সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাবার লাশের একটি টুকরো হলেও স্পর্শ করতে চাই : ডরিন

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০১:৪২ এএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের মধুগঞ্জ বাজার মেইন বাসস্ট্যান্ডে এ কর্মসূচির আয়োজন করে কালীগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। সেখানে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, ‘রোগব্যাধি, দুর্ঘটনায় মারা গেলেও তো জানাজা হয়। আমার বাবার কি জানাজা হবে না? কী এমন অপরাধ করেছে আমার বাবা? তারা হত্যা করে টুকরো টুকরো করে হলুদের গুঁড়া দিল! কত কষ্টই না দিয়ে খুনিরা আমার বাবাকে মেরেছে! বাবার লাশের একটি টুকরো হলেও আমি দেখতে চাই, শেষবারের মতো স্পর্শ করতে চাই।’ ভারতের কলকাতায় খুন হওয়া এমপি আনারের মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছে কালীগঞ্জসহ ঝিনাইদহের হাজার হাজার মানুষ। হত্যার ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার তিন দিন পার হলেও মরদেহের সন্ধান না পাওয়ায় হতাশা বাড়ছে দলীয় নেতাকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে।

সরেজমিনে একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার খুন হওয়ার পর কালীগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে মাতম। তারা প্রিয় নেতাকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন। কেউ মুখ খুলছেন না।

আনোয়ারুল আজীম আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বলেন, ‘আমি যত দিন বাঁচব, জীবনে কোনো দিন ভুলতে পারব না এই নৃসংশতার কথা। সামান্য হাত কেটে গেলেও আমরা বলি কী ব্যথা! সহ্য করতে পারছি না! মৃত ব্যক্তির শরীরে ব্যথা লাগবে বলে আস্তে আস্তে গোসল করানো হয়। আর কেন ওরা আমার বাবাকে এত আঘাত দিয়ে হত্যা করল? আমি বাবাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চাই। আল্লাহ ওদের বিচার করবে। আমার দীর্ঘশ্বাস বৃথা যেতে পারে না। আমি খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’ এভাবেই গতকাল বাড়ির সামনে বসে কান্নায় বুক ভাসাচ্ছিলেন তিনি।

গতকাল ভোরে কালীগঞ্জের বাসায় ফিরে আসেন মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন, তার মা ইয়াসমিন ফেরদৌস শেফালী ও এমপির পিএস আবদুর রউফ।

গতকাল বেলা ১১টার দিকে বাড়ির বাইরে আসেন ডরিন। সে সময় স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাবাহারা সন্তানের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজন-দলীয় নেতাকর্মীরাও।

ডরিন বলেন, ‘আমার বাবা কালীগঞ্জ শহরে প্রায় ৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করেছেন। তার রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকতেই পারে।’ এমপি আনারের নামে স্বর্ণ ব্যবসা, হুন্ডি ব্যবসাসহ যেসব বিষয়ে কথা উঠে আসছে, সে সম্পর্কে ডরিন বলেন, ‘আমার বাবার নামে এখন যেসব অপপ্রচার করা হচ্ছে, সেটা সঠিক নয়।’ তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনারা তো এতদিন ছিলেন, তখন কিছু করেননি কেন? প্রিভিয়াস কথা নিয়ে এসে এখন বিতর্ক সৃষ্টি করছেন কেন?’

ডরিন বলেন, ‘অনেক আগে থেকে প্রি-প্ল্যানিং করে আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় যার নাম আসছে, তাকে বিদেশ থেকে নিয়ে আসুন। কান টানলে মাথা আসবে। তার ওপর যদি আর কেউ থেকে থাকে, তার নামটাও খতিয়ে দেখুন।’

কালীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগরে যুগ্ম সম্পাদক ওদুদ বলেন, ‘এমপিকে যে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তার দেহটা শুনছি ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে। সেই ছিন্নভিন্ন দেহের যেকোনো একটা অংশ উদ্ধার হোক, সেটাই আমরা চাই। সেটাকেই আমরা লাশ মনে করে জানাজা করব এবং আমাদের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করব, এটাই আমাদের দাবি।’

কালীগঞ্জ থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি গোলাম রসুল বলেন, ‘এ হত্যাকা-ের মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীন। তাকে গ্রেপ্তার করে যদি দেশে আনা যায় তাহলে কেন এমপিকে হত্যা করা হলো, কারা কারা জড়িত, সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’

কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কালীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শিবলী নোমানী বলেন, ‘মোটরসাইকেলে করে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিতেন। তার মতো এমপি আমরা হয়তো আর পাব না। এমপি হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীনকে গ্রেপ্তার করে দেশে আনা হোক। তার কাছ থেকে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিসহ এমপির মৃতদেহ খুঁজে বের করে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

১২ মে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য যান ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। ১৩ মে তাকে কৌশলে কলকাতার নিউ টাউন এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হত্যাকারীদের মধ্যে তিনজন আটক হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহীন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত