বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মৃত্যুর কারণ জানতে কবর থেকে তোলা হচ্ছে গৃহবধূর লাশ

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০৮:১৩ পিএম

গৃহবধূ আলফা শাহরিনের (২৬) মৃত্যুর পর কেটে গেছে দেড়মাস। শ্বশুর পক্ষের দাবি, ‘রিকশায় ওড়নার পেঁচ’ লেগে আহত হওয়ার জেরেই মৃত্যু হয়েছে তার। কিন্তু পরিবারের দাবি, যৌতুকের টাকা না পেয়ে শাশুড়ি, ননদ ও দেবর মিলে শাহরিনকে শোয়ার ঘরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে পরিকল্পিত খুন করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছে। 

মেয়ের মৃত্যু রহস্য কাটাতে গত ৬ মে উক্ত তিনজনকে আসামি করে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যূনাল-৭ এ একটি পিটিশন দায়ের করেছেন ভিকটিমের বাবা নুরুল করিম। আদালতের নির্দেশনা পেয়ে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো শাখা।

পিবিআই মেট্রো শাখার সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম জানান, তদন্তের অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের জন্য আগামীকাল (১৩ জুন) কবর থেকে শাহরিনের লাশ তোলা হচ্ছে। শাহরিনের শ্বশুরবাড়ি নগরের পশ্চিম ষোলশহর হাদু মাঝির পাড়ায়। পৈতৃক বাড়ি নগরের চালিতাতলী বাজারে এলাকায়।

গত ৬ মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক ফেরদৌস আরা বাদী নুরুল করিমের জবানবন্দি গ্রহণের পর পিটিশনটি সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ এফআইআর গণ্যপূর্বক মামলা তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন, চট্টগ্রাম মেট্রো শাখাকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে গত ৭ মে পাঁচলাইশ থানা কর্তৃপক্ষ ওই পিটিশনটি এফআইআর হিসেবে গণ্য করে মামলা রুজু করেন।

মামলার এজাহারে অভিযোগ, যৌতুকের টাকা না পেয়ে আসামিরা শাহরিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছে। অভিযুক্ত তিন আসামি হলেন—ভিকটিম আলফা শাহরিনের শাশুড়ি বিবি আয়েশা (৪৮), তার ছেলে সামির (২১) ও মেয়ে আশফিকা (১৯)। গত ২৭ এপ্রিল বিকাল ৪টা থেকে পরের দিন ২৮ এপ্রিল ভোর সোয়া ৬টার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৭ জুন বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন চালিতাতলী বাজারের দারোগা বাড়ির মৃত সিরাজুল মোস্তফার ছেলে মো. জাহেদুল মোস্তফার সঙ্গে বিয়ে হয় আলফা শাহরিনের। তাদের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান হয় একই বছরের ১৫ আগস্ট। তাদের এক ছেলে সন্তান আছে। বিয়ের পর থেকে বাবার কাছ থেকে টাকা এনে দিতে স্বামী ও আসামিরা শাহরিনকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে।

নির্যাতনের একপর্যায়ে সুখের আশায় মা এবং আত্মীয়-স্বজন থেকে ৯ লাখ ২১ হাজার টাকা স্বামী এবং শাশুড়ির কাছে এনে দেন শাহরিন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান এবং বিভিন্নজনের টাকা আত্মসাতের মামলায় চলতি বছরের ৯ এপ্রিল গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হন শাহরিনের স্বামী জাহেদুল। এ সময় বাবার কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা এনে দিতে শাহরিনকে নির্যাতন শুরু করেন আসামিরা।

গত ২৭ এপ্রিল বিকালে ‘রিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে’ শাহরিনের ফাঁস লেগেছে বলে তার বাবার (বাদী) কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন শাশুড়ি বিবি আয়েশা। খবর পেয়ে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে বেড রুমের বিছানায় মুমূর্ষ অবস্থায় মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখেন নুরুল আমীন।

এরপর মেয়েকে নগরের বেসরকারি ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড ডেন্টাল হাসপাতালে নিয়ে যান নুরুল করিম। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে শাহরিনকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আইসিইউ খালি না থাকায় শাহরিনকে নিয়ে যাওয়া হয় নগরের বেসরকারি চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টারে।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৮ এপ্রিল ভোরে আলফা শাহরিনকে মৃত ঘোষণা করে মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকেরা। ওই দিন বেলা ২টায় বাবা নুরুল আমীনের পারিবারিক কবরস্থানে  শাহরিনকে দাফন করা হয়। দাফন করার আগে মরদেহের গোসল দেওয়া এক নারী শাহরিনের শরীরে একাধিক ‘আঘাতের চিহ্ন’ দেখে বাদীকে (নুরুল করিম) জানান। 

এদিকে শাহরিনের শ্বশুর বাড়ির মানুষও চাইছেন, ঘটনা যাই হোক দ্রুত সত্যতা সামনে আসুক। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউই কোনও মন্তব্য করতে চায়নি। মামলার তদারক কর্মকর্তা পিবিআই, মেট্রোর সহকারী পুলিশ সুপার একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘‘হত্যা বা আত্মহত্যা কোনও তত্ত্বই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই কিনারা হবে শাহরিনের মৃত্যু রহস্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত