নিসর্গের খুন
এই প্রকৃতি একদিন আমাদের গ্রাস করবে
জিরাফের মতো গ্রীবা বড়িয়ে অকস্মাৎ,
কাঁঠালিচাপার বন, এই জ্যোৎস্নারাত
অমলিন নিসর্গের শোভা হানাদার দস্যুর মতো
ভয়ঙ্করভাবে ছুটে আসবে
আমাদের দিকে,অবরোধ করবে ঘরবাড়ি, শস্যের গোলা
খাদ্যভান্ডার লুট করে নিয়ে যাবে আমাদের মুখের গ্রাস
ভেঙে ফেলবে যাতায়াতযোগ্য স্থলপথ,
এই শান্ত চুপচাপ জলরাশি একদিন ধেয়ে আসবে আমাদের দিকে
নিশিডাকাতের মতো ডাক ছেড়ে হামলা করবে
চারদিক থেকে ঘিরে হত্যা করবে আমাদের ,
কেড়ে নেবে নগরকোটালের হাতের বাঁশি, বর্ম,
মাথার টুপি, শাদা পোশাক
সরল চাষার লণ্ডভণ্ড করবে খামার, শস্যক্ষেত
নিশিরাতে গোয়াল থেকে খেদিয়ে নেবে গরুর পাল
কালো খোঁয়াড়ে
বন্দী করবে একে একে,
লুটপাট করবে স্থানীয় মুদির দোকান, সারাগ্রাম
কাঠমিস্ত্রির সাজসরঞ্জাম তছনছ করবে,
জলের স্বেচ্ছাচার ছিনিয়ে নেবে গৃহবাসী ভালোবাসা
গোঁয়ার ট্রাকচালকদের মতো নিসর্গ আমাদের
একদিন ফেলে দেবে গভীর খাদে
যেখানে ধসে পড়বে আমাদের এই দিনরাত্রি
শক্ত প্রাচীর, বড়ো বড়ো অট্টালিকা
মহেঞ্জোদাড়োর মতো ধ্বংস হবে আমাদের নগরসভ্যতা
শাদা হাসপাতাল, পৌরসভা,
পার্ক ও খেলার মাঠ
বাঁধ ও সেতু ভেঙে আমাদের ভসিয়ে নেবে দুর্ধর্ষ প্লাবন,
আকাশ আমাদের বিরুদ্ধে একদিন ষড়যন্ত্র করবে
এই কাঁঠালিচাঁপার বন, জ্যোৎস্নারাত, পাখিডাকা নিসর্গ
সমুদ্রের বেলাভূমি সবাই,
এই আক্রমণকারী প্রকৃতির হাতে
একে একে ধ্বংস হবো আমরা
শিশু, বৃদ্ধ, যুবা
নিসর্গের প্লাবনে ভাসবো অন্তহীন লাশ!
আমলা-নামা
কিছু কিছু আমলা আছে
তাদের বড়ো গামলা আছে
তাতেই বহন করেন তারা মাল।
তাদের অনেক পাওয়ার আছে
অনেককিছু খাওয়ার আছে
কুমির এনে তারাই কাটেন খাল।
কেউ বা আবার খোদার খাসি
কেউ বা আবার বাঘের মাসি
কেউ বা আবার বিক্রি করেন দেশ।
কেউ বা আবার মিষ্টি হেসে
পাচার করেন সব বিদেশে
দেশটা তখন হয় যে পুরো শেষ।
আমলা নামক এই খুনিরা
লাঞ্ছনা দেয়, যে গুণীরা
জ্বালায় আলো সবার মনের মাঝে।
তাঁদের ওরা আঘাত করে
আগুন জ্বালায় তাঁদের ঘরে
তবু তারা বহাল থাকে কাজে।
যে আমলারা দেশপ্রেমিক
তারাই ঘোরে এদিক-ওদিক
পায় না তারা, তাদের যেটা ন্যায্য
তার বদলে ভাগ্যে জোটে
চাকরি থেকে রিজাইন মোটে
মন্ত্রী সাহেব তাদের করেন ত্যাজ্য।
ন্যায়ের বিচার পায় না তারা
মাথার উপর প্রবল খাড়া
পদোন্নতি হয় না তাদের ভাগ্যে।
এই কথা আর লিখবো কতো
সবাই বুঝুন নিজের মতো
লিখবো না আর দুখের কথা, থাক গে।
আমার এ-ভয় অন্যরকম
তোমরা সবাই ভয় পাও এই বাইরে যেতে
দুয়ার খুলে বাইরে যেতে
পথ পেরোতে
গাড়ির ভিড়ে বড়ো রাস্তা পার হতে যেই পা বাড়ালে
ভয় পাও এই আগুন দেখে
বারুদ দেখে
দোজখ দেখে ভীষণ রকম গজব দেখে খোদাতালার
তোমরা সবাই ভয় পাও এই দাঙ্গা দেখে
মড়ক লাগলে মহামারী এমনি কিছুর
ভয় পাও ঠিক রাত-বিরেতে অন্ধকারে
যাকে তাকে দেখলে হঠাৎ
হয় পাও এই সাপের বাঘের
চোর-ডাকাতের দৈত্যদানা জলপুলিশের
অনেক কিছুর ভয় তোমাদের
ভয় তোমাদের বাইরে কেবল চেখের ওপার,
আমার এ-ভয় অন্যরকম
অন্য কিছুর
আমার কিছুর
আমার এ-ভয় বাইরে তো নয়
ঘরের ভিতর নিজের ভিতর
আমার এ-ভয় নিজেকে ভয়
আমার এ-ভয় শোবার ঘরে বাথরুমটির
ঠাণ্ডা জলের টবের ভিতর
দাড়ি কাটার লম্বা ক্ষুরে
চায়ের কাপে কাঁটা-চামচে
আমার এ-ভয় আলমারিতে
বইয়ের তাকে ফুলদানিতে
মুখ দেখবার আয়না খুলে ড্রয়ার খুলে
আমার এ-ভয়
আমার এ-ভয় শত্রুকে নয় প্রিয়ার চোখে
নরম ঠোঁটে
নিজের দুটি করে মাঝে নখের ভিতর
আমার এ-ভয় অন্যরকম অন্যরকম।
কবি নামের চামচা
কবি নামের চামচা আছে
গলায় তাদের গামছা আছে
কবি আছে নানান রকমফের;
আমলা দেখে হাত কচলায়
তেল মারে আর মাছ খচলায়
দুই আনাতে কবি বিকোয় ঢের!
অকবিদের কবি বানায়
তাদের কি আর কবি মানায়?
দামড়া কিছু কবি আছে
তাদের বুকে ছবি আছে
বলতে পারো সে-সব ছবি কাদের?
গুলশানেতে বাড়ি আছে
সাপ্লাইয়ের নারী আছে
হরেকরকম মুখোশ আছে যাদের।
টাকার জোরে, মামার জোরে
দেশ-বিদেশে তারাই ঘোরে
উৎসবেতে তারাই যে হয় গণ্য;
কবিতা আর শিল্প তো নয়
ক্রমশ তা হচ্ছে যে ক্ষয়
কবি নামের অকবিদের জন্য!
এনজিওগ্রাম
বাইপাস দিয়ে নতুন রাস্তা ধরে ছুটে যেতে আমার খুব ভালো লাগে!
কিন্তু তার জন্যে সংযোগ-সড়ক চাই-
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এরকম ভাবতে-ভাবতে
যখন জানলাম, সংকীর্ণ পথের শেষপ্রান্তে ব্যারিকেড দিয়ে বসে আছে
রক্তকণিকার জমাটবাঁধা কিছু কেয়াকাঁটার ঝাড়-
তখন তাকে অপসারিত করার জন্য সশস্ত্র পুলিসবাহিনীর মতো
যখন একা একা খুব দ্রুতবেগে ছুটে গেলো
স্প্রিংয়ের কেমিক্যালসজ্জিত কিছু স্বয়ংক্রিয় তার-
আমার চোখে নেমে এলো অসমাপ্ত ঘুম!
ঘুম ভাঙলে জানতে পারলাম, এরই মধ্যে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটে গেছে
কোলাহলমুখরিত হৃদয়ের আন্তরপ্রদেশে;!
২.৭৫ সেন্টিমিটার আকারের অপ্রতিরোধ্য ট্যাংকও তাকে
প্রতিহত করতে পারেনি কোথাও!
অন্ধকার রাত্রির বাইপাস পার হয়ে অবদমিত একটি হৃদয় শুধু ছুটে গেছে
মাধবীলতার বনে, অসংবৃত সুন্দরের কাছে!
বেসরকারি গ্রামে গ্রামে আগুনের হলকায় সরে গেছে
মৃত্যুর বাইপাসে ধাবমান আর একখানি তরল হৃদয়!!
কবি অসীম সাহা আর নেই