সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ যা জানা গেল

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৪, ০৯:২৪ পিএম

টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট জেলা বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিলেট মহানগরী এবং জেলার ১৩টি উপজেলায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৩টি ওয়ার্ড এবং জেলার ১৩টি উপজেলার ১০৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫৪৮টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কসহ সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার পাকা সড়কে পানি উঠায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে খেতের ফসল, ভেসে গেছে চাষের মাছ।

জানা যায়, সুরমা নদীর তীর উপচে সিলেট মহানগরীতে পানি প্রবেশ করে তীরবর্তী পাড়া-মহল্লাগুলো পানিতে থৈ থৈ করছে। নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকা শাহজালাল উপশহরের প্রতিটি সড়ক ও সকল বাসার নীচতলা পানিতে নিমজ্জিত। এছাড়া নগরীর মেন্দিবাগ, যতরপুর, ছড়ারপাড়, কালিঘাট, মাছিমপুর, শেখঘাট, কলাপাড়া, বাগবাড়ি, শিবগঞ্জ, রায়নগর, সোবহানীঘাট, কামালগড়, তালতলা, জামতলা, কাজিরবাজার, আখালিয়া, দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই, বরইকান্দি, আলমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে কোথায়ও হাঁটু পানি, কোথায় কোমর পানি, কোথায়ও গলা পর্যন্ত পানি উঠেছে। নিচু এলাকাগুলোর কলোনি, বাসা-বাড়ি প্রায় পুরোটাই তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এতে চরম বিপাকে এসব এলাকার মানুষ। পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে বাসা-বাড়ির মূল্যবান আসবাবপত্র, দোকানের মূল্যবান জিনিসপত্র। সুরমা ও কুশিয়ারাসহ নদ-নদীগুলোর পানি অধিকাংশ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

২০২২ সালে সিলেটে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এবারের চলতি বন্যা এখনও ওই পর্যায়ে না পৌঁছলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন বন্যা দুই বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। সিলেটে ঘনঘন এমন ভয়াবহ বন্যার জন্য প্রবল বৃষ্টিপাত, ভারত থেকে নেমে আসা ঢল, সুরমা—কুশিয়ারার নাব্যতা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন। তবে নতুন করে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে কিশোরগঞ্জের হাওরের মাঝখান দিয়ে তৈরি ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক। এই সড়কের কারণে সিলেট অঞ্চলের নদী-হাওরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। পানি স্বাভাবিকভাবে ভাটির দিকে গিয়ে নামতে পারছে না। তাই ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নিয়ে এখন সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনায় সরব। তারা দাবি তুলেছেন সিলেটের সাম্প্রতিক এমন ভয়াবহ বন্যার কারণ খতিয়ে দেখতে এবং ওই সড়কটি এজন্য দায়ী হলে এব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট সিটি করপোরেশনের বন্যাকবলিত ২৩টি ওয়ার্ডে অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি আছেন, এরমধ্যে আড়াই হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। সিলেট সদর উপজেলা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ উপজেলায় ১৫৪৮টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত। এসব এলাকার ৮ লাখ ২৫ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত। পুরো জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ৬৫৬টি। এতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ।

সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষনিকভাবে জরুরিসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে।  

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার ও সিলেটে ৩৭ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলশীদে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ও ফেঞ্চুগঞ্জে বিপদসীমার ৯২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া সারি, গোয়াইন, পিয়াইন, ধলাইসহ প্রতিটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সিলেট নগরীতে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, সিলেটের উজানে অবস্থিত ভারতের আসামে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে প্রবল ঢল নেমে আসছে সিলেটে। এতে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

বুধবার সন্ধ্যায় সুরমা নদীর চাদনীঘাট, শেখঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর তীর উপচে পানি দ্রুত নগরীতে প্রবেশ করছে। শেখঘাটের আখলু মিয়া বলেন, ২০২২ সালে একইভাবে সুরমা উপচে বাসা-বাড়ি, দোকানপাট তলিয়ে গিয়েছিল। এবার এখনও পরিস্থিতি ওই পর্যায়ে না গেলেও অবস্থা দেখে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি।

প্রসঙ্গত এর আগে গত ২৭ মে সিলেটে আকষ্মিক বন্যা দেখা দেয়। এক রাতেই প্লাবিত হয় সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ উপজেলা। সেই পানি পুরোপুরি নামার আগেই ১৫ জুন থেকে বন্যাকবলিত হয়েছে সিলেট মহানগরসহ পুরো জেলা।

জকিগঞ্জে একজনের মৃত্যু

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে আবদুল হালিম (৫৫) নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার মুহিদপুর গ্রামের মৃত রনই মিয়ার ছেলে।

স্থানীয়সূত্রে জানা গেছে, আবদুল হালিম বুধবার সকাল ৯টার দিকে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি স্রোতের টানে নিখোঁজ হন। বেলা ২টার দিকে শাহবাগ মুহিদপুর এলাকায় তার লাশ ভেসে ওঠে।

জকিগঞ্জ থানার এসআই মহরম আলী জানান, বন্যার পানিতে একজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। লাশ উদ্ধারের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকতাদের অনুমতিসাপেক্ষে ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সিলেটে দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী

সিলেটের বন্যাকবলিত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. মহিববুর রহমান এমপি। বুধবার বিকাল ৩টায় নগরীর মিরাবাজার কিশোরী মোহন বালক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে তিনি ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় প্রতিমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সিলেটের জন্য নগদ ১০ লাখ  টাকা, ১০০ মেট্রিকটন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেন।

ত্রাণ বিতরণকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন,  বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। এরমধ্যে সিলেট অঞ্চল অন্যতম। সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রতিনিয়ত খোঁজ-খবর রাখছেন।

তিনি আরও বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী আমাদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখছেন। ঈদের দিন আমকে ফোন করে বন্যার খবর জানান। পানিবন্দিদের ত্রাণ সাহায্যের তিনি অনুরোধ জানান। তাই দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টাকা, ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ করেছি।

দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যার খবর রাখছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবার বিতরণ করছে সিটি কর্পোরেশন। পানি না কমা পর্যন্ত আমাদের ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপি, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল ইসলাম, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার আবু আহমদ সিদ্দিকী, জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত