সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কয়লার জাহাজডুবি ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ১২:৩১ এএম

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম উৎস সুন্দরবন, যার আয়তন ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে থাকায়, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার হাত থেকে দেশ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তা ছাড়া পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখা, প্রাণিকুলের বাসস্থানসহ উপকূলীয় এলাকার জীবন-জীবিকার উৎস হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ৪৮৫.২৯ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাঁচিয়েছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

প্রকৃতির এই রক্ষাকবচ প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ব্যাঘাত ঘটছে ভারসাম্য রক্ষায়। এসব কর্মকা-ের অন্যতম উৎস হিসেবে রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নকেই গবেষকরা দায়ী করেন। রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটার উত্তরে পশুর নদের কোলঘেঁষে নির্মিত। ২০১৬ সালের ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় এনে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে বলা হয়। পশুর নদ এখনো সুন্দরবনের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে ও সুন্দরবনের উজানের মিঠাপানির সিংহভাগ আসে এই নদের মাধ্যমে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে ১৯৭৫ সালের পর থেকে পশুর নদের পানিপ্রবাহ কমেছে ৯০ শতাংশ। ফলে আগের তুলনায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে বনের গাছপালার ধরন পরিবর্তন হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহৃত যানবাহন থেকে শব্দদূষণ হচ্ছে। অপরদিকে নির্মাণ ও পরিচালনার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করার ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, অতিমাত্রায় আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে সরকারি ইআইএ রিপোর্টে আশঙ্কা করা হয়েছে। যার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মাধ্যমে। প্ল্যান্ট ও আশপাশের কলকারখানার নানা বর্জ্য নিঃসরণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে ও জলজ প্রাণী বৈচিত্র্য হারাচ্ছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পশুর নদীর কানাইনগর এলাকায় এমভি ইশারা মাহমু নামের কয়লাবাহী এক কার্গো জাহাজের তলা ফেটে যায়। ৯৫০ টন কয়লাবোঝাই করা এ জাহাজ ডুবো চরে ধাক্কা লেগে ফেটে গেলে, কয়লা অপসারণে বেশ সময় ব্যয় হয় এবং বিষাক্ত প্রভাব পশুর নদীতে এবং উপকূলবর্তী সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর পশুর নদের চরকানা এলাকায় ৮০০ টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় এমভি প্রিন্স অব ঘষিয়াখালী নামে কার্গো জাহাজ, ১৫ অক্টোবর ২০২৩, মোংলায় পশুর নদে ৮০০ টন ক্লিংকার (সিমেন্টের কাঁচামাল) নিয়ে এমভি আনমনা-২ নামের একটি লাইটার জাহাজ ডুবে যায়, ২০২১ সালের ৩০ মার্চ পশুর নদীতে ৪০০ টন কয়লাবোঝাই ইপসিয়া মাহিম নামে একটি কার্গো জাহাজ ডুবে যায়। এ ছাড়াও ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল এমভি বিলাস নামের জাহাজ ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে মোংলা বন্দর এলাকায় ডুবে যায়, ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ১০০০ মেট্রিক টন কয়লাবাহী এমভি আইচগাতি লাইটার জাহাজ ডুবে যায়, ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি জিআর রাজ সুন্দরবনের পশুর নদীতে ডুবে যায়, ২০১৫ সালের ৩ মে, ৫০০ মেট্রিক টন এমওপি সার নিয়ে ‘জাবালে নূর’ নামের একটি জাহাজ ডুবে যায়, ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের জয়মনির ঘোল এলাকায় শ্যালা নদীতে ডুবে যায় তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন স্টার। ফলে গাছের সালোকসংশ্লেষণের সমস্যা দেখা দিচ্ছে ও ব্যাপক আকারে ব্যাঘাত ঘটছে মাছের প্রজনন ও জলজ বৈচিত্র্যে।

সুন্দরবনের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই।  এই বনকে রক্ষা করা দায়িত্ব। কয়লাবাহী জাহাজ চলাচলে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কয়লা আমদানির বিকল্প কোনো পথ বের করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ফিটনেসসমৃদ্ধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা ও সেফটি সিকিউরিটি মেনে চলা, মনিটরিং সিস্টেম জোরদার করা, লাইটার জাহাজের পরিবর্তে উন্নতমানের জাহাজ নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে কয়লা নিঃসরণ করা, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো বর্জ্য নদীতে না ফেলা ও কয়লা পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করা জরুরি। সর্বোপরি, বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন ও পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা লালন করতে হবে। না হয় সময় ফুরিয়ে গেলে হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনো লাভ হবে না।

লেখক : চেয়ারম্যান, একোয়াকালচার বিভাগ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত