সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চালকদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না পুলিশ

  • আন্দোলনের পর ব্যাটারি রিকশার দখলে রাজপথ
  • প্যাডেল রিকশার সংখ্যা কমে বাড়ছে ব্যাটারির রিকশা
  • পোয়াবারো রাজনৈতিক নেতা, উঠতি সন্ত্রাসী ও পুলিশের
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪, ১২:৩৯ পিএম

উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের চৌরাস্তায় প্রচণ্ড যানজট। এরই মধ্যে চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ট্রাফিক আইন অমান্য করে রাস্তার মাঝখানে এসে দুটি প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাড়িগুলো। ট্রাফিক পুলিশ এলে রিকশাচালকরা প্রাইভেট কার চালকদের উল্টো দোষারোপ করেন। এতে পুলিশও অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের কারণে যানজটের মাত্রাও যায় বেড়ে। একই দৃশ্য দেখা গেছে মিরপুর ১০ নম্বরে। চালকরা কোনো আইনের তোয়াক্কা করছেন না। উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার দ্রুত গতিতে যান চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন।

গত ১৫ মে ঢাকায় বিআরটিএ ভবনে একটি অনুষ্ঠানে সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন ঢাকায় কোনো ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারবে না। এই ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। এতে নগরবাসী খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু চালকরা বন্ধের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। তারা ঢাকায় রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ চালান। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ২১ মে সরকার ঘোষণা দেয় এসব যানবাহন চলাচল করবে। তারপর থেকে ব্যাটারিচালিত যানবাহন রাস্তায় চলাচলে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা আগে পুলিশের ভয়ে অলিগলিতে চলাচল করত। কিন্তু এখন পুলিশের সামনেই তারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। ঢাকার বিভিন্নস্থানে সরেজমিনেও দেখা গেছে এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল। রাস্তায় প্যাডেল রিকশার চেয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা সংখ্যা বেড়ে গেছে বহুগুণ।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে কিছু দিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশকেও এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তবে ঢাকাসহ সবকটি মেট্রোপলিটন এলাকায় এসব যানবাহন বন্ধ না করতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে মৌখিক নির্দেশনা এসেছে। এতে বিপাকে পড়েছি আমরা। কারণ চালকরা বেপরোয়াভাবে রাস্তায় চলাচল করছে। তারা মূল সড়কে চলে এসেছে। পুলিশের সামনেই এসব অপকর্ম করার সাহস দেখাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তাদের উৎপাতের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। রিকশার সংখ্যা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। সরকারের উচিত নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এসব যানবাহন চলাচল করতে না দেওয়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের সবকটি মহাসড়কে দেদার অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। যানবাহনগুলোর বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে যতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগই ঘটেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, টমটম, নছিমন বা ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে। এসব যানবাহন রাস্তা থেকে উঠিয়ে দিতে নানা উদ্যোগ নিলেও একটি প্রভাবশালী মহলের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি শাহাবুদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশের কোনো সদস্য এসব যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টাকা আদায় করার প্রমাণ মিললে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সারা দেশে বিভিন্ন রুটে অটোরিকশা-ইজিবাইক চলছে অন্তত ২০ লাখের মতো। এতে লাগে না কোনো প্রকার লাইসেন্স বা রুট পারমিট। অবৈধ অটোরিকশা-ইজিবাইকের মালিক বা গ্যারেজ মালিকরা অটোরিকশা চালাতে দেন অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য, অদক্ষ কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক, উঠতি বয়সী ছেলেদের। অনেক ক্ষেত্রেই এরা কানে হেডফোন লাগিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে থাকে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করাতে বিভিন্ন এলাকা বা মহল্লায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এমন ঘটনায় কেউ প্রতিবাদ করলেই অশ্লীল আচরণও করতে দেখা যায় প্রায়ই। বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ইজিবাইকচালক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা কখনো পথচারী, কখনো প্রাইভেট কার, আবার কখনো মোটরসাইকেলের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব অটোরিকশা-ইজিবাইককে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ গ্যারেজ ও অনুমোদনহীন ব্যাটারি চার্জার কেন্দ্র। এতে বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে দেদার।

ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় সমস্যা। এসব যান হুটহাট সড়কে চলে আসছে। সঙ্গে আছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য। আমরা তাদের নিয়ে বেকায়দায় আছি। ঢাকার প্রতিটি এলাকায় হাজার হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। গলিপথ ছেড়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব রিকশা। অনিয়ন্ত্রিত এই বাহনের কারণে পাড়া-মহল্লায় লেগে থাকে যানজট। এসব যানবাহন একেবারেই অনিরাপদ।

তবে রিকশা মালিকদের অভিযোগ, প্রতি মাসে গড়ে ২০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের। পুলিশকেও দিতে হচ্ছে নিয়মিত। সবমিলিয়ে লোকজন জিম্মি হয়ে আছে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কাছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত