বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিশেষজ্ঞদের ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা রাজনীতিবিদদের, আমলাদের

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৪, ১২:৫৫ এএম

পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত। সম্প্রতি সিলেটসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি শহরে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কথা উঠেছে হাওর অঞ্চলে ‘অল ওয়েদার সড়কের’ ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ঘন ঘন বন্যা দেখা দিচ্ছে। এসব বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সিলেটের সাম্প্রতিক বন্যার কারণ হিসেবে একদিকে বলা হচ্ছে অতিবৃষ্টি, অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন ভারতে বাঁধ খুলে দেওয়াতে পানি নেমে এসেছে। আপনার মন্তব্য কী? 

আইনুন নিশাত : অতিবৃষ্টি তো ভারত ঘটায়নি, এটা তো প্রাকৃতিক। তাহলে এটাতে অবাক হচ্ছেন কেন?

দেশ রূপান্তর : সিলেটে খুব ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। এমন একটা আলাপ চলছে যে, আমাদের হাওর অঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়নের একটা প্রভাব পড়ছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আইনুন নিশাত : এখনে আসলে কথা বলা তো বিপদ! কারণ যারা হাওর অঞ্চলের রাস্তাটার দোষ দিচ্ছেন, বলছেন, রাস্তাটা ভুল, রাস্তাটা করা উচিত হয়নি। অত্যন্ত ক্ষমতাসীন কিছু লোক হয়তো এই সড়কটি করেছেন। কিন্তু এটার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বকাঝকা করছেন সবাইকে এবং ওই ধরনের আরও কিছু রাস্তার পরিকল্পনা নিয়ে একনেকে গিয়েছিল রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে। প্রধানমন্ত্রী সেগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। এখন সেতু কর্র্তৃপক্ষ সেখানে রাস্তার চিন্তাভাবনা করছে, যেটা ডিজাইন স্টেজে আছে। কিন্তু আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আমার বক্তব্য হচ্ছে, ওই রাস্তাটা তো কিশোরগঞ্জে, আর বন্যা হচ্ছে সিলেটে। তো কিশোরগঞ্জের সঙ্গে সিলেটের এই বন্যার সম্পর্ক কী!

দেশ রূপান্তর : এ রকম শোনা যাচ্ছে যে, সিলেট অঞ্চল থেকে পানি বের হয়ে যাওয়ার গতিপথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে কিশোরগঞ্জের সড়কটি। এ রকম কোনো ব্যাপার আছে কি না?

আইনুন নিশাত : শুনেছি এ বিষয়ে, অনেকেই এ ধরনের প্রশ্ন করছে। দেখেন প্রথমত হচ্ছে, এটা আষাঢ় মাসের প্রথম দিক। এই সময়ে বৃষ্টি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। মেঘালয়ে বৃষ্টি হচ্ছে এবং সিলেটের যে চারটা জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এর মাঝামাঝি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এখন বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবে নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকে, যদি স্বাভাবিক বছর হয়। কিন্তু গত বছর ছিল না, কারণ গত বছর স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়নি। এই বছর যেহেতু স্বাভাবিকভাবে নদীগুলো কানায় কানায় ভর্তি আছে, সেই সময়ে মেঘালয় থেকে বৃষ্টি হলেই সেটা নেমে আসছে আমাদের এদিকে। এটা তো প্রাকৃতিক ব্যাপার, এর মধ্যে কাউকে দোষারোপের কোনো ব্যাপার নেই। এখন আপনারা যে রাস্তার কথা বলছেন, অষ্টগ্রাম হয়ে আল্টিমেটলি কিশোরগঞ্জের মধ্যেই এটা। অন্যদিকে সিলেটের সুরমার প্রবাহ মূলত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে আসে। তারপর সেটা কুশিয়ারার সঙ্গে মিশে দক্ষিণ দিকে যায়। এখন এই প্রবাহটা নিশ্চয়ই ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু এটার সঙ্গে সুনামগঞ্জ কিংবা সিলেটের বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই। এ রকমটা যদি হয়ও, তাহলে সেটা হতেও সময় লাগবে, সেটা রাতারাতি হবে না।

দেশ রূপান্তর : বৃষ্টির আচরণের কথা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এই বন্যার সঙ্গে ভারতের কোনো বাঁধ খুলে দেওয়ার কারণ আছে? অনেক মিডিয়াই এমন বলছে যে, ভারতের দিকে ব্যারেজ খুলে দিয়েছে।

আইনুন নিশাত : না, এই বন্যার সঙ্গে এমন কিছু নেই। মেঘালয়েও তেমন বাঁধ নেই। মেঘালয়ে একটা জলাধার আছে, শিলংয়ের কাছে, কিন্তু সেটা বন্যার কারণ না। আসামে তেমন কোনো জলাধার নেই। প্রত্যেকটা নদীর একটা অববাহিকা আছে, তাই না? কাজেই বৃষ্টি হচ্ছে আসামে, তার মানে ব্রহ্মপুত্রতে। এবং আপনি যদি সিরাজগঞ্জে খোঁজ নেন কিংবা এখন বন্যার পূর্বাভাস যা দেখাচ্ছে, এটা বিপদসীমা ছুঁইছুঁই হবে সিরাজগঞ্জে। কারণ আমরা কথা বলছি ২০ তারিখে, আজও সেখানে পানিপ্রবাহ বিপদসীমার নিচে আছে। আপনি যদি ছাতকে ঢোকেন, সুনামগঞ্জে ঢোকেন তাহলে সুনামগঞ্জে দেখবেন গোলাপি রঙ ওই ফোরকাস্টিং সাইটে। এখানে সবুজ মানে নরমাল, হলুদ মানে ওয়ার্নিং, গোলাপি মানে বিপদসীমার ওপরে আর লাল মানে মহাবিপদ। আপনি বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া ওয়েবসাইটে ঢুকলেই দেখতে পাবেন যে, বিভিন্ন রঙ দিয়ে ফোরকাস্ট করা আছে। আমি এখন আপনার সামনে সুনামগঞ্জ খুললাম। তাতে দেখা যাচ্ছে যে বিপদসীমার ওপরে পানি আছে এবং ২০ তারিখ পর্যন্ত বিপদসীমার ওপরেই থাকবে। দেখা যাচ্ছে সেখানে আরও কয়েকদিন পানি থাকবে। তো আমি বলতে চাচ্ছি এই সময়ে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সিলেট অঞ্চলে, মেঘনা নদী, সুরমা নদী, কুশিয়ারার অববাহিকাতে এই পানিটা খুবই স্বাভাবিক।

দেশ রূপান্তর : অতিবৃষ্টি হোক, বাঁধ খুলে দেওয়া হোক, কিংবা স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক কারণেই পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে হোক ঘটনা হচ্ছে বন্যায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। করণীয় কী?

আইনুন নিশাত : দুটো কাজ করতে পারি। একটা হচ্ছে ওয়ার্নিং সিস্টেম বা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। আমার উত্তর হচ্ছে ওয়ার্নিং সিস্টেম ভালো আছে। আর এটাতে অস্বাভাবিক কিছুও দেখছি না আমি। সুরমা নদী এর আগেও বহুবার জুন মাসের ৮/১০ তারিখে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং এই অবস্থাটা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই পানি উঠবে। এখন দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে পানি যাতে ভেতরে না ঢোকে তার ব্যবস্থা করা। তার সলিউশন হচ্ছে বাঁধ তৈরি করা। এখন আনফরচুনেটলি আমার জানা মতে সিলেট শহর এবং সুনামগঞ্জ শহরে শহররক্ষা বাঁধ নেই। কাজেই নেই বলে এই কাহিনি, এই ঘটনা ঘটে। নদী কানায় কানায় পূর্ণ হলে শহর ডুবে যাবেই। সেটার সূত্র ধরেই আপনাকে বলছি একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে আর দশ দিনের মধ্যে পানি বিপদসীমার ওপরে উঠতে পারে। এখন সিরাজগঞ্জে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ আছে, আছে বলে বাঁধটা যতক্ষণ টিকে থাকবে ততক্ষণ তারা নিরাপদ। আর এদিকে রাস্তাটাকে যে দোষ দেওয়া হচ্ছে সেই রাস্তার প্রভাব পড়তে পড়তে ৮/১০ বছর লাগবে। এটা পূর্ব থেকে পশ্চিমে পানিপ্রবাহটা আটকে দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ভুল, এই রাস্তা নির্মাণ করা উচিত হয়নি। যে কারণেই হোক এটা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই জিনিসটা ভালো বোঝেন, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এখানে পানির প্রবাহের আড়াআড়ি আর কোনো বাঁধ কিংবা রাস্তা নির্মাণ হবে না।

দেশ রূপান্তর : যে রাস্তা হয়ে গেছে, আপনি জানালেন যার জন্য প্রধানমন্ত্রীও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এখন তাহলে এটার সলিউশন কী?

আইনুন নিশাত : ভাঙতে হবে। পুরো রাস্তাটার কথা বলতে পারছি না। তবে হিসাব-নিকাশ করে অনেক জায়গায় সেটা ভাঙতে হবে, যাতে পানির প্রবাহ বন্ধ না হয়।

দেশ রূপান্তর : রাস্তাটা তো অনেক বড়। যারা এর নকশা করেছেন, পরিকল্পনা করেছেন তারা কি পানিপ্রবাহের বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছেন মনে করেন? নাকি তারা ঠিকই বিষয়টির সমাধান রেখেছিলেন কিন্তু সেটা মানা হয়নি?

আইনুন নিশাত : আমিও তো ইঞ্জিনিয়ার। এখানে সিদ্ধান্ত নেয় তো আমলারা এবং রাজনীতিবিদরা, ইঞ্জিনিয়াররা তো সিদ্ধান্ত নেয় না। এটাকে আর ব্যাখ্যা করতে বলবেন না। তাছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে যে রাস্তাটার কথা আপনি বলছেন, সেটার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক ছিলেন রাষ্ট্রের এক নম্বর পজিশনে থাকা ব্যক্তি। তিনি ও তারা যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে। তারা বলেছেন কিচ্ছু হবে না, গত বছরও শুনেছি তারা বলছেন যে, পানি আটকায়নি। এখন পানি কি আটকেছে? আপনি যদি আজ ওই রাস্তা ধরে মাঝামাঝি জায়গায় যান, যেখানে ছোট সেতু আছে, দেখবেন পানি ভীষণ বেগে বের হচ্ছে। দুই সেতুর মাঝে যদি দাঁড়ান দেখবেন ডান তীরের পানি বাম তীরের তুলনায় প্রায় ৪/৫ ফুট উঁচু। মানে পানি বের হতে না পেরে সেখানে জমে আছে। এটার প্রভাব দেখা যাবে ১০/১৫ বছর পরে, দেখা যাবে ওখানকার পানি প্রবাহ হচ্ছে না। কাজেই উত্তরটা হচ্ছে এটার জন্য দায়ী সবচেয়ে বেশি হচ্ছে পরিবেশ বিভাগ। কারণ আমাদের আইন অনুযায়ী প্রত্যেকটা রাস্তা হচ্ছে রেড ক্যাটাগরি অর্থাৎ এটা করার আগে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে এটা দেখতে হবে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে এটা সার্টিফাই করতে হবে। কাজেই যিনি সচিব ছিলেন বা ডিজি ছিলেন, এখানে আমলাকে দোষ দিচ্ছি না, তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ধমকে সই করে দিয়েছেন। দেখেন বর্ষাকালে হাওর অঞ্চলে প্রচুর লঞ্চ চলে, নৌকা চলে। তো আপনি তো এই রাস্তা দিয়ে মুভমেন্ট বন্ধ করে দিলেন। ব্রিজ কিছু হয়তো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর যে উচ্চতা, সেখান দিয়ে লঞ্চ চলাচল করতে পারবে না। আমরা যদি সভ্য দেশ হতাম তাহলে এ রকম হতো না। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আমি অসভ্য বলি। কারণ তাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা; দুই ধমক দিয়ে বলবে আমি বলছি এটা হবে না। আমি নিজেও এই ধরনের প্রবলেম ফেস করেছি।

দেশ রূপান্তর : এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন আপনারা প্রফেশনাল ভাবে হন। আসলে এটার সলিউশনটা কী আসলে?

আইনুন নিশাত : আমাদের দেশের আইন রয়েছে কিন্তু এটা তো সেভাবে মানা হয় না।

সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা হচ্ছে রাজনীতিবিদদের। তারাই তো আইন বানান, ১৯৯৫ এর আইন,  ৯৭ এর রেগুলেশন, ২০১২-তে অ্যামেন্ডমেন্ট আর রুলস রেগুলেশনেও সম্প্রতি আরও ইম্প্র“ভ করেছে। এখন সরকার যদি সরকারের আইন না মানে তাহলে বিশেষজ্ঞরা কী করবেন? বিশেষজ্ঞদের তো ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা তো রাজনীতিবিদদের, আমলাদের, সচিবদের।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

আইনুন নিশাত : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত