কনডেম সেল মানে কারাগারের ভেতর আরেক কারাগার। মৃত্যুযন্ত্রণায় ভীত মানুষের কথা বিবেচনা করে একে ‘মৃত্যু সেল’ও বলেন অনেকে। এই মুহূর্তে দেশের কারাগারে ফাঁসির সেলগুলোতে আসামি আছেন আড়াই হাজারের বেশি। এর মধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি হলেন ৮৬ জন। এই পরিসংখ্যান আমাদের কারা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এদের সবার মামলা বিচারাধীন। তবে, ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) মামলা নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালতে ধীরগতি রয়েছে। কমপক্ষে ৫ বছরের আগে কোনো ফাঁসির মামলা নিষ্পত্তির নজির নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময় আসামির শারীরিক এবং মানসিক ভয়ংকর শাস্তির দায় শুধুই কি অপরাধীর? নাকি অন্য কারও! এই যে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ মৃত্যুযন্ত্রণাকে সাথী করে একজন আসামি যখন নিরপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হন, তখন কি সেই মানুষকে (আসামি) যিনি অপরাধী হিসেবে মামলা করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়? সংশ্লিষ্টরা কি কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন?
সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ‘ফাঁসির দিন গুনে এক নারীর ২৪ বছর’ প্রতিবেদন। জানা যাচ্ছে, ২৬ বছর আগে হত্যা মামলায় শরীফা বেগম যখন কারাগারে যান, মেয়ে সূচী আক্তারের বয়স তিন মাস। কারাগারে কয়েকবার মাকে দেখলেও কখনো ছুঁয়ে দেখা হয়নি তার। মায়ের স্নেহ বোঝার আগেই মায়ের বুকে জড়িয়ে থাকার সুখানুভূতি কেমন তাও জানা নেই। একই অবস্থা মা শরীফারও। কারাগারে যাওয়ার পর আর কখনো সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরা হয়নি তার। কারণ ৫৫ বছরের জীবনের প্রায় ২৪ বছরই ‘মৃত্যু সেলে’ থাকা শরীফার মামলার বিচারই এখনো শেষ হয়নি। ১৯৯৮-এ গ্রেপ্তারের পর ২০০০ সালের অক্টোবরে বিচারিক আদালতে তার ফাঁসির রায় হয়। সেই থেকে তিনি ফাঁসির সেলে (কনডেম সেল) বন্দি। ২০০৩ সালে হাইকোর্টে তার সাজা বহাল থাকে। এরপর ২১ বছরেও তার আপিল নিষ্পত্তির তথ্য মেলেনি। এই দীর্ঘ সময় ফাঁসির সেলে থাকা শরীফার কথা আদালত, কারা কর্র্তৃপক্ষ, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় কারও মনে আসেনি। এই নারী জানতে পারেননি তিনি দোষী না নির্দোষ। আর্থিক অসংগতি ও মুক্তির সম্ভাবনা নেই মনে করে শরীফার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ কমে গেছে। শরীফার ছেলে, মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, তাদের মাকে এ মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। মায়ের বিষয়টি তারা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। শেখ জাহিদ নামে খুলনার এক ব্যক্তি ২০ বছর ফাঁসির সেলে থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট আপিল বিভাগের আদেশে খালাস ও পরে মুক্তি পান। দেশের কারাগারের কনডেম সেলে এই ধরনের নিরপরাধ ফাঁসির আসামি আরও রয়েছেন কি না, আমাদের জানা নেই। তবে এ ব্যাপারে হয়তো বিস্তারিত খোঁজখবর নিলে আরও আসামি চিহ্নিত হতে পারেন।
ফাঁসির আসামির মামলার দীর্ঘসূত্রতার কোনো কারণ আমরা দেখি না। যদি অপরাধ হয় ফাঁসি দেওয়ার মতন, তাহলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি দরকার। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি এমন হয়, বাদী অনেক আগেই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন আর বিবাদী (আসামি) দীর্ঘ বছর কারাভোগের পর ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হলেন, তখন সেই বাদীর অপরাধের শাস্তি কে ভোগ করবে? এমন বহু মামলায় বিচারিক আদালতে ফাঁসি কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় আসামিদের। তবে এসব দণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই আর টেকে না হাইকোর্ট কিংবা আপিল বিভাগে। দেখা গেল, এই ধাপগুলো পার করতেই চলে গেছে ২০-২৫ বছর! তাহলে কি বিচারিক আদালতের রায়ে কোনো ভুল থাকে নাকি রাষ্ট্রপক্ষেরও কোনো দুর্বলতা রয়েছে শুনানিতে? যদি খালাসই পান তাহলে কনডেম সেলের মতো বিশেষায়িত যন্ত্রণাদায়ক সেলে কেন তাকে বছরের পর বছর পার করতে হবে? সমাধানই বা কী? সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং সরকারের কাছে নিশ্চয়ই আইনি ব্যাখ্যা আছে। আমরা দেখতে চাই, এর স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সুষ্ঠু প্রয়োগ হচ্ছে। অবশ্য ফাঁসির আসামির মামলাই যেখানে নিষ্পত্তি হচ্ছে না, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে সেই আশা না করাই ভালো।
