মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথের বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০১:৫৩ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচল করা ট্রলার ও স্পিডবোট লক্ষ্য করে ওপারে মিয়ানমার থেকে বারবার গুলি ছোড়া হচ্ছে। একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনায় টানা ছয় দিন ধরে এ নৌপথে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রলারসহ নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার একটি স্পিডবোট লক্ষ্য করে ১০ থেকে ১২টি গুলি ছোড়া হয়। তবে স্পিডবোটটিতে থাকা পাঁচজন যাত্রী প্রাণে বেঁচেছেন। এসব গুলিবর্ষণের ঘটনায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাকি সেখানে যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা জড়িত তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউই।

এদিকে একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া পণ্যবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বীপবাসীকে পরিত্রাণ দিতে যাতায়াতের বিকল্প পথ খুঁজছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

গতকালের গুলির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম এলাকার গোলগরা নামে স্থানে যাত্রীবাহী স্পিডবোটটি পৌঁছালে মিয়ানমার থেকে আসা একটি ট্রলার থেকে গুলি ছোড়া হয়।

স্থানীয় নৌযানচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার নাম বদরমোকাম। এর আধা কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া পয়েন্ট। সেখানে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমারের অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর সদস্যরা। যারা কোনোভাবেই টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে ট্রলার বা স্পিডবোট চলাচল করতে দিচ্ছে না। ট্রলার বা স্পিডবোট দেখার সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করছে।

এ নৌপথে টানা ছয় দিন নৌযান চলাচল বন্ধ থাকার পর গতকাল পাঁচজন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট সেন্টমার্টিনের দিকে রওনা হয়। ওই স্পিডবোট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।

স্পিডবোটের মালিক ও ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম জানান, চিকিৎসার জন্য টেকনাফে আসা পাঁচজন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটের চালক মোহাম্মদ বেলাল সকাল সাড়ে ১০টায় টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালীয়া ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। স্পিডবোটটি শাহপরীর দ্বীপ অতিক্রম করে নাফ নদের বদরমোকামের গোলগরা পয়েন্টে পৌঁছায়। এটি নাইক্ষ্যংদিয়ার বিপরীতে বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যে। কিন্তু তারপরও মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া পয়েন্টে ট্রলারে অবস্থানরত অস্ত্রধারীরা বাংলাদেশের জলসীমায় এগিয়ে এসে স্পিডবোটটি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। টানা ১০ থেকে ১২টি গুলি করার পর চালক বেলাল স্পিডবোটটি দ্রুতগতিতে বঙ্গোপসাগরের দিকে নিয়ে যান। পরে স্পিডবোটটি দুপুর ১২টার দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়ে পৌঁছায়।

স্পিডবোটটির যাত্রী ও সেন্টমার্টিন গ্রাম পুলিশের সদস্য মো. শাহীন বলেন, ‘রোগীবাহী আমাদের স্পিডবোট নাইক্ষ্যংদিয়ার বিপরীত পাশে পৌঁছালে মিয়ানমার থেকে অস্ত্রধারীরা গুলি করতে করতে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। পরে আমরা টেকনাফ ফিরে এসে সাগরপথ ধরে সেন্টমার্টিন পৌঁছাই।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠের ট্রলার বা সার্ভিস ট্রলারে যাত্রী ও পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। ট্রলারগুলো নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরের নাইক্ষ্যংদিয়া পয়েন্টে এসে মিয়ানমারের কাছাকাছি এলাকা অতিক্রম করে। আর তখনই ওপার থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। গত ৫ জুন সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার সময় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বহনকারী নৌযানে গুলি ছোড়া হয় মিয়ানমার থেকে। পরদিন নাফ নদের একই পয়েন্টে সেন্টমার্টিনগামী তিনটি পণ্যবাহী ট্রলার লক্ষ্য করে মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয়।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী বোট মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, ‘গত ৬ জুন থেকে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ওইদিন আমার মালিকানাধীন ট্রলারে গুলি করা হয় মিয়ানমার থেকে। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে খাদ্য, মালামাল ও মানুষ পারাপারের জন্য তিনটা ট্রলার যায় ও তিনটা আসে। আর অন্যান্য মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য কিছু ট্রলার চলাচল করে।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, ‘সামনে ঈদুল আজহা। এর মধ্যে টেকনাফের সঙ্গে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্যপণ্য ঢুকছে না। ফলে চরম বিপাকে ও উদ্বেগে রয়েছে দ্বীপের বাসিন্দারা। এভাবে চললে না খেয়ে মরতে হবে দ্বীপের লোকজনকে।’

একই ধরনের তথ্য জানান সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান। তিনি দ্বীপবাসীর পক্ষ থেকে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান দাবি করেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে টেকনাফের ২-বিজিবির অধিনায়ক ও কোস্ট গার্ডের টেকনাফ স্টেশন কমান্ডারের মোবাইল ফোনে গতকাল দুপুরে ও সন্ধ্যায় একাধিকবার কল করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আনা-নেওয়া টেকনাফ থেকে করতে হয়। যেহেতু মিয়ানমার থেকে বারবার গুলি করা হচ্ছে, এ কারণে আমরা সেন্টমার্টিন যাওয়ার বিকল্প পথ নিয়ে ভাবছি। নাফ নদের মোহনায় যেহেতু এ ঘটনা ঘটছে, তাই নাফকে এড়িয়ে বিকল্প কীভাবে খাদ্যসামগ্রী এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যায় এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গুলি কারা করছে সেটি বোঝা যাচ্ছে না। গুলি ছোড়া হচ্ছে, কিন্তু কারা গুলি করছে আমরা বুঝতে পারছি না। যেহেতু ওপারে যুদ্ধ চলছে। আমরা এসব বিষয় সরকারকে জানিয়েছি। স্থানীয়ভাবেও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত