শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আ.লীগ নেতা মিন্টু আটক তদন্তের মোড় ঘুরে যাচ্ছে!

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০১:৫২ এএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকে আটক করা হয়েছে। আনার হত্যাকান্ডের পর স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডির টাকা নিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহীনসহ প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিরোধের নানা তথ্য উঠে আসছিল। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, আনার চোরাচালানে সম্পৃক্ত এমন কথা তারা বলেননি।

মিন্টুকে গ্রেপ্তারের আগে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহম্মেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে গ্রেপ্তারে করা হয়েছে। ফলে আনার হত্যাকান্ডের তদন্ত নতুন মোড় নিয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মিন্টুকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিচয় দিয়ে একটি দল আটক করে নিয়ে যায়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাকে আটকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেননি ডিবির কোনো কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আনারের মৃত্যুতে সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুল করিম মিন্টুকে। তাছাড়া আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনও তাকে সন্দেহ করার বিষয়টি ডিবিকে জানিয়েছেন। আনারকে অপহরণের অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা থানায় করা মামলার বাদী ডরিন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ডরিনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ায় আওয়ামী লীগের এ নেতাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। আনারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সাইদুল করিম মিন্টুকে শুরু থেকেই সন্দেহ করে আসছিল আনারের পরিবার।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকা-ের পরপরই ঝিনাইদহের কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার মোবাইলে খুনিরা খুদেবার্তা পাঠায়, ‘মিশন সফল’ এটা জানানোর জন্য। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে অনেককে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহম্মেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠায় কিলার শিমুল ভূঁইয়া। আসামিরা তার ফোনে আনারের মরদেহের ছবি পাঠায়। একই ধরনের খুদেবার্তা পাঠানো হয় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর ফোনেও। জেলার সাবেক এক সংসদ সদস্যকেও প্রায় একই ধরনের খুদেবার্তা দেওয়া হয় বলে তথ্য পায় পুলিশ। কেন খুনিরা কাজী কামাল, মিন্টুসহ অন্যদের এ ধরনের বার্তা পাঠাল, সে বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। হত্যা মিশনে তারা জড়িত ছিল, নাকি ফাঁসানোর জন্য অভিনব কৌশল হিসেবে তাদের খুদেবার্তা দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে বিরোধের জেরে আজীমকে হত্যা করে ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’ হলো কি না, তা নিশ্চিত হতে নজর রাখছে গোয়েন্দারা।

তদন্ত শেষে সবকিছু জানানো হবে : আনার হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘সংসদ সদস্য আনার চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা আমরা কখনই বলিনি। আমরা সবসময় বলে আসছি, এমপির ওই এলাকা সন্ত্রাসপূর্ণ একটি এলাকা।’ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হাইওয়ে পুলিশের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওখানে সত্যিকারে কী হয়েছে, সেটা আমাদের জানতে হবে। আমরা তদন্ত করছি, তদন্তের পর আপনাদের সবকিছু জানাব।’

সংসদ সদস্য আনারের মেয়ে ডরিন সন্দেহভাজনদের নাম বলেছেন, তার মুখে কার নাম এসেছে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যখন তদন্ত চলে তখন আমাদের মন্ত্রী, আইজিপি কিংবা তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তদন্ত না করে কোনো কিছু বলা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি তদন্ত শেষ হলে এগুলো নিয়ে কথা বলব।’

স্থানীয় আরও কয়েক নেতা নজরদারিতে : আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঝিনাইদহের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য আনারকে হত্যার পর আসামিরা কার কার সঙ্গে শেয়ার করেছেন তা তদন্ত করা হচ্ছে। ছবি দিয়ে কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন কি না, কাদের মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন, সব বিষয় তদন্ত করে বের করা হচ্ছে। রাজধানীর মিন্টো রোডের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

হারুন অর রশীদ বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। বাংলাদেশে ও ভারত মিলে দুটি মামলা হয়েছে। দুই দেশেরই উদ্দেশ্য অভিন্ন। আমরা কাজ করছি। আসামির সঙ্গে আমরা কথা বলেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সব তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে মনে করেছি, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এজন্য তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনেছি। তার রিমান্ড চলছে, তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। ঘটনা ডিবি-ওয়ারী বিভাগ তদন্ত করছে।’

হত্যাকাণ্ডের পর ২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, ‘এগুলো আমরাও শুনেছি, সবকিছু তদন্ত করছি। হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীন বাংলাদেশ থেকে দিল্লির পর কাঠমান্ডু, এরপর দুবাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। তাকে আমরা ধরতে না পারলেও মোটামুটি বাকি সব আসামির বিষয়ে জানতে পেরেছি। আসামিদের অনেককেই গ্রেপ্তার করেছি।’

কালীগঞ্জে মানববন্ধন : আনার খুন হয়েছেন না গুম হয়েছেন জানতে চেয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মানববন্ধন করেছেন স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। গতকাল উপজেলার সলিমুন্নেছা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এই মানববন্ধন পালন করা হয়। এতে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

গত ১২ মে ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়ে নিখোঁজ হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। পরে তাকে হত্যার খবর আসে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুসারে কিছু হাড় ও মাংসখন্ড উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো আনারের কি না, এর ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত