এবারের হজ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। শেষ হয়নি মৃত্যু নিয়ে আলোচনা। এবার হজে এত মৃত্যু কেন? এ প্রশ্ন সবার মুখে মুখে ঘুরছে। মৃতের সংখ্যা তেরোশ ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে মিসর থেকে আসা হজযাত্রীদের, তাদের ৬৫৮ জন, ইন্দোনেশিয়ার ২১৫ জন, ভারতের ৯৮ জন এবং বাংলাদেশের ৪৪ জন হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, জর্দান, ইরান, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, সুদান ও ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চল তাদের একাধিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। অনেকেই এ মৃত্যুর জন্য উত্তপ্ত আবহাওয়াকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ সৌদি সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দোষছেন। সৌদি সরকার বলছে, অনুমোদন ছাড়া হজ করতে আসাই এত মৃত্যুর কারণ। এ ছাড়াও বিবিসি, সিএনএন ও এএফপির একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এত অধিক সংখ্যক মৃত্যুর বেশ কিছু কারণ।
তপ্ত আবহাওয়া : এ বছর হজের দিনগুলোতে সৌদি আরবের তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি। সৌদির আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী তাপমাত্রা ৪৬ থেকে ৫৯ ডিগ্রির মধ্যে ছিল। আর বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী তাপমাত্রা ছিল ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। উত্তপ্ত আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিকেই এত অধিক মৃত্যুর বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উচ্চতাপ ও পানিশূন্যতা এড়াতে বিভিন্ন সতর্কতা জারি করলেও অনেক হজযাত্রী অসহনীয় গরমে হিটস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন। এএফপির বরাত দিয়ে একজন আরব কূটনীতিক জানিয়েছেন, মিসরের ৬৫৮ জন হজযাত্রীর প্রায় সবাই অসহনীয় তাপের কারণে মারা গেছে। তাদের অনেকেরই যথাযথ হজ পারমিট ছিল না, যার ফলে তাদের ক্ষেত্রে হাজিদের জন্য নির্ধারিত সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি ছিল। নাইজেরিয়ান হাজি আইশা ইদ্রিস বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের নিউজকে বলেন, ‘কাবার সব দরজা বন্ধ থাকায় আমাদের ছাদ ব্যবহার করতে হয়েছিল, স্থানটি প্রচণ্ড তাপে যেন জ¦লছিল। শুধু আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে গেছি। আমাকে ছাতা ব্যবহার করতে হয়েছিল এবং ক্রমাগত জমজম পানি দিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে রাখতে হয়েছিল। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল আমি অজ্ঞান হয়ে যাব, তখন আমাকে ছাতা দিয়ে একজনের সাহায্য করতে হয়েছিল। আমি ভাবিনি যে তাপ এত তীব্র হবে।’
অতিরিক্ত ভিড় : একাধিক সূত্রে জানা যায়, সৌদি কর্র্তৃপক্ষের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনায় স্বাভাবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যার ফলে হজযাত্রীদের জন্য নির্ধারিত অনেক এলাকায় বিভিন্ন সংকট দেখা গেছে। থাকার জায়গার ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল না, তাঁবুগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় এবং পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত সুবিধার ঘাটতি ছিল। আরও জানা যায়, মক্কার তাঁবুগুলোতে কোনো এয়ারকন্ডিশনার ছিল না। তাঁবুতে যেসব কুলার বসানো হয়েছিল তাতেও বেশিরভাগ সময় পানি ছিল না। ফলে এসব তাঁবুতে হজযাত্রীরা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তাঁবুতে অতিরিক্ত ভিড় ও তাপের কারণে অনেকে অজ্ঞানও হয়ে যান।
পরিবহন সমস্যা : তীব্র গরমের মধ্যে হাজিদের প্রায় সময় দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়েছে। কেউ কেউ এ জন্য বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা আটকে দেওয়া এবং খারাপ পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। একজন হজযাত্রীকে দিনে কমপক্ষে ১৫ কিলোমিটার হাঁটতে হতে পারে। এতে তাদের হিটস্ট্রোক, ক্লান্তি এবং পানির সংকটে ভোগার ঝুঁকি রয়েছে। আগের বছরগুলোতে তাঁবুতে প্রবেশের জন্য ইউ-টার্নগুলো খোলা ছিল। কিন্তু এবার সেসব রুট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন সাধারণ হজযাত্রী এক নম্বর জোনের এ ক্যাটাগরি তাঁবুতে থাকলেও তাকে তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছাতেই গরমের মধ্যে অন্তত আড়াই কিলোমিটার হাঁটতে হয়। যদি এই রুটে কোনো জরুরি পরিস্থিতিও ঘটে, তাহলে ৩০ মিনিটের মধ্যে কেউ কাছে পৌঁছাবে না। এক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি পথে পানির পয়েন্টও নেই।
চিকিৎসাসেবায় বিলম্ব : অনেক হজযাত্রীই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাননি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। যারা তীব্র গরমে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন তাদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স বা প্রাথমিক চিকিৎসা সহজে পাওয়ার উপায় ছিল না। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে কারও অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও অ্যাম্বুলেন্স আসতে ২৫ মিনিটেরও বেশি সময় লাগে। সৌদির সরকারি এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা ৬৫০০ শয্যার সক্ষমতাসম্পন্ন ১৮৯টি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মোবাইল ক্লিনিক চিকিৎসাসেবায় যুক্ত করেছে এবং ৪০ হাজারের বেশি চিকিৎসা, প্রযুক্তি, প্রশাসনিক বিষয়ক কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছে। সেখানে ৩৭০টির বেশি অ্যাম্বুলেন্স, সাতটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, শক্তিশালী লজিস্টিক নেটওয়ার্কসম্পন্ন ১২টি ল্যাবরেটরি এবং ৬০টি সরবরাহ ট্রাকের ব্যবস্থা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ব্রিফিংয়ে সৌদির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফাহাদ আল জালাজেল বলেন, ‘হজের সময় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোতে প্রায় ৫ লাখ হজযাত্রীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হজযাত্রীর হজ করার অনুমোদন ছিল না।’
অনুমোদন ছাড়া হজ : হজ সম্পাদন করার জন্য হজযাত্রীকে একটি বিশেষ হজ ভিসার আবেদন করতে হয়। কিন্তু কিছু ব্যক্তি সঠিক কাগজপত্র ছাড়াই হজে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যারা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া হজ করেন তারা কর্র্তৃপক্ষকে এড়িয়ে চলেন, এমনকি নানা অসুবিধায় সাহায্যের প্রয়োজন হলেও। কেননা কর্র্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়লে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিছু তাঁবুতে ভিড়ের জন্য কর্র্তৃপক্ষ তাদের দায়ী করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির সূত্রে জানা যায়, এবার হজ মৌসুমে ৬৫৮ জন মিসরীয় মারা গেছেন, যার মধ্যে ৬৩০ জনের হজ পারমিট ছিল না।
অধিক বয়স : অনেক মানুষ জীবনের শেষের দিকে হজে যান। অথচ হজ পালনের জন্য শারীরিক যে সক্ষমতা প্রয়োজন তা শেষ বয়সে খুব বেশি থাকে না। হজের অন্যতম শর্ত হলো শারীরিকভাবে সক্ষমতা থাকা। তবুও অনেকে আশা করেন যে, মৃত্যু হলে যেন হজে গিয়ে মক্কা-মদিনাতেই হয়। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের মুসলমানরাও হজ পালনের সময় মারা যাওয়াকে সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করেন। কেননা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেউ হজের সফরে বের হয়ে মারা গেলে সে কেয়ামত পর্যন্ত হজের সওয়াব পেতে থাকবে।’ এ ছাড়াও হজ পালনের সময় মারা যাওয়াকে সৌভাগ্যের বিষয় মনে করার আরেকটি কারণ হলো, হজের সফরে মক্কায় মৃত্যুবরণকারীদের সাধারণত পবিত্র কাবার নিকটস্থ জান্নাতুল মুয়াল্লাতে এবং মদিনায় মৃত্যুবরণকারীদের মসজিদে নববি সংলগ্ন জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। এ দুটি কবরস্থানে দাফন হওয়া মুসলমান অনেক সৌভাগ্যবান। কারণ এখানে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী-সন্তানসহ অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম শায়িত আছেন। অনেকেই অধিক বয়সে হজে যাওয়াকে এত সংখ্যক মৃত্যুর কারণ সাব্যস্ত করছেন। বয়স্করা হজে যাওয়ায় প্রতি বছরই বার্ধক্যজনিত কারণে বাংলাদেশি হাজিদের মৃত্যু হয়। এ বছর হজে গিয়ে ৪৪ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্বই ৪০ জন। আর পঞ্চাশের নিচে চারজন। এই সমীকরণ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট যে, বয়সের ভারই বাংলাদেশি হজযাত্রীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশি হজযাত্রীদের মৃত্যুর জন্য কেউ কেউ আরেকটি বিষয়কে দোষছেন। তা হলো, বাংলাদেশি হজযাত্রীদের সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করার লক্ষ্যে চলতি বছর ৪৫৩ জন ব্যক্তি সরকারি খরচে হজে গেছেন। এর মধ্যে সমন্বিত হজ চিকিৎসা দলে আছেন ২৮৯ জন। এ জন্য সরকারের ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সময়ে এই বিশাল বহরের কারও দেখা মেলেনি বলে অভিযোগ করেছেন হাজিরা। ২১৫ জন ইন্দোনেশীয় হজযাত্রী এ বছর হজে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী হজে মারা যাওয়া ২১৫ জনের অধিকাংশের বয়স পঞ্চাশের ওপরে। সিএনএন সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ান নারী হেরু জুমারতিয়ার সাক্ষৎকার নেয়। সাক্ষাৎকারে হেরু জুমারতিয়া বলেন, ‘আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে হজ করতে এসেছি। আমার বাবার বয়স ৮৬ বছর। গত ১৭ জুন দুপুরে তিনি মারা যান। আমরা সবাই খুশি যে, তাকে মক্কায় সমাহিত করা হয়েছে। এটা খুব সৌভাগ্যের বিষয়।’ নাইমা নামে একজন হাজি হিটস্ট্রোকে মারা যান। তার ছেলে বিবিসি নিউজ আরবিকে বলেন, ‘আমার মায়ের সঙ্গে হঠাৎ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক খোঁজার পর জানতে পারি, তিনি হজের সময় মারা গেছেন। আমার মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে মক্কাতেই দাফন করা হবে।’ সৌদি সরকার বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে আগত হজযাত্রীদের সম্ভাব্য সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। বছরের পর বছর ধরে সৌদি সরকার হজ মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী বছর কীভাবে আরও উন্নত সেবা দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা নেয়।
এবারও হজ শেষ হওয়ার পরপর মক্কায় হজ মন্ত্রণালয় ১৪ জিলহজ মূল্যায়ন সভার আয়োজন করে। ওই সভায় ওঠে আসে, মাত্রাতিরিক্ত গরমের সময় হাজিদের চলাচলের বিষয়টি। এ কারণে প্রচুর হজযাত্রী অসুস্থ হয়ে যান। এ ছাড়া হজের সময় মারা যাওয়া অর্ধেকের বেশি (প্রায় ৮০%) মানুষ নিবন্ধন ছাড়াই হজ করতে এসেছেন। তারা যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াই এ দেশে এসেছেন। ফলে তারা তাঁবু বা বাসাসহ অন্যান্য জায়গায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা পাননি। সৌদি সরকারের মতে, এ দুটি বিষয় হজযাত্রীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট
