ভারি সুন্দর এক বন। সবুজ গাছগাছালিতে ভরা। কত ধরনের যে পশুপাখি থাকে এ বনে! সুঠাম দেহের সিংহ, লম্বা শিংঅলা হরিণ, বাঘমামা, পন্ডিত শেয়াল আরও কত পশু!
পাখিদের মধ্যে রয়েছে দোয়েল, শালিক, কোকিল, টিয়ে আরও নাম না জানা কত পাখি!
এ বনের গর্তেও থাকে ছোট-বড় নানান প্রাণী। যেমন পিপীলিকা, সাপ, ইঁদুর, উইপোকা ইত্যাদি।
আরও আছে বাহারি ফুলের মেলা। হলুদ গাদা, রক্ত গাদা, কমলা গাদা, মিষ্টি গোলাপ ও সন্ধ্যামালতি।
এই যাহ্, ভুলেই গেছি! এ বনে আরও একজন থাকে। আর সে হলো ছোট্ট একটা ছানা চড়ুই। চিনলে না বুঝি! ওই যে সবার মন জয় করতে পারত নিমিষেই যে ছানাটি! ওর নামই তো চড়ুই। সে-ই তো মাতিয়ে রাখত পুরো বন। সবসময়
থাকত হাসিখুশি। ওর সামনে কেউ মন খারাপ করে থাকতেই পারত না। কারও মন খারাপ হলে ঠিকই তার মন ভালো করত। বনের সবার খোঁজখবরও নিত সে। কেউ অসুস্থ হলো কিনা সে ব্যাপারে খুব খেয়াল রাখত।
ওই তো সেদিন এক শালিকছানা জ¦রে মরে যাচ্ছিল যাচ্ছিল অবস্থা। তাকেও সুস্থ করে তুলেছিল এই ছোট্ট চড়ুইছানাটিই। সবাই ওকে ভালোবাসে খুব। ঠিক যেমন ও সবাইকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন আর চড়ুইছানাটি আগের মতো হাসিখুশি থাকে না। কথা বলে না মুখ ফুটে। সবসময় মন খারাপ করে থাকে। কখনো আবার কাঁদেও। সেদিন এক কোকিল এসেছিল চড়ুইর কাছে। একটুখানি কথা বলবে বলে কত উড়ল ওর আশপাশে! কিন্তু চড়ুই? একটুখানি সাড়াও দিল না। মিষ্টি কোকিলের দিকে চেয়েও দেখল না ওকে।
হঠাৎ করেই কেন বদলে গেল চড়ুইছানাটা? তবে কেন সে অমন মন খারাপ করে থাকে সবসময়? হাসে না মন খুলে? কথা বলে না মুখ ফুটে? কেনইবা থাকবে না সে অমন মন খারাপ করে? এই তো গত সপ্তাহে শনিবার দিন। ওই দিনটা তো পাল্টে দিল ওকে। সেদিন বিকেলে ওর মা যখন খাবার খুঁজে নিয়ে বাসায় ফিরছিল তখনই তো ঘটল দুর্ঘটনাটি। কয়েকটি হিংস্র শকুন এসে ঠুকরে ঠুকরে মেরেই ফেলল ওর মাকে। বিনা দোষেই এমন জুলুম করল হিংস্র শকুনের দল। কত আদরযত্ন করত মা ওকে! নিজ হাতে খাইয়ে দিত, গোসল করিয়ে দিত। আরও কত খোঁজখবর রাখত ওর! মা মারা গেলে কার আবার মন খারাপ থাকে না বলো? তাই তো মন খারাপ ছোট্ট চড়ুইছানার। কিন্তু চড়ুইছানা অমন মন খারাপ করে বসে থাকলে যে পুরো বনটাকেই মরা মরা লাগে।
না, না। যে করেই হোক চড়ুইছানার মন ভালো করতেই হবে। মনে মনে ভাবল মিষ্টি কোকিল। বিকেলে বনের সব পশুপাখিরা পরামর্শে বসল। কে ভালো করতে পারবে চড়ুইছানার মন? সবাই নিজ নিজ মত প্রকাশ করল। কেউ বলল, চালাক শেয়ালকে এ দায়িত্ব দেওয়া হোক। কেউ বলল, বাঘমামা ভালো পারবে এ কাজ। কেউ বলল টিয়েপাখির কথা। কেউ আবার দুষ্ট ইঁদুরের কথাও বলল। অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, টিয়েপাখিই যাবে চড়ুইয়ের মন ভালো করতে। সিদ্ধান্তমতো, পরদিন সকালে টিয়েপাখি গেল চড়ুইছানার কাছে। দেখল আগের মতোই সে মন খারাপ করে বসে আছে।
টিয়েপাখি বলল, এই যে চড়ুই মা! আর কত মন খারাপ করে থাকবে হ্যাঁ?
চড়ুই কোনো সাড়া দিল না।
টিয়েপাখি এবার বলল, দেখ চড়ুই মামণি! এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বাঁচে না। সবাইকে একদিন না একদিন ঠিকই চলে যেতে হয় পৃথিবী ছেড়ে। আজ তোমার মায়ের মৃত্যুতে এত ভেঙে পড়ছ কেন তুমি? এই যে আমার দিকে তাকাও, আমার মাও কিন্তু বেঁচে নেই। চলে গেছেন পরপারে। তখন আমি তোমার থেকেও ছোট। আমি কিন্তু তোমার মতো এত হতাশ হইনি। ধৈর্য ধারণ করেছিলাম। তাহলে তুমি কেন এত হতাশ হচ্ছো বলো?
চড়ুইছানাটি একটুখানি মাথা উঠাল এবার।
টিয়েপাখি বলেই যাচ্ছে। ‘এই যে গত রবিবারেই তো শালিকছানার মা মারা গেল। তোমার মায়ের মৃত্যুর ঠিক এক দিন পরে। কই সে তো এখন ঠিকই মন খুলে হাসে। সে তো তোমার মতো ধৈর্যহারা হয়নি? তাহলে তুমি কেন এত মন খারাপ করে থাকবে? দেখ চড়ুই তুমি হাসিখুশি থাকলে পুরো বন হাসিখুশি থাকে। প্লিজ একটু হাসো মামণি।
এবার মন ভালো হলো চড়ুইয়ের। সে বুঝতে পারল টিয়েপাখি যা বলছে ঠিকই বলেছে। তাই চড়ুইছানা আর মন খারাপ করে থাকল না। হেসে উঠল মন খুলে। মুখ ফুটে কথাও বলল। সারা বনে আবার সুখ ফিরে এলো। এখন সবার মন আনন্দে ভরপুর। সবাই ধন্যবাদ জানাল টিয়েপাখিকে।
আব্দুস সবুর
শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি
আওলাকান্দি ই. এম. উচ্চ বিদ্যালয়, সারিয়াকান্দি, বগুড়া
