শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অস্ত্র না কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের গোস্বা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০৯:৩৪ পিএম

দেশ রূপান্তর : দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর মনে হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শেষ। কিন্তু মে মাসে ডোনাল্ড লু’র সফরের পর উল্টো বার্তা পেয়েছে সরকার। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ড. আবদুল মোমেন : দুনিয়ার সব দেশই নিজেদের স্বার্থ দেখে। কোনো দেশ চিরকালের জন্য বন্ধু হয় না। চিরকালের শত্রুও নয় কোনো দেশ। প্রত্যেকেই সময় সময় নিজ স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। আমাদের দেশে নির্বাচন এলে ওইসব দেশ মনে করে এখন একটু চাপ দিই, এই সুযোগ। এর কারণ স্বার্থ আদায় করা। আপনারা মিডিয়ায় সেগুলো বলেন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, দুর্নীতি, সুশাসনকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। আসলে এগুলোর সবই ভাঁওতাবাজি। এগুলো মানুষকে খাওয়ানোর জন্য বলা। উদ্দেশ্য ভিন্ন। আপনাকে চাপ দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করতে বলেছিল। আমরা সেগুলো করিনি। একাধিক চুক্তি আছে। এসব চুক্তির অন্যতম হলো ‘জিসোমিয়া’। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনতে হবে। অস্ত্র কেনার আগে তাদের সঙ্গে একটা চুক্তি করতে হয়। যেখানে থাকবে আমি যা কিনব সেগুলোর প্রযুক্তি কাউকে জানাব না। কেনা অস্ত্র কোথায় রাখব সেটাও তাদের জানাতে হবে। যেখানে রাখব, সেখানে অন্য কোনো দেশের অস্ত্র রাখছি কি না? এ ধরনের একাধিক শর্ত রয়েছে তাদের। দেশটির এই চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি অস্ত্র কিনে কী করব? আমি তো কারও সঙ্গে যুদ্ধ করব না’। যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৬ ও এফ-১৮ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে চায়। এগুলোর অনেক দাম। প্রধানমন্ত্রী চান কিছু টাকা হলে আগে জনগণের মঙ্গলজনক কাজে লাগাতে। মঙ্গলজনক কাজ হয়ে গেলে পরে অস্ত্র কেনা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর এই অভিব্যক্তির জবাবে দেশটির কর্মকর্তারা জানালেন না, না, তোমার দেশ উন্নত হচ্ছে, তোমার এখন প্রোটেকশন (নিরাপত্তা) লাগবে। সেজন্য এগুলো কিনতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তা করেনি। সেই যে শুরু, এরপর নির্বাচনের আগে একটু সুযোগ পেয়েছে, একটু ধাক্কা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য চীন। আমরা যদি তাদের লেজুড় হই, অস্ত্র কিনি, তাহলে তারা চীনকে আটকাতে পারবে। এজন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এমন জায়গায় আছে যেখানে বঙ্গোপসাগর, কাছাকাছি ভারত মহাসাগর। চীনের সব ব্যবসা এদিকে। যুক্তরাষ্ট্র দুই জায়গায় ব্যবসা করে। একটি হলো মালাক্কা প্রণালি দিয়ে। আর তাইওয়ান নিয়ে জটে আছে। মূলত ভারত মহাসাগর তারা চীনের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায়। সে কারণে অন্যরা মনে করে আমরা যদি বাংলাদেশের কাছে এসে সহযোগিতা পেয়ে যাই এই অঞ্চলে চীনের ব্যবসা ও প্রভাবটা বাধাগ্রস্ত করতে পারব। তাতে চীনের বারোটা বাজবে। চীনকে দুর্বল করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য সময়টা চ্যালেঞ্জিং মনে করছেন কি?

ড. মোমেন : বর্তমান সরকারের সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। চ্যালেঞ্জিং একাধিক কারণে। এর মধ্যে আমাদের ভূ-কৌশলগত অবস্থান। আমরা দুই বড় দেশ ভারত ও চীনের মধ্যখানে। আমরা ভীষণ উন্নয়ন করছি। ইতিমধ্যে তিনটা উন্নয়নশীল দেশ, যারা এগ্রেসিভলি (উদম্য গতিতে) উন্নয়ন করছে, তার মধ্যে আমরা একটা। বোস্টন কনসালট্যান্স গ্রুপ বলছে, আমরা নাকি পৃথিবীর মধ্যে নবম বৃহত্তম মার্কেট। অনেকের আকর্ষণ। ব্যবসা-বাণিজ্যেও আকর্ষণ। এখানে সবাই পাইওনিয়ার হতে আগ্রহী। এ ছাড়া আমাদের কিছু দুষ্টু লোক আছে। তারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে স্যাটেল হচ্ছে, তাদের লক্ষ্যই থাকে বাংলাদেশের অনিষ্ট করা। আমেরিকার সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে, কোনো কোনো প্রবাসী সেই সম্পর্ক ভুন্ডুল করার চেষ্টা করে। 

দেশ রূপান্তর : নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন?

ড. মোমেন : আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনটি দিকদর্শন দিয়েছি। সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর রোডম্যাপের পরিপ্রেক্ষিতে করা। এর একটা হলো ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি (অর্থনৈতিক কূটনীতি)। আমি দেখেছি, আমার দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদ। আমি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য, রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আমার লোকগুলোর জন্য গেইনফুল এমপ্লয়মেন্টের (লাভজনক কর্মসংস্থান) আমি অর্থনৈতিক কূটনীতি দিয়েছি। এটার পাঁচটি অঙ্গ। এরই সম্পূরক হিসেবে যাতে মানুষ বিনিয়োগ বাড়ায়, এজন্য আমি পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি (জনকূটনীতি) দিয়েছি। এর জন্য শাখা তৈরি করেছি। সবগুলো মিশনে আমি একটা বঙ্গবন্ধু কর্নার করেছি। যেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানবে। এই কর্নারে শুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকবে না। ওই দেশে আমাদের যে অভাবনীয় সাফল্য, সেই গল্প সেখানে থাকবে। বঙ্গবন্ধু যে সারাজীবন নির্যাতিত হয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য এগুলো দুনিয়াকে জানানো।

আরেকটি নীতি হলো আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। আমি দেখেছি, যেসব এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা আছে, সেখানে উন্নয়ন তাড়াতাড়ি হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন হয়েছে। আমি খুব সৌভাগ্যবান, আমার বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমার দিকদর্শন গ্রহণ করেছে। আমি আশা করব বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার এই দিকদর্শন গ্রহণ করবেন।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরামর্শ চেয়েছেন?

ড. মোমেন : বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নিয়েছেন। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। আমি বলেছি, আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন হলাম, তিন দেশ থেকে দাওয়াত পেলাম। সেগুলো হলো আমেরিকা, রাশিয়া ও ভারত। পরে চীন থেকেও পেয়েছি। আমি প্রথম ভারত গিয়েছি। তাকেও প্রথম ভারত যেতে পরামর্শ দিয়েছি। তারপর আমেরিকা। তিনি প্রথম ভারত সফরে গেলেন।

দেশ রূপান্তর : ভারতের নির্বাচন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. মোমেন : ভারত সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ। তাদের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত স্বচ্ছ ও শক্তিশালী। দেশটির জনগণও পরিপক্ব। নানা রকম অসুবিধা আছে। কিন্তু ভারতের নির্বাচন থেকে আমাদের শিক্ষণীয় আছে। এক নম্বর শিক্ষণীয় হলো ওখানে বিভিন্ন দল আছে। এক দল আরেক দলকে কুড়াল মারে। কিন্তু কোনো দল নির্বাচন বয়কট করেনি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটা শিক্ষণীয় ব্যাপার।

দেশ রূপান্তর : সরকার ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে সামাল দিয়ে যাচ্ছে, সেটা কত দিন চালিয়ে যেতে পারবে?

ড. মোমেন : ভারত-চীন ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমরা নীতি মেনে কাজ করি। যারা আমাদের ওপর চাপ দেন, তারাও জানেন আমাদের এ নীতির কথা। আমরা কারও লেজুড় হয়ে চলতে চাই না। ভারত ও চীন তারা পরস্পরবিরোধী। আমাদের তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জন্ম থেকেই সম্পর্ক। বাংলাদেশের জন্মের সময়ে চীন বিপরীত অবস্থানে ছিল, এখন তারা আমাদের উন্নয়ন সঙ্গী। ভারত-চীনের সমস্যা থাকতে পারে ‘দেয়ার হ্যাডেক নট আস’ (এটা তাদের মাথাব্যথা, আমাদের নয়)। আমরা সেদিকে তাকাব না। আমরা দেখব আমাদের সঙ্গে কী সম্পর্ক।

ভারতও চীন থেকে ঋণ নেয়, তাদের সঙ্গে ব্যবসা করে। আমরাও তাই করি। আমেরিকাও আমাদের বড় অংশীদার। এক নম্বর বিনিয়োগকারী। আমেরিকার সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে, একসঙ্গে কাজ করব।

দেশ রূপান্তর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে কূটনীতি সামাল দিচ্ছেন, সেটাকে কীভাবে দেখেন?

ড. মোমেন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বিদেশনীতিই সামাল দিচ্ছেন না, সবই সামাল দিচ্ছেন। তার নীতিগুলোর আমি নাম দিয়েছি ‘হাসিনা নর্মস’। তিনি গণতান্ত্রিক বিশ্বে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সরকার পরিচালনা করছেন। তিনিই সবচেয়ে বেশি মানুষের মঙ্গলের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। সবচেয়ে নির্ভীকভাবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে দেশটাকে পরিবর্তন করেছেন। এটি সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার এই নীতির জন্য। তিনি বললেন আমি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখব। যেমন ধরেন মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ঝামেলা। তবুও দেশটির সঙ্গে তিনি কিন্তু যুদ্ধ করছেন না। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে চান। এগুলো অভাবনীয়।

দেশ রূপান্তর : আমেরিকার বিরুদ্ধে সরকার ও আওয়ামী লীগের সমালোচনায় কি বিরূপ প্রভাব পড়বে?

ড. মোমেন : দেখেন, গাজা যুদ্ধের পরে আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা পৃথিবীতে অনেক কমে গেছে। আমেরিকার নীতি নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্য দেশে নেতিবাচক আলোচনা হয়। সমালোচনা কূটনীতিতে প্রভাব ফেলবে, এটা আমার মনে হয় না। কারণ এগুলো তো ফ্যাক্ট। তবে সরকারে যারা আছেন, খুব বেশি বাড়াবাড়ি না করলে, চাপে না ফেললে আমেরিকার বিরুদ্ধে সমালোচনা না করাই ভালো, চেপে যাওয়া ভালো।

দেশ রূপান্তর : আবার কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চান?

ড. মোমেন : আমি এই মুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চাই কি না এটা অবান্তর প্রশ্ন। তবে এই মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কী করা উচিত, তার একটি রূপরেখা দিয়েছি। সেগুলো বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পালন করে যাচ্ছেন। তাতে আমি খুব খুশি। আমি মনে করি, সেই রূপরেখা আমরা পালন করতে পারলে আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। আমি যেখানেই থাকি সেটা কোনো ব্যাপার না।

দেশ রূপান্তর : বিদেশি বিনিয়োগ কি যথেষ্ট? আমরা পিছিয়ে আছি কেন?

ড. মোমেন : আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকারের অন্য মন্ত্রী, ব্যবসায়ীরা বিদেশে যান। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক হয়। বিদেশিদের বিনিয়োগ করার আগ্রহ বাড়াতে তাদের হাতে-পায়ে ধরি আমরা। আমাদের দেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধার কথা বলি। সরকার বিনিয়োগবান্ধব সেটাও অবহিত করা হয়। কেউ কেউ আমাদের কথায় ভরসা পেয়ে আসেন। বিনিয়োগ করতে আসার পর আমরা তাদের হাইকোর্ট দেখাই। গত বছর সাতজন প্রবাসী বিনিয়োগ করতে ঢাকায় আসেন। বিমান থেকে নামার পর আমরা তাদের জেলে দিয়েছি। ওই বিদেশিরা স্থানীয় অংশীদার যাকে নিয়েছেন তিনি একটা শয়তানি করে তাদের পুলিশে দিয়ে জামিন অযোগ্য মামলা দিয়ে ঢাকা থেকে বহু দূরের কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ১০ দিন তারা কারাগারে ছিলেন। তারা সবাই সম্মানিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী। তাদের ইংল্যান্ডেও ভালো ব্যবসা আছে। বাংলাদেশেও তারা আর্থিক খাতে আগে ব্যবসা করেছিল।

আমি একজন ভদ্রলোককে হাতে-পায়ে ধরে সিলেটে এনেছি। একজন ব্যারিস্টার, অবস্থাসম্পন্ন। তিনি এখানে একটা বড় রিসোর্ট তৈরি করেছেন, একটা ফাইভ স্টার হোটেল বানাচ্ছেন। সিলেটের অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ নিয়েছেন। ঢাকায়, তারাই একমাত্র কোম্পানি যারা ডাবল গ্লেজ গ্লাস কারখানা চালু করেছেন। তিনি সিলেটে ব্যবসা করতে গেলে সেখানে দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মচারীরা তাকে করের অর্ধেক বিনা নথিতে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ওই ব্যবসায়ী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা বলেন, আপনাকে বাংলাদেশের ‘ট্র্যাডিশন’ জানতে হবে। এখানে ট্র্যাডিশন হলো আপনি সরকারকে যে টাকা দেন আমাদেরও সমপরিমাণ দিতে হবে। তা না হলে আপনাকে অসুবিধায় ফেলে দেওয়া হবে। ওই ব্যবসায়ী জবাব দেন আমি দেব না। আমাকে অসুবিধায় ফেলেন। তাকে এখন বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি অফিসাররা তাকে বলেছেন আপনি সব বিনিয়োগ নিয়ে চলে যান। লন্ডনে ছিলেন লন্ডনে চলে যান। বাংলাদেশে আপনার দরকার নেই। কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের বড় বিনিয়োগ চাই। আর আমাদের দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীরা তাদের বলেন বিনিয়োগ ফিরিয়ে নিয়ে যান।

দেশ রূপান্তর : দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের ঠেকাতে আপনার পরামর্শ কী?

ড. মোমেন : আমি মনে করি, দুর্নীতিবাজ যারা তাদের শুধু দুর্নীতি কমিশনে (দুদক) মামলা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মামলায় দুদক কর্মচারী-কর্মকর্তারাও একটা সুযোগ-সুবিধা পান। যখনই নিশ্চিত হওয়া, বোঝা যায়, ওই সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিবাজ, প্রথমেই তার চাকরি চলে যাবে। এই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, চাকরির কারণেই তিনি দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতিবাজকে জেলে দেওয়াও আমি পছন্দ করি না। জেলে দিলে ৫/৭ বছর জেল খেটে তিনি বেরিয়ে যাবেন। জরিমানা করা হলে জরিমানা দিয়ে দেবেন। আমি মনে করি, এগুলোর কোনো কিছু না করে ওই দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীর অবৈধ উপায়ে অর্জিত সব সম্পদ নিলামে বিক্রি করে দেওয়া। এতে দুর্নীতি নিরুৎসাহিত হবে।

দেশ রূপান্তর : এখন কীভাবে আপনার সময় কাটে?

ড. মোমেন : আমি খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করে। সেখানে নিয়মিত মিটিং হয়। এই কমিটি করার মূল কারণ হলো জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই কমিটি ওয়াচডগ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তাই কমিটির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছি।

আমি বলেছি, সারা পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক নিযুক্ত করে সিনেট সাব-কমিটির মাধ্যমে। আমাদের দেশে যেমন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আছে সিনেট সাব-কমিটি এবং এই কমিটিগুলো খুব ক্ষমতাসম্পন্ন।

সিনিয়র কূটনীতিক, রাষ্ট্রদূত যখন নিয়োগ হয় যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ম হচ্ছে কোনো একটা নাম প্রেসিডেন্ট সিনেট সাব-কমিটিকে পাঠান। সাব-কমিটি সে নাম যাচাই-বাছাই করে ওই ব্যক্তি এ পদে উপযুক্ত কি না। তার সম্পর্কে পুরনো কোনো অভিযোগ আছে কি না। তিনি কোথাও আইনের বরখেলাপ করেছেন কি না। দুর্নীতি করেছেন কি না। যদি তারা মনে করেন, ওই ব্যক্তি উপযুক্ত না, তখন প্রেসিডেন্টকে জানান, তখন প্রেসিডেন্ট আরেকটি নমিনি দেন। এ উদাহরণ টেনেছি স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য এবং প্রধানমন্ত্রীর হাত শক্তিশালী করার জন্য। বিশেষ করে কূটনীতিক যাচাই-বাছাইয়ের কাজটা গুরুত্ব দিয়ে করা শুরু করেছি।

বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রদূতদের একটা তালিকা পাঠায়, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো একজনের পাশে একটা স্বাক্ষর করে দেন। তিনিও খুব চেনেন-টেনেন না। শুধু একটা সারসংক্ষেপ পাঠায় তিনি (রাষ্ট্রদূত) অমুক অমুক জায়গায় চাকরি করেছেন। কিন্তু চাকরি করা অবস্থায় তার সম্পর্কে কোনো অভিযোগ ছিল কি না সেগুলো বেমালুম লুকিয়ে রাখা হয়। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তালিকা পাঠানো শুরু করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করে দিতেন। কূটনীতিক নিযুক্ত করার এই প্রক্রিয়াটা জবাবদিহিমূলক নয়। তাই আমরা প্রস্তাব দিয়েছি স্থায়ী কমিটিতে পাঠালে আমরা যাচাই-বাছাই করব। কারণ আমাদের পরিধি বাড়ছে, লোকের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে উপযুক্ত লোককে পাঠানো দরকার। আমাদের মূল্যায়ন ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় খুব খুঁত আছে। কারণ, মূল্যায়ন, পদোন্নতি বা নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা শুধু খয়ের খাঁ তৈরি করি। ভালো মানুষ তৈরি করি না।

স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে আমরা আরেকটি জিনিস প্রস্তাব করেছি রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে বিদেশে অনেক অবৈধ লোক আছে। অবৈধ কেন? আমি তাকে পাসপোর্ট দিইনি। এনআইডি দিই না। সুতরাং রেমিট্যান্স বাড়ানোর প্রয়োজনে এটা আমাদের গরজ তাকে যথাসময়ে পাসপোর্ট, এনআইডি দেওয়া। কিন্তু যথাসময়ে দেওয়া হয় না কেন? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দোষী হলেও দোষের আসল ভাগীদার না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে যারা পাসপোর্ট রিনিউড করতে আসেন, তাদের সময় দেয়। পরে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠাই। এ দুই জায়গায় আসার পর তারা যাচাই-বাছাইয়ের নামে আটকে দেয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই আটকে দেওয়া পরিহার করতে হবে। সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট রিনিউড হওয়া উচিত। না হলে সরকার তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ডাকঘরে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যাবে, কোথাও যেতে হবে না। আমার এখানে বিরাট লাইনে দাঁড়াতে হয়, লাইনে দাঁড়ালে দালাল হয়, দালালকে পয়সা দিলে রিনিউ হয়, তাড়াতাড়ি তা না হলে হয় না। আমাদের সরকারি কর্মচারীরা এত দুর্নীতিপরায়ণ যে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদেরও হয়রানি করে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত