ঈদের দিন দুপুরে তুরস্কের আন্তালিয়া থেকে বাংলাদেশের জন্য ভেসে এলো দারুণ সুখবর। প্যারিস অলিম্পিকে সরাসরি খেলার সুযোগ করে নিয়েছেন বাংলাদেশ তরুণ আরচার সাগর ইসলাম! বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাদশ শ্রেণির এই ছাত্রের কল্পনাতীত এই সাফল্যের খবরটা ফোনে জানালেন বিকেএসপির আরচারি কোচ নূরে আলম। তার কাছ থেকেই জানা হলো সাগরের তীরন্দাজ হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা। যে গল্পে মিশে আছে একজন বিধবা মায়ের সংগ্রাম।
রাজশাহী শহরের বঙ্গবন্ধু কলেজের সামনের চার রাস্তার মোড়ে টং দোকানের চা বিক্রেতা সেলিনার চার সন্তানের সবার ছোট সাগর সদর্পে পা রাখতে যাচ্ছেন প্যারিস অলিম্পিকের বিশ্বমঞ্চে।
অলিম্পিক এলেই বিশ্ব মিডিয়ায় চাউড় হয় একটা পরিসংখ্যান, যে কোনো বাংলাদেশিকেই যা ভীষণভাবে ব্যথিত করে। অলিম্পিকের ইতিহাসে পদক জিততে না পারা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশগুলোর তালিকার ওপরের দিকে থাকে বাংলাদেশের নাম। বিশ্বের বাঘা বাঘা সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয় ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের পশ্চাৎপদতার খবর।
গেল চার দশক ধরে অলিম্পিকে প্রতিনিধিত্ব বাংলাদেশের। পদক স্বপ্ন যে দেশের মানুষের আলোকবর্ষ দূরে, ওয়াইল্ড কার্ডের বদান্যতায় যে দেশের অলিম্পিক নিছকই দেশ-শহর ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মঞ্চ, সেই দেশ থেকে সরাসরি খেলার সুযোগই ধরা হয় বিশাল সাফল্য হিসেবে। সেই খবরের জন্ম সাগরের আগে দিয়েছেন কেবল গলফার সিদ্দিকুর রহমান ও আরচার রোমান সানা। নিজ যোগ্যতায় প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০১৬ রিও অলিম্পিকে খেলেছেন সিদ্দিকুর। তার দেখানো পথে হেঁটে রোমান সানা টোকিও অলিম্পিকে পেয়ে যান বিশ্ব আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক।
রোমানের সেই সাফল্যের পর আরচারি নিয়ে প্রত্যাশার পারদটা দিনকে দিন কেবল বেড়েছে। তবে প্যারিস অলিম্পিকের সময় যত ঘনিয়েছে, ততই মিলেছে হতাশার খবর। কোটা পাওয়ার আসরগুলোতে বারবার হতাশা উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের আরচাররা। আন্তালিয়ায় ১৩ থেকে ১৭ জুন বসেছিল অলিম্পিকের কোটা পাওয়ার চূড়ান্ত আসর। ঈদের আগের দিন অর্থাৎ রবিবার রিকার্ভ পুরুষ দলগত ইভেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে হাকিম আহমেদ রুবেল, রামকৃষ্ণ সাহা ও সাগর ইসলাম যখন হেরে বিদায় নেন, তখন কোটা পাওয়ার আশা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন।
লড়াই শুরুর পর দেখতে দেখতে বাংলাদেশের তিন তীরন্দাজই উঠে আসেন শেষ ষোলতে। এই ধাপে এসে প্রত্যাশার কেন্দ্রে থাকা রুবেল বিদায় নিলে আরেকবার ধাক্কা খেতে হয়। রামকৃষ্ণ বিদায় নেন শেষ আট থেকে। তবে এগিয়ে চলেন ১৮ বছরের সাগর। দেখতে দেখতে নাম লিখান ফাইনালে। তাতেই নিশ্চিত হয় অলিম্পিকের টিকিট।
ফাইনালে অবশ্য উজবেকিস্তানের সাদিকভ আমিরনভের কাছে ৬-০ সেটে হারতে হয় তাকে। স্বর্ণ জিততে না পারলেও দেশের জন্য কোটা এনে দিতে পারেন সাগর। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সংগ্রামী মায়ের কথাটাই সবার আগে বললেন সাগর, ‘আমাকে তিন বছরের রেখে বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন টেম্পো মেকানিক। তিনি মারা যাওয়ার পর আমাদের চার ভাই-বোনকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে যান মা। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে রাস্তার পাশের খুলে বসেন চায়ের দোকান। গেল ১৫ বছর দেখেছি মা কী সংগ্রাম করে আমাদের বড় করেছেন। তিনি অনেক সাহসী মানুষ। কখনো হার মানেন না। তীর-ধনুক যখন হাতে নিই, তখন কেবল মায়ের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনিই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।’
আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যেও সাগরের আরচার হয়ে ওঠার স্বপ্নকে প্রশ্রয় দিয়েছেন চা বিক্রেতা মা সেলিনা। দেশ রূপান্তরের কাছে সাগরের ছোট্টবেলার গল্পটা এভাবেই বললেন, ‘ওর বাবা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। ওর বড় দুটি বোন আর একটি ভাই আছে। তিনজনকেই পড়ালেখা করিয়েছি এবং বিয়ে দিয়েছি। আমার চায়ের দোকানের সামনেই আছে একটি আরচারি ক্লাব। ছোটবেলায় সাগর আমার সঙ্গে দোকানে এলেই দৌড়ে গিয়ে আরচারি খেলার মাঠে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ওর আগ্রহ দেখে, সেই ক্লাবেই ওকে ভর্তি করে দিই। পরে ক্লাস সেভেনে ভর্তি করাই সাভার বিকেএসপিতে। ওকে আরচারি খেলতে দেওয়ায় অনেকেই অনেক কটু কথা বলেছে। তবে আমি চেয়েছি ও এই খেলা দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হোক। আমার ছেলে দেশের জন্য এত বড় সম্মান বয়ে এনেছে, ভাবতেই চোখে পানি চলে আসছে। আপনারা সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন যাতে ও অলিম্পিকে আরও বড় কিছু জিতে আনতে পারে।’
চলতি টি-২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপের শুরুর আগে বাংলাদেশ দলের করুণ অবস্থা দেখে নেটিজেনরা ট্রল করে দলের নাম দিয়েছিল ‘মায়ের দোয়া’ ক্রিকেট দল। ট্রলের জবাবটা শান্ত-সাকিব-মোস্তাফিজরা দিচ্ছেন ভালোভাবেই, তারা উঠে গেছেন সুপার এইটে।
এই ‘মায়ের দোয়ার’ বিষয়টি কিন্তু সাগরের সঙ্গে খুব যায়। গত ২ বছর ধরে তিনি আছেন গাজীপুরের জাতীয় দলের ক্যাম্পে। তারও আগে থেকে সাভার বিকেএসপিতে। এমন একটা খেলা বেছে নিয়েছেন, যা থেকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ বলতে গেলে নেই। তারপরও সংগ্রামী সেলিনার নিঃস্বার্থ দোয়া সঙ্গী সাগরের, ‘আমার চার সন্তানের কাছে আমি কিছু চাই না। ছেলে বড় হয়ে আমাকে সুখে রাখবে, সেই চাওয়াও নেই। কেবল চাই ওরা প্রতিষ্ঠিত হোক। দেশের জন্য আরও সম্মান বয়ে আনুক। মা হিসেবে আমার এরচেয়ে বেশি কিছু চাওয়া নেই।’
বয়স যত বাড়ছে ধীরে ধীরে সাগরের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে সংগ্রামী মায়ের লড়াকু জীবনটা। আন্তালিয়া থেকে ফোনে বললেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, তখন অনেক বায়না করতাম। যখন তখন টাকা চাইতাম। মা ঠিকই দিয়ে দিত। একবারও না করত না। তখন বুঝতাম না, টাকা উপার্জন করতে মায়ের কতটা কষ্ট হয়। এখন বড় হচ্ছি, বুঝতে পারছি। মায়ের এই ত্যাগ, এই সংগ্রামই আমাকে বড় স্বপ্ন দেখায়। মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমার জীবন সার্থক।’
এই সাগরে এখন কেবল চা বিক্রেতা সেলিনার অধিকার নেই, এই সাগর এখন গোটা বাংলাদেশের। ‘মায়ের দোয়া’ সঙ্গী করে সাগর এবার আরও বড় স্বপ্ন দেখুক, আরও বড় সম্মানে দেশকে সম্মানিত করুক, এটাই প্রত্যাশা।
