্ক্তিতে তুমি অনন্য হয়ে ওঠো শব্দেরই অহংকারে। তোমার কল্পনার অশ্রুকে তারা করে তোলে অরূপ রুপার মুক্তো। নিবিড় যতনে। তোমাকে বসায় দেবীর আসনে। চলে পূজা অহর্নিশ। মাধবী, আহা, মাধবী। শুধু একটি স্পর্শ।

    বেয়াদব! দেখাবো মজা।

রটে যায় খবর। ঘর থেকে পাড়াময়। ভাই, বন্ধু সবাই জেনে যায়। কবিতার খাতার খবর। মাধবীই বলে দেয়। যত ছাই-ভস্মের কথা। খবর ছড়ায়। ক্রদ্ধ সবাই।

খ.

শ্রাবণের ভরা বর্ষার রাত। মধ্য যামিনী হবে। বৃষ্টিতে আজ প্রলয় বয়ে যাবে। কবিতার রাজকুমার ঘুমোয়নি। ঘুমুবে না সে। বরং কবিতার শব্দ খোঁজে। বর্ষা এবং মাধবীর জন্য কবিতা। বিশ্ব চরাচর, প্রান্তর খুঁজে, পাতালের বুক খুঁড়ে যদি আনা যেত কোনো শব্দ! কোনো উপযুক্ত শব্দ। তবেই মুক্তো দানার মতো সে শব্দ জ্বলতো জোনাকির আলো হয়ে। মাধবী, আহা মাধবী! এই রাত তাই ঘুমুবার নয়; বৃষ্টির সঙ্গে জেগে থাকার, শব্দ গাঁথার, এক চরম সন্ধিক্ষণ। সে সময় কারা যেন ঢুকে ঘরে। ছিটকে পড়ে যায় সে। মাটিতে, ঘরের বাইরে। মুহূর্তের তড়িৎ যেন। লন্ডভন্ড সব। চলে যায় তারা, এসেছিল যারা। সে পড়ে থাকে একা। বৃষ্টি ঝরা রাস্তায়। পড়ে থাকে কলম আর কবিতার খাতা। নিস্তব্ধ কিছুক্ষণ। বৃষ্টির শব্দের মাঝে। শব্দরা আসে না আর। কবিতা কিংবা বৃষ্টির শব্দ শূন্য। কলম সরে যায় দূরে। ভুলে যায় কবির কথা। সাগরের কথা যেমন ভুলে যায় স্বার্থপর তীর। তাই কবিতার খাতা পড়ে রয়েছে দূরে। ভরা বাদলে। ভাবছিল যা, হলো না তা। হলো না, মাধবীর জন্য কবিতা। একবার উঠে দাঁড়ায়। কবিতার খাতা পেয়ে যায় হাতড়ে। বুকে চেপে ধরে। বেশিক্ষণ নয়। তার হাতেরা ছেড়ে দেয় সহসাই খাতার অধিকার। শ্রাবণের জলে বিচ্ছিন্ন তারা। সে এবং কবিতার খাতা। জোনাকিরা নেই। পালিয়েছে আশ্রয়ে। নিরাপদ তারা। বেশ কষ্ট তার। কবিতার রাজকুমার! কোথায় যেন ব্যথা। হৃদয় যেখানে থাকে? পলাতক জোনাকিরা খবরও রাখে না তার। সে আবার উঠে দাঁড়ায়। জোনাকিবিহীন শ্রাবণের রাত। বর্ষার বৃক্ষরা মাথা নত করে। তাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ফুলেরা তাই কষ্ট পায়। চোখে ভীষণ ঘোর। দু’কদমই হাঁটে। উদ্দেশ্য জানা নেই। শুধু দেব-কন্যারা দাঁড়িয়ে থাকে স্বর্গের বারান্দায়। তারই অপেক্ষায়। কবিতা ভালোবাসে তারা। তারপর তার মনে নেই কিছু। কবিতা এবং শ্রাবণের জলে সব মিলেমিশে একাকার। কিছু শব্দ এলো কি মনে? বর্ষার রাতে পাতারা বোঝে না যার অর্থ। লুকোনো জোনাকিরা জানবে না তার মর্মার্থ। কবিতার খাতায় শব্দরা ছিল। অসহায় ওই শব্দরা মাধবীর উপহার। হারিয়ে গেল তারা।

গ.

মাধবী চমকিত হয়। চোখে বর্ষার জল। সাগরের নীল নয়নে মাখলে যেমন হয়। মরণের অমৃত যদি পাওয়া যায় এবার। কিংবা সুপেয় হেমলক। ছেলেটি বেরিয়ে গেল কবিতার খাতা হাতে। বিশুদ্ধ কবিতার রাজকুমার। ওকে ফেরাতে হবে। মাধবী  ছোটে বিশ্ব চরাচর ভেদ করে। কবিতার খাতার খোঁজে। ঘন বৃষ্টি আর অন্ধকার ঢেকে রাখে তাকে। বিশ্ব তখন গভীর ঘুমে। ভারী বর্ষণে তৃপ্ত কবিতার খাতা। নিবিড় অবগাহন বৃষ্টির মায়াবী জলে। শ্রাবণের প্লাবণে এগিয়ে যায় নদী। কবি আর কবিতাকে বুকে দেয় ঠাঁই। একটুক্ষণ স্থিরও হয়। নিমগ্ন নদী আর বৃষ্টির সঙ্গমে। যদি কেউ হাতে ধরে বুকে তুলে নেয়!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত