বাংলা একাডেমি এক সময় মননের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। এখনো তারা এই কথাগুলো ব্যবহার করে তাদের লোগোতে। গত কয়েক বছরে এ প্রতিষ্ঠান এতটাই অধঃপতিত হয়েছে যে বাংলা একাডেমিকে এখন পতনের প্রতীক বলাই ভালো। দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পতনেরও প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলা একাডেমি। স্বায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আমলাদের ঘেটুপুত্রে পরিণত হয়েছে। আগে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতেন আনিসুজ্জামান কিংবা শামসুর রাহমানের মতো দেশবরেণ্য মননশীল ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। এক সময় এর মহাপরিচালক ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মনজুরে মওলা, হারুন-উর-রশিদ, শামসুজ্জামান খান বা সৈয়দ শাহেদ আহমেদের মতো ব্যক্তিত্ববান, রুচিশীল, সৎ, আদর্শনিষ্ঠ ও দেশাত্মবোধসম্পন্ন সংস্কৃতিপ্রেমিকরা। এখন এর মহাপরিচালক হন দলদাস, লোভী, অসৎ, রংবদলকারী আর দুর্নীতিপ্রিয় লোকজন। ঠিক এই কারণে এখন অযোগ্য ও অসৎ লোকরাও এর মহাপরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে সাহস করে। তারা এখন পাখি ও তেলাপোকার পার্থক্য ভুলে গেছে : ডানা থাকলেই যে পাখি হওয়া যায় না, তেলাপোকাই তার বড় উদাহরণ। কিন্তু তেলাপোকাও আজ পাখি হতে চায়।
বাংলা একাডেমি এখন ধস্ত-বিধস্ত মহেঞ্জোদারোতে পরিণত হয়েছে। গবেষণার যে লক্ষ্য নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এখন তা সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে অসংখ্য আবর্জনার প্রণেতা হয়ে উঠেছে। বাংলা একাডেমির বইগুলো ভুল বাক্য ও ভুল বানানের অবাধ এক প্রবাহ হয়ে উঠেছে। এক সময় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হতো মানসম্পন্ন প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ। এখন এটি পরিণত হয়েছে তোষণমূলক গ্রন্থ প্রণয়নের সূতিকাগার হিসেবে। এক সময় গুরুত্বপূর্ণ যে-সব বই বের হয়েছিল, সেগুলোকে পুনর্মুদ্রণের পরিবর্তে অপাঠ্য ও অযোগ্য গ্রন্থের প্রকাশক হিসেবে খ্যাতির এভারেস্টে উঠেছে এ একাডেমি। বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে পরিচিত জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলির মাত্র তিনটি খন্ড বেরিয়েছিল ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে এবং তা বহু বছর আগেই নিঃশেষিত হয়ে গেলেও সেগুলো তারা কখনোই পুনর্মুদ্রণের উদ্যোগ নেই। এমনকি তার পরবর্তী খণ্ডগুলোর পান্ডুলিপি বহু বছর আগে জমা দেওয়া হলেও সেগুলো প্রকাশিত তো হয়ইনি, অভিযোগ রয়েছে বাংলা একাডেমি সেই পান্ডুলিপিগুলো খুঁজে পাচ্ছে না বা হারিয়ে ফেলেছে। শহীদুল্লাহর মতো বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত, মনীষী, দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব শত বছরেও একজন জন্মায় কিনা সন্দেহ। কিন্তু বাংলা একাডেমি এতই বেইমান, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিদ্যাবিমুখ এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে যে, তাদেরই স্বপ্নদ্রষ্টাকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করে আসছে বছরের পর বছর। ১৯২৮ সালের প্যারিস থেকে প্রকাশিত শহীদুল্লাহর Les Chants Mystifques de Kanha et de Saraha নামক গবেষণাগ্রন্থটি প্রকাশের প্রায় শত বছর পরও বাংলা বা ইংরেজি তর্জমায় প্রকাশ করতে পারেনি। প্রকাশের প্রায় ৮০/৯০ বছর পর সেটি ভারত থেকে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত এটির কোনো বাংলা তর্জমা কাউকে দিয়ে তারা করাতে পারেনি। এটি বাংলা একাডেমির জন্য অত্যন্ত লজ্জার।
বাংলা একাডেমির পচন ও পতনের সর্বোচ্চ উদাহরণ হচ্ছে তার পুরস্কার। এমন অনেককেই তারা এই পুরস্কার দিয়েছে যারা তার যোগ্য নয়, আবার এমন অনেককেই তারা পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে যাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন মুস্তফা আনোয়ার এবং সাবদার সিদ্দিকী, তাদের দুজনেরই কবিতা অসামান্য স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন তো বটেই, এমনকি দুজনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা; তাদেরকেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারা পুরস্কার দেয়নি আবিদ আজাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কবিকেও, দেয়নি শহীদুল জহিরের মতো বাঁকবদলকারী কথাসাহিত্যিককেও। তারা আহমদ ছফা ও আবু কায়সারকেও দেয়নি। ময়ূখ চৌধুরী, মিনার মনসুর, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সিদ্ধার্থ হক, মাসুদ খান, মজিদ মাহমুদ, ফরিদ কবির, কুমার চক্রবর্তী, স্বপন কুমার গায়েন, জুয়েল মাজহার, আকিমুন রহমান, মনিরা কায়েস, শাহনাজ মুন্নী, দীপেন ভট্টাচার্য, আবেদীন কাদের, আহমাদ মাযহার, কামরুল হাসান, পাপড়ি রহমান, বিনয় বর্মণ, আহমাদ মোস্তফা কামাল, কাজল শাহনেওয়াজ, শামসেত তাবরেজি, জি এইচ হাবীব, অদিতি ফাল্গুনী যোগ্যতা সত্ত্বেও এদেরকে পুরস্কারের জন্য কখনোই বিবেচনায় নেয়নি। মাসরুর আরেফিন, মশিউল আলম এবং মোস্তাক শরীফ তিনজনই কথাসাহিত্য এবং অনুবাদ, যে-কোনো ক্ষেত্রেই পেতে পারেন, কিন্তু তাদেরও দেওয়া হয়নি আজ পর্যন্ত। কিন্তু এঁদের তুলনায় গৌণ, এমনকি বয়োকনিষ্ঠ অনেককেই পুরস্কার দিয়ে তারা কেবল পুরস্কারটিকে বিতর্কিতই করেনি, এর মর্যাদা ও গুরুত্বকে নিচে নামিয়েছে। কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ভূষিত করেছে সালমা বাণীকে। অথচ তারচেয়ে অধিক যোগ্যতর লেখককে তারা অবহেলা করেছে। অনুবাদে জি এইচ হাবীবকে উপেক্ষা করে গৌণস্য গৌণ আমিনুর রহমানকে পুরস্কার দেওয়ায় অভিযোগ উঠেছিল স্বজনপ্রীতির। একই অভিযোগ উঠেছিল ফরিদ আহমদ দুলালকে নাটকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য।
‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার’ নিয়েও আছে বিতর্ক। এই পুরস্কার যাদের দেওয়া হচ্ছে সাহিত্যে তাদের অবদান সম্পর্কে ঘোরতর সন্দেহ আছে। কী অবদান আছে কবি শহীদ কাদরীর প্রথম স্ত্রী নাজমুন নেসা পিয়ারীর, যাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ২০২১ সালে?
বাংলা একাডেমি এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার এত বেশি অযোগ্যদের দেওয়া হয়েছে যে এই পুরস্কারগুলো এখন সত্যিকারের লেখকদের জন্য অত্যন্ত অমর্যাদাকর হয়ে উঠেছে।
বাংলা একাডেমি বিতর্কিত হয়ে আছে তাদের দ্বারা পরিচালিত ফেব্রুয়ারির বইমেলার জন্যও। এটি মোটেই তাদের কাজ নয়, এটি পরিচালিত হওয়া উচিত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র দ্বারা। কিন্তু বাংলা একাডেমি এই মেলা পরিচালনা করতে গিয়ে তারা তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আছে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমিকে আমলাদের প্রভাবের অধীন করে তুলেছে নিজেদের ক্ষমতাকে নিরাপদ ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। ফলে এটি এখন হয়ে উঠেছে আমলা তোষণনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান। আবু হেনা মোস্তফা কামাল বা হারুন-উর-রশিদের আমলে যেখানে কোনো আমলা ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পেত না, এখন সেখানে আমলারা মঞ্চ অলংকৃত করা ছাড়াও, বিভিন্ন বিষয়ে অসাড় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগও পেয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ডহীনতার কারণে।
জুলাই মাসেই বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। আগের মহাপরিচালকই থাকবেন নাকি নতুন কোনো মহাপরিচালক আসবেন সেটি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু মহাপরিচালক হওয়ার জন্য ইতিমধ্যে কারোর কারোর মধ্যে ইঁদুরদৌড় শুরু হয়ে গেছে। নিজেদের সাহাবা ও স্বজনদের মাধ্যমে গৌণ সব অনলাইন পত্রিকা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে নজরে পড়ার নির্লজ্জ তৎপরতা অব্যাহত আছে। তাদের এই তৎপরতাই প্রমাণ করে বাংলা একাডেমি কতটা দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বাংলা একাডেমির সম্মান, মর্যাদা ও মান এতটাই নিচে নেমেছে যে, এখন অযোগ্য অপদার্থরাও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
বাংলা একাডেমিকে যদি তার পূর্বের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হয় তাহলে এর মহাপরিচালক হওয়া উচিত এমন একজন, যিনি পাণ্ডিত্যে, মননে, আদর্শে ও সততায় সর্বজনমান্য এক ব্যক্তিত্ব। কেবল দলীয় বিচার ও স্বজনপ্রীতির মানদণ্ডে নয়, বরং সত্যিকারের গবেষক ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে অনর্ভুক্ত করে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আদায় করে হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে পারে। অযোগ্য অপদার্থদের দলীয় আনুগত্যের কারণে বা স্বজনপ্রীতির বশে নয়, প্রতিভাবান লেখকদের বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিয়ে আস্থা ফিরে পাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। পুরস্কারের অর্থমূল্য কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা হওয়া উচিত।
