শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফাঁকিতে পুরস্কার উসুলে তিরস্কার

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০২:৫০ এএম

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বৈধ টাকার ওপর ৩০ শতাংশ কর দিতে হবে আর অবৈধ বা কালো টাকা সাদা করতে দিতে হবে ১৫ শতাংশ কর। অর্থাৎ বৈধ টাকার চেয়ে অবৈধ টাকায় বেশি সুবিধা মিলবে। ফলে কর ফাঁকি উৎসাহিত হবে। এ কথা বলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাজেট পর্যালোচনাবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এ ভাষ্য দিয়েছে সিপিডি। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেট কখন দেওয়া হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। এখন একদিকে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি; অন্যদিকে রিজার্ভ সংকট আছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এ বিষয়ে বাজেটে বিশেষ কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে এখন যেসব সমস্যা আছে, প্রথমত সেগুলো মেনে নিয়ে সেসবের গভীরতা বুঝতে হবে। এরপর সমাধানের দিকে যেতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ লক্ষ্যে তেমন ঘোষণা দেখা গেল না। তিনি আরও বলেন, বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অতি উচ্চাভিলাষী এবং সেসব বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনৈতিক সূচকের অনেক লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ হবে না। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অনুধাবন করতে না পারায়, বাজেটে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা দুর্বল ও অপর্যাপ্ত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটটি অসাধারণ সময়ে একটি সাধারণ বাজেট। ফাহমিদা খাতুন বলেন, যারা নিয়মিত কর দেয় তাদের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হবে আর যারা কর দেননি কিংবা অসৎভাবে আয় করেছেন তাদের দিতে হবে ১৫ শতাংশ কর। এটা কী ধরনের ন্যায্যতা? এটা অন্যায়। নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতি বছরই সুযোগ থাকে কিন্তু কালো টাকা খুব বেশি সাদা হয় না। হলে কর-জিডিপির হার এত কম থাকার কথা নয়। এর মাধ্যমে যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে আর যারা কর দেয় তাদের তিরস্কৃত করা হচ্ছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তার বাস্তবায়ন পুরোপুরি সম্ভব নয়, কিছুটা সম্ভব। সাধারণ মানুষের তেমন কোনো সুবিধা হবে না। কারণ সরকার মূল্যস্ফীতির হার কমাতে পারলেও মূল্যস্তর অনেক বেড়ে গেছে। মূল্যস্তর বেশি থাকলে পণ্যের দামও বেশি থাকবে। সরকারের হিসেবে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই, আমাদের হিসেবে দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশের বেশি।

অধ্যাপক মোস্তাফিজ বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতিহারের ৩ নম্বর অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল দুর্বৃত্ত, ঋণখেলাপি, করখেলাপিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-নীতি ঘোষণা করবেন তারা। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যে দর্শন নিয়ে চলে তার সঙ্গে বাজেটে বিবৃত ধারণা বিপরীতমুখী। করখেলাপে, ঋণখেলাপে যুক্তদের সমন্বয়ে বাংলাদেশে দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে। এ দুষ্টচক্রকে কি প্রতি বছর মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু সুবিধা দিয়ে কালো টাকা সাদা করে অর্থনীতিতে নিয়ে আসা হবে, নাকি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যে জিহাদের ঘোষণা রয়েছে সেদিকে যাওয়া হবে? বাজেটে আমরা দেখলাম, কোন দিকে তারা গেলেন। এটা দুঃখজনক। এটা বন্ধ করা বড় একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আশা করি, আওয়ামী লীগের নেতারা এটা করবেন।’

১৫ শতাংশ কর দিয়ে টাকা বৈধ করার সুযোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আগে কালো টাকা সাদা করলেও দুদক তাদের ধরতে পারত। এবারে কিন্তু সেটা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে এটা স্মরণযোগ্য বিষয় বটে! তিনি আরও বলেন, কালো টাকা সাদা করার এ সুযোগ নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। দুষ্কৃতীর সিন্ডিকেট ১৫ শতাংশ কর দিয়েও টাকা সাদা করতে আগ্রহী নয়।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারা যেসব পণ্য কেনেন, সেগুলোর বেশিরভাগের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। নতুন পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। অনেক সেবা, যেগুলো সাধারণ মানুষ নেন, সেগুলোর ওপর ভ্যাট বসেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। বছরে চারবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। এসবই খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির অংশ।

তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের আমদানিতে শুল্কছাড় আমদানিকারকদের পকেটে যাবে। এসব বিশ্লেষণ করে আমাদের মনে হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটের ফলে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত