উত্তেজনার মধ্যেই সীমান্তে 'দেয়াল' তুলছে উত্তর কোরিয়া!

আপডেট : ২১ জুন ২০২৪, ০৮:১৭ পিএম

দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তের কাছে বেশ কয়েকটি স্থানে উত্তর কোরিয়ার কিছু স্থাপনা নির্মাণের ছবি ধরা পড়েছে স্যাটেলাইট ছবিতে। ধারণা করা হচ্ছে, সীমান্তে দেয়াল তুলছে উত্তর কোরিয়া। বিবিসির ভেরিফাইড ছবিতে দেখা গেছে, সীমান্তের কাছাকাছি বেশ কিছু জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা যাকে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘকালীন যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে মনে করছেন। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে ৪ কিলোমিটার নিরাপদ অঞ্চলকে নিরস্ত্রীকৃত এলাকা ধরা হয়। উত্তর কোরিয়ার এই সাম্প্রতিক কার্যকলাপকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন এক সময় চিত্রগুলো সামনে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।

সিউলভিত্তিক বিশেষজ্ঞ সাইট এনকে নিউজের সংবাদদাতা শ্রেয়াস রেড্ডি বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা শুধু অনুমান করতে পারি যে, উত্তর কোরিয়া সীমান্তে তাদের সামরিক উপস্থিতি ও শক্তি জোরদার করতে চাইছে।”

উত্তর কোরিয়ার যে এলাকায় এসব পরিবর্তন ঘটেছে তা ভালোভাবে দেখার জন্য বিবিসি ভেরিফাই কমিশন সীমান্তের ৭ কিলোমিটার এলাকায় উচ্চ-রেজোলিউশন স্যাটেলাইট চিত্র তৈরি করেছে।

স্যাটেলাইটের এসব ছবিগুলোতে দেখা গেছে, সীমান্তের পূর্ব প্রান্তের কাছাকাছি প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে তিনটি জায়গায় নিরস্ত্রীকৃত এলাকার দেয়ালের মতো স্থাপনা তোলা হয়েছে। সীমান্তের অন্যান্য অংশে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ওই এলাকার আগের ছবি না থাকায় বোঝা যায়নি, এসব স্থাপনা কবে থেকে নির্মাণ শুরু হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ধারণ করা ছবিতে এসব স্থাপনা দেখা যায়নি।

সিউলের আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. উক ইয়াং বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হচ্ছে, এই প্রথমবারের মতো তারা একে অপরের স্থানগুলোকে আলাদা করতে দেয়াল তৈরি করল। ১৯৯০ এর দশকে উত্তর কোরিয়া ট্যাংক প্রতিরোধী দেয়াল স্থাপন করেছিল, যাতে যুদ্ধ শুরু হলে ট্যাংকের অগ্রযাত্রা ঠেকানো যায়। কিন্তু সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া ২-৩ মিটার উঁচু দেয়াল তৈরি করছে এবং সেগুলো ট্যাংক প্রতিরোধী দেয়ালের মতো নয়। দেয়ালগুলোর আকৃতি দেখে মনে হচ্ছে এগুলো শুধু ট্যাংক বাধা দেওয়ার জন্যই নয়, বরং কোনো এলাকাকে বিভক্ত করতে তৈরি করা হয়েছে।”

উত্তর কোরিয়া অংশে নিরস্ত্রীকৃত এলাকায় জমি ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। সীমান্তের পূর্ব প্রান্তের সর্বশেষ উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের (জেসিএস) এক কর্মকর্তা সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তাদের সামরিক বাহিনী সীমান্তেদ 'কৌশলগত’ সড়ক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, মাইন স্থাপন এবং পতিত জমি পরিষ্কার করার তৎপরতা চিহ্নিত করেছে।

তবে কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিভাগের অধ্যাপক কিল জু বান বলেছেন, সামরিক ও অসামরিক, উভয় দিক থেকেই ভূমি পরিষ্কার করা হতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এশিয়া ও কোরিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ভিক্টর চা বলেন, “নিরস্ত্রীকৃত এলাকায় কাঠামো নির্মাণ করা অস্বাভাবিক এবং পূর্ব আলোচনা ছাড়াই যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হতে পারে।”

১৯৫৩ সালে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কোরিয়ান যুদ্ধ শেষ হয়েছিল; যেখানে উভয় পক্ষই "অসামরিক অঞ্চলের মধ্যে কোনো শত্রুতামূলক কাজ সম্পাদন না করার" প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি হয়নি।

লন্ডনের কিংস কলেজের ইউরোপিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রধান ড. র‍্যামন পাচেকো পার্দো বলেন, “'দক্ষিণ কোরিয়ার হামলা ঠেকাতে উত্তর কোরিয়ার আসলে আর কোনো দেয়ালের প্রয়োজন নেই, কিন্তু এই সীমান্ত বেষ্টনী তৈরি করে উত্তর কোরিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা একত্রীকরণ চায় না।”

অক্সফোর্ডের কোরিয়ান উপদ্বীপ বিষয়ক গবেষক ড. এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে আলোচনায় বসতে চায় এমন ভানও করছে না উত্তর কোরিয়া। আবার তাদের সাথে আলোচনার জন্য জাপানের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাও প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। এই অবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার উষ্ণ সম্পর্কের কারণে এ বছর উস্কানি বাড়লে এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত