মুমূর্ষু বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা ও জি৭

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪, ১২:৩৭ এএম

এটা ভালো দিক যে, এখন আর আমরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন একপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থায় নেই। কিন্তু যেহেতু ক্ষমতা এখন বিশ্বের অন্যপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে সেক্ষেত্রে সর্বজনীন মঙ্গল নিশ্চিতকরণে পারস্পরিক সহযোগিতার আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা দুঃখজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও এক অর্থে এখনো এই ধারণা টিকে আছে। যেখানে বিশ্বের পাশ্চাত্য, প্রাচ্য, উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলো কোনো বড় সংকট মোকাবিলায় সময় সময় নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট কেনিয়ার নেতৃত্বে হাইতিতে মিশন পরিচালনার কথা যেখানে শিগগিরই হাইতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সেখানকার পুলিশকে সহযোগিতা করা হবে।

তবে আরও ব্যাপকতর পর্যায়ে যেখানে আমাদের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরি ও শক্তিশালীকরণ, সেই ধরনের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। জি৭-ভুক্ত উন্নততর গণতান্ত্রিক দেশগুলো, প্রতি বছর একবার করে একত্র হয় এবং বিশ্ব পরিচালন নীতি সমন্বয়ে ভূমিকা পালন করে যা মূলত পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিনিধিত্ব করে। এরা এখনো ক্ষমতাশালী, যদিও বিশ্ব অর্থনীতি ও জনমিতিতে অংশীদারত্ব ক্রমহ্রাসমান। এখন ভবিষ্যতের কথা ভেবে জি৭-এর নেতারা একে সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করতে চাচ্ছেন। অল্প সময়ের জন্য হলেও তাদের এই উদ্যোগ সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জি৭ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইতালির বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র বরগো এগনাজিয়া ইন পুগলিয়ায় এবং এটাকে মনে হয়েছে শেষ সম্মিলন।

ইতিমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে বৈশ্বিক বিভক্তি বাড়ছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমাদের সঙ্গে চীনের উত্তেজনার পারদ চড়ছে, আমেরিকা ও ইউরোপ উভয়ই অনৈতিক বাণিজ্যিক চর্চার সূত্র ধরেই বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত কর চাপাচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সৌদির সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের যেকোনো সম্ভাবনাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য শিকেয় তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে (পশ্চিমাদের) দ্বৈতনীতি ও ইসরায়েল কর্র্তৃক আন্তর্জাতিক আইনের জঘন্য লঙ্ঘনকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে পশ্চিমা কপটতা উন্মোচিত হয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তর দেশগুলোর চরম ডানপন্থি দলগুলোর উত্থান ঘটছে যা উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে কালোমেঘে আবৃত্ত করছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পটভূমিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব অব্যাহত আছে। যদি ফ্রান্স ও আমেরিকায় জনতুষ্টিবাদী রক্ষণশীল শক্তি ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ক্লাব থেকে দৃশ্যমান কোনো অবদান দেখতে পাওয়া কঠিন হতে পারে। 

এখন এই ভীতিকর মুহূর্তে, জি৭ জোট হতাশাজনকভাবে দুর্বল হিসেবে ধরা দিয়েছে, এর মধ্যে ইতালিতে যারা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল ছিল ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন চরম রক্ষণশীল সরকার। সম্মেলনে ওলাফ শলজ-এর জন্মদিন উদযাপনে ও আয়োজক মেলোনির উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ক্যামেরার সামনের ঐক্যবদ্ধ ছবি দেখা গেলেও আদতে নেতারা তাদের বিভক্তি লুকাতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় গর্ভপাত ও এলজিবিটিকিউআই জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কিত আলোচনা নিয়ে তাদের মধ্যে টানাপড়েন।

বৃহৎ সাতটি শক্তির মধ্যে এই বিভক্তি আরও বাড়ার হুমকির মুখে আছে। ফ্রান্সে সংসদ নির্বাচনে যদি অতি ডানপন্থিদের ক্ষমতায় বসার পথ খুলে যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফিরে আসেন তাহলে জি৭ থেকে কী পাওয়া যাবে তা বিবেচনা করা খুবই কষ্টসাধ্য। সেই পরিস্থিতিতে উদারপন্থি ও রক্ষণশীল সরকারগুলোর মধ্যকার তাদের মূলনীতি-কেন্দ্রিক বিভক্তি আরও বাড়বে।

২০২১ সালে জো বাইডেন যখন ক্ষমতায় আসেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমলের ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আটলান্টিক অঞ্চলীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ধারার ওপর নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় তখন জি৭ জোট ছিল সেই আশার কেন্দ্রবিন্দু। আশা করা হচ্ছিল এর মাধ্যমে প্রধান প্রধান বৈশ্বিক বিষয়সমূহ যেমন জলবায়ু, অর্থনীতি ও মহামারী নিয়ে সমমনা দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এবং তা অন্য পক্ষগুলোর মধ্যে সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে দৃঢ় করবে। সেই পদ্ধতি কাজে লেগেছে বলে মনে করা হচ্ছে: এক্ষেত্রে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনা বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর করারোপের মতো বিষয়গুলোকে উল্লেখ করা যায়। এই বিষয়সম্পর্কিত ঐকমত্য প্রথমে জি৭-এর মধ্যে গ্রহণ করা হয়, পরবর্তী সময়ে জি২০-এর মধ্যে সম্প্রসারণ করা হয় এবং শেষে বৃহত্তর পরিসরে বহুপক্ষীয় গোষ্ঠীগুলোর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যেমন কর আরোপের ক্ষেত্রে ওইসিডি, বা জলবায়ুর ক্ষেত্রে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

২০২২ সালে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার সরাসরি হামলা এই পদ্ধতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তথাপি এখন পর্যন্ত জি৭ বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সম্প্রসারণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছে। ওই বছর পশ্চিমারা রাশিয়ার আক্রমণকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে অবশেষে দক্ষিণের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে, এই দেশগুলো মস্কোর বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা অনুসারণে ও কিয়েভকে সমর্থন করতে অনিচ্ছুক ছিল। সেই জায়গা থেকে, জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০২২ সালে জি৭ সম্মেলনে অন্যদের সঙ্গে আর্জেন্টিনা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকার নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তবে ২০২৩ সালের মধ্যে সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল হয়ে ওঠে। এই সময়ে দক্ষিণের দেশগুলো কোনো পক্ষভুক্ত না হওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন ছিল। তথাপি এই যুদ্ধ পূর্ব ও পশ্চিমের সংঘাতের বিপরীতে রাশিয়া ও চীনকে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ করেছে। মস্কোর প্রতি বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থন বৃদ্ধি করেছে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের ইউক্রেনের পালটা আক্রমণের পর থেকে। অধিকন্তু ইউরোপে যুদ্ধ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংকটের যোগসূত্র ক্রমান্বয়ে বেশি আলোচনায় আসছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, জি৭ এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে। যেমনটা ব্রিকস্ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা) অন্য দেশগুলোকে এই পশ্চিমাবিরোধী জোটে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ২০২৩ সালের জাপানের জি৭ প্রেসিডেন্সিতে জি৭ প্লাস ধারণার সূচনা হয়েছিল; যেখানে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়ান রিপাবলিক ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার প্রধান প্রধান গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ইতালির পুগলিয়া সম্মেলনের দুর্বল ফলাফল বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা যে হুমকির সম্মুখীন যেন তার একটা প্রতিফলন। এখানে নেতারা শুধু একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যার মাধ্যমে রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদের আয় থেকে ইউক্রেনকে দেওয়া ৫০ বিলিয়ন ডলার লোনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি হিসেবে ব্যবহারে ঐকমত্য হয়। এই চুক্তিতে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। এমন একটা সময়ে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয় যখন চুক্তি ছাড়াই দ্রুত সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল এমন ভীতি কাজ করছিল।

অন্যদিকে ইউক্রেনের বাইরে, তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাজা যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের পরিকল্পনায় নেতারা শুধু মুখের কথা বলেই ক্ষান্ত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করছে কিন্তু তা বাস্তবায়নে খুব ধীরগতি মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণের দেশগুলোর কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একটি ক্ষত তৈরি করেছে। পাশাপাশি সম্মেলনে এমন কোনো সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা হয়নি, যেখানে আমন্ত্রিত বাইরের দেশগুলো যেখানে রয়েছে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র গণতান্ত্রিক শক্তির দেশগুলো বিবেচনায় এসেছে। যেমন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইন্ডিয়া, কেনিয়া এবং তুরস্ক অন্যদিকে কর্র্তৃত্ববাদী দেশগুলো যেমন আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। সত্যি যে, এই জোট ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। জি৭ অনিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন প্রতিরোধে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। যদি এটি একটি প্ল্যাটফর্ম হয় যার মাধ্যমে পশ্চিমের সঙ্গে দক্ষিণের দেশগুলোর যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, সেক্ষেত্রে তাকে আরও খাড়া পথ পাড়ি দিতে হবে।

জি৭ সম্পর্কে ধারণা নিজে নির্ধারিত হয় না। কিন্তু এর ওপর যা আরোপ করা হয়, তা আদতে এর ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করছে। যদিও তা সরাসরি পশ্চিমা উদারতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি হুমকি নাও হয়।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধ ভাষান্তর করেছেন নাজমুল আহসান, উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

লেখক: গার্ডিয়ান ইউরোপ-এর কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত