রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গতকাল সকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে তলিয়ে যায় এসবি পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস। ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের চোখের সামনেই ঘটে এ ভয়াবহ ঘটনা।
আড়াই মাস আগে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ‘সৌহার্দ পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় ২৬ যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘটনার পর দেশজুড়ে ঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যানবাহনের ফিটনেসের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর পুলিশ ও ঘাটসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসন ঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। ফেরিতে ওঠার আগে প্রতিটি যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে নিতে বিশেষ উদ্যোগ শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এতেই এবার বেঁচে গেছে প্রায় ৪০ আরোহীর প্রাণ। গতকালের দুর্ঘটনায় পড়া ওই বাসের যাত্রীরা তাদের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাকে একরকম ‘অলৌকিক’ বলেই মন্তব্য করেছেন।
সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘এসবি পরিবহন’ নামে যাত্রীবাহী বাসটি সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য অবস্থান করছিল। বাসে যাত্রীসহ প্রায় ৪০ আরোহী ছিলেন। এ সময় ফেরিঘাটের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী বাস থেকে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে হঠাৎ করেই চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাসটি ফেরি অ্যাপ্রোচ সড়ক হয়ে পন্টুনের দিকে ধাবিত হয় এবং সেখানে থাকা একটি ইউটিলিটি ফেরি করবীর লোহার ডালা ও সুরক্ষামূলক শেকল ভেঙে সরাসরি গভীর পদ্মায় ছিটকে পড়ে যায়।
ওই বাসের এক যাত্রী আব্দুস সালাম রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমি পরিবার নিয়ে সকাল ৭টার সময় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে এসবি পরিবহনের এই বাসে চড়েছিলাম। বাসটি কুষ্টিয়া থেকে প্রায় ২০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমরা নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখের সামনে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে তলিয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা বেঁচে গেছি। কারণ ওই সময় বাসে চালক ও সহকারী ছাড়া কোনো যাত্রী ছিল না। তবে তারা অক্ষত অবস্থায় বের হতে পেরেছেন।
আরেক যাত্রী আব্দুল আহাদ বলেন, ‘সবাই বাস থেকে নেমে ঘাটের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। সামনে তাকায়া দেখি আমাদের বাসটা গতির সঙ্গে চোখের পলকে পানিতে পড়ে গেল।’ তিনি জানান, ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় শুরুতে কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে নামতে রাজি ছিলেন না। পরে তাদের অনেকটা জোর করেই বাস থেকে নামানো হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি টেনে ওপরে তোলে।
দুর্ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের ওই বাসটি দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। স্বস্তির বিষয় হলো কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পন্টুনে বাসটি ওঠার পরপরই যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।’
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘আগের দুর্ঘটনার পর জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসি সমন্বিতভাবে ঘাট এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষ করে যাত্রীদের বাস থেকে নামানোর বিষয়ে আমাদের কঠোর নির্দেশনা ছিল, যার ফলে এবার বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’ তিনি জানান, বাসটি ফেরির পাটাতনের শেকল ভেঙে নদীতে পড়ে গেলেও ভেতরে কোনো যাত্রী ছিল না। শুধু চালক ও সহকারী (হেলপার) সামান্য আহত হয়েছেন। নৌরুটে যাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভবিষ্যতে ঘাটে আরও কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানো হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে ‘সৌহার্দ পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় ২৬ যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। গতকাল একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে ফেরিঘাট এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যানবাহনের ফিটনেসসংক্রান্ত তদারকি নিয়ে আবারও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
