বাজেটে অর্থনৈতিক সংকট পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। আমরা খুবই আশাবাদী। এর থেকে চমৎকার স্বপ্ন আর হয় না। কিন্তু এটা বাস্তবায়নে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বাজেটে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন নিয়ে আলোচনা নেই। বাজারে অনিয়ম, অর্থ পাচার রোধে কী হবে, দায়দেনার ক্রাইসিস চিহ্নিত করা হয়নি। বড় আকারে আমরা ঋণের পরিস্থিতিতে পড়েছি সেটা স্বীকার করা হয়নি। এর বড় কারণ হচ্ছে যারা এ খাতকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছেন, তারাই এখন এ খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় শিক্ষা ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন ড. এ কে এম এনামুল হক, লেখক ও কলামিস্ট ইলিরা দেওয়ান, ওয়াটার এইডের (দক্ষিণ এশিয়া) আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. খায়রুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ বাজেটে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এটি এমন একটি বাজেট, যা জবাবদিহিহীন। এটি দুর্নীতি সহায়ক ও অনৈতিক বাজেট। এ কথাগুলো বলার অবশ্যই যৌক্তিক কারণ আছে। প্রথমে যদি কালো টাকার বিষয়টি বলি, কালো টাকাকে বৈধতা দেওয়া যাবে না এমন ঘোষণা কিন্তু আমাদের আছে। আপনি সৎভাবে উপার্জন করে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দেবেন, অন্যজন অনৈতিকতার সঙ্গে দুর্নীতি করে প্রচুর পরিমাণে আয় করে নামমাত্র ১৫ শতাংশ কর দেবেন। আবার এসব বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্নও তোলা যাবে না। তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি করছে তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে, লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে সারা বছর অবৈধভাবে আয় করার। বছর শেষে রাজস্ব বিভাগ তাদের ক্লিন সার্টিফিকেট দেবে। অনেকে আবার শুদ্ধাচার পুরস্কার পাবেন, সেরা করদাতার পুরস্কারও পাবেন। এর মাধ্যমে দেশবাসীকে বোঝানো হচ্ছে, তোমরা চাইলে এ পথটা অনুসরণ করো। এসবের কারণে আমরা আগামী প্রজন্মকে বলার সাহস পাব না যে, তোমরা ভালো আদর্শ অনুসরণ করো। এই বলার সাহসটা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নৈতিকতার যে ভিত্তি, তা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংক খাত খাদের কিনারায়। তার জন্য দায়ী যারা, বাংলাদেশে ঋণখেলাপির পথপ্রদর্শক, বাংলাদেশে ব্যাংক জালিয়াতি লুটপাটের পথপ্রদর্শক, বাংলাদেশে কর ফাঁকির পথপ্রদর্শক, বাংলাদেশে অর্থ পাচারের পথপ্রদর্শক যারা, তারা কিন্তু এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং অন্যত্রও বহু শক্তিশালী পক্ষ, তারাই নির্ধারণ করে দেয় ব্যাংক খাত কীভাবে উদ্ধার হবে। তাদের দ্বারা কি কখনো ব্যাংক খাত উদ্ধার হবে? যারা ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন তারাই কিন্তু পথপ্রদর্শক ব্যাংক খাতকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বাজেটে অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। আমরা খুবই আশাবাদী। এর থেকে চমৎকার স্বপ্ন আর হয় না। কিন্তু এটা বাস্তবায়নে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। কী কারণে আমরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়লাম। সেটা ভালোভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে বের হয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর, সুশাসন নিয়ে আলোচনা নেই। বাজারে অনিয়ম, অর্থ পাচার রোধে কী হবে, দায়দেনার ক্রাইসিস চিহ্নিত করা হয়নি। বড় আকারে আমরা ঋণের পরিস্থিতিতে পড়েছি, সেটা স্বীকার করা হয়নি। গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণ শোধ করার জন্য আমাদের রাজস্ব যথেষ্ট ছিল না। আমরা প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেছি। তিনি বলেন, আয়করে কোথায় ছাড় আছে সেটা বাজেটে বলা হয়েছে। বড় ভাবে ছাড় কমানো হয়েছে পরোক্ষ করে। গার্মেন্টস, জ¦ালানি, মাইক্রোক্রেডিটের মতো প্রত্যক্ষ করের ছাড়ে কোনো পদক্ষেপ নেই। আগামীতে কী করা হবে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা নেই। আয়করের ছাড়ের ব্যাপারেও কোনো পদক্ষেপ নেই।
কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ১৫ শতাংশ নগদ অর্থ দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা যাবে। কিন্তু গুলশান এলাকায় ফ্ল্যাট কিনলে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে আপনি বের হয়ে যেতে পারবেন। পুরো বৈধ হবে, একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে ১৫ শতাংশ নয়, ২-৩ শতাংশ দিয়ে আপনি বের হয়ে যেতে পারবেন। কাউকে কেউ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। এটা মানা যায় না।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে নিয়ম রাখা হয়েছে, তা সংবিধান পরিপন্থী। এ বাজেট বে-নজির বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে আমরা কোথাও কোনো স্বস্তি দেখি না। চলমান সময়ে পিছিয়ে পড়া মানুষজনকে সুরক্ষা দিতে হয়। বিভিন্ন খাতে দেখা গেছে প্রস্তাবিত বাজেটে সুরক্ষার বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়ার কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি খাত, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখা যায়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে সুরক্ষা, স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি এবং আসক্ত হওয়ার মতো কিছু পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে বাজেটে অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যত্যয় হয়েছে। ৭ জানুয়ারিতে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া হয়েছে, সেখানে বর্তমান শাসক দল যে ইশতেহার দিয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে তারা ইশতেহারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেনি। প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের বড় ধরনের বরখেলাপ হয়েছে। বর্তমান সরকারের যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা আছে, তার সঙ্গে কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটের কৌশল এবং বরাদ্দের মিল নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা প্রস্তাবিত বাজেটে মেলানো হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব নীতি ও অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছিল, তার সঙ্গে বাজেটের বরাদ্দ মেলে না। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় দেখলে বোঝা যায় সাধারণ মানুষের নয়, ব্যক্তিবিশেষের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।