গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের (মানি লন্ডারিং) মামলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত আহমেদ আগামী ১৫ জুলাই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
এ আদেশের মাধ্যমে আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ শুরু হচ্ছে। গতকাল সংশ্লিষ্ট আদালতে ড. ইউনূসসহ অন্য আসামিরা হাজিরা দেন। অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। দন্ডবিধির ৪০৯/৪২০/ ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২)(৩) ধারায় আাসমিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত।
প্রসঙ্গত, শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় এ বছরের ১ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের চারজন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে ছয় মাসের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। তারা জামিনে আছেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে করা আপিল বিচারাধীন রয়েছে।
গতকাল আদালতে লোহার খাঁচায় দাঁড়িয়ে হাজিরা দিয়েছেন ড. ইউনূস। এজলাস থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘একজন নিরপরাধ নাগরিককে আদালতে লোহার খাঁচায় দাঁড় করিয়ে রাখা অত্যন্ত অপমানজনক।’ তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গত ২ জুন এ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করে ১২ জুন (গতকাল) আদেশের দিন ধার্য করেছিলেন বিচারক। ওইদিনও লোহার খাঁচায় দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়ে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ড. ইউনূস বলেছিলেন, তার ওপর দেবদেবীর অভিশাপ লেগেছে। এ কারণে তাকে আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। এ মামলায় গত ২ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র শুনানির জন্য গ্রহণ করে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। একই সঙ্গে মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ বদলির আদেশ হয়। প্রসঙ্গত, গত ৩ মার্চ ড. ইউনূস আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশ দেয়।
খাঁচায় দাঁড়ানো অপমানজনক : আদালত থেকে বেরিয়ে ড. ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আমরা অনেকক্ষণ খাঁচায় (কাঠগড়া) ছিলাম। আমি আগেও প্রশ্ন তুলেছি, এটা কি ন্যায্য? যতদূর জানি, যতদিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছে, ততদিন তিনি নিরপরাধ।’ তিনি বলেন, ‘একজন নিরপরাধ নাগরিকের লোহার খাঁচায় দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত অপমানজনক। এটা গর্হিত কাজ। এটা কারও ক্ষেত্রেই যেন প্রযোজ্য না হয়। এর পর্যালোচনা হোক।’
ড. ইউনূস বলেন, ‘একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, যেখানে একজন নাগরিক দোষী সাব্যস্ত হননি। অনেক আইনজ্ঞ আছেন, বিচারপক্ষের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করে দেখবেন, এটা রাখার দরকার আছে কি নেই। সভ্য দুনিয়ায় যেভাবে হয়, সেভাবেই হওয়া উচিত, যাতে আমরা সভ্য দেশের তালিকায় থাকতে পারি।’
হয়রানির মধ্যে আছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘মানি লন্ডারিং, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা এসব শব্দের সঙ্গে আমি পরিচিত নই। অথচ এসব শব্দ আমার ওপর আরোপ করা হচ্ছে। আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। সারা জীবন আমরা মানুষের সেবায় কাটিয়েছি। আমরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করেছি। এটাই আমাদের ইতিহাস। কিন্তু আমাদের বোধে আসছে না কেন এ হয়রানি?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি রক্তচোষা, আমি সুদখোর, আমি দেশের শত্রু, আমি পদ্মা সেতুর অর্থ আটকে দিয়েছি, চারদিকে ষড়যন্ত্র করে বেড়াই এভাবেই বলা হচ্ছে। এগুলো হয়রানি।’
উচ্চ আদালতে যাবেন ড. ইউনূস : অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন ড. ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করার কথা বলে আদেশের অনুলিপি চেয়েছিলাম। আদালত বলেছেন, সময়মতো অনুলিপি দেওয়া হবে। আগামীকালের (আজ বৃহস্পতিবার) পর এ মাসে (জুন) উচ্চ আদালতে অবকাশ থাকবে। এ সময়ে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করতে পারছি না। বিচার নিয়ে তাড়াহুড়া থাকলেও আমাদের আদেশের অনুলিপি দিতে বিলম্ব করা হচ্ছে।’
যেভাবে বিচারের মুখোমুখি নোবেল বিজয়ী : গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩-এর ৩০ মে ড. ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠানটির ১২ জনের নামে মামলা করে দুদক। গত ২৯ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলার অন্য আসামিরা হলেন গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক এমডি মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এসএম হুজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, আইনজীবী মো. ইউসুফ আলী, জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, ইউনিয়নের প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক মো. কামরুল হাসান।
