বাইসাইকেল কিক ফুটবলের সবচেয়ে দর্শনীয় দৃশ্য

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪, ০১:৫৫ পিএম

ইউরোর শেষ ষোলোর ম্যাচে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের তখন ত্রাহি অবস্থা। এক গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচটির ৯০ মিনিট শেষ হয়ে গেছে। যোগ করা ৬ মিনিট সময়েরও পেরিয়ে গেছে মিনিট চারেক। বাংলাদেশের সমর্থকরা নিজেদের ঘরোয়া ফুটবলে যে দৃশ্যের সঙ্গে খুব পরিচিত, তেমনি ঘটনা ঘটল জার্মানির গেলসেনকির্চেনে। কাইল ওয়াকার লম্বা থ্রো করে বল ফেলেন বক্সে। সেটি হেড দিয়ে বক্সের মাঝামাঝি পাঠান মার্ক গুয়েহি। সেখান থেকে চোখের তৃপ্তি মেটানো এক বাইসাইকেল কিকে নিশানা ভেদ করেন জুড বেলিংহ্যাম। হ্যাঁ, বাইসাইকেল কিক, ফুটবলে যা ওভারহেড কিংবা সিজার কিক নামেও খুব জনপ্রিয়। কালে-ভদ্রে দেখা মেলে যে শটটির। সেই বাইসাইকেল কিকে গোল করে ম্যাচ বাঁচিয়ে রাখেন বেলিংহ্যাম। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচটিতে অধিনায়ক হ্যারি কেইন গোল করে কোয়ার্টার নিশ্চিত করেন গতবারের রানারআপ দলটির।

ফুটবলের ভীষণ জনপ্রিয় একটি নৈপুণ্য এ বাইসাইকেল কিক। এই অ্যাক্রোবেটিক শটটি নেওয়ার জন্য একজন খেলোয়াড় লাফিয়ে শূন্যে ভেসে থাকা অবস্থায় বলটিকে শট মারেন এবং মাথার ওপর দিয়ে পেছনে পাঠান। তাই একে ‘ওভারহেড কিক’ও বলা হয়। বিশেষ এই কিকটি করার জন্য টাইমিং ও স্কিল দুইয়ের নিখুঁত সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। খেলোয়াড়দের জন্য কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এ শটটি। বাতাসে ভেসে কিক করার পর পড়ে গিয়ে থাকে ফুটবলারদের আহত হওয়ার আশঙ্কা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফুটবলে কবে থেকে প্রচলন ঘটেছে এ বাইসাইকেল কিকের! বাইসাইকেল কিকের জনক কে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে ফুটবল বিশ্বে। উরুগুয়ের বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোর মতে, চিলিয়ান পোর্ট টালকাহুয়ানায় ১৯১৪ সালের একটি ম্যাচে রেমন উনজাগা প্রথম এ শট উদ্ভাবন করেন। ২০১৪ সালে ওই ম্যাচে শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সেখানে উনজাগার বাইসাইকেল কিকটির একটি ভাস্কর্যও স্থাপন করা হয়েছে। যার ভাস্কর মারিও অ্যাঞ্জেলো। অন্য গল্পও রয়েছে। আর্জেন্টাইন সাংবাদিক জর্জ ব্যারাজ্জার মতানুসারে ১৮৯২ সালে পেরুর ক্যালাও পোর্টে আফ্রিকান খেলোয়াড় ক্যালাকো ব্রিটিশদের সঙ্গে এক খেলায় এই বিশেষ কিকটি প্রদর্শন করেন। তবে বাইসাইকেল কিকে গোল করা প্রথম নথিভুক্ত ফুটবলার হলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে। ১৯৬৮ সালে তিনিই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাইসাইকেল কিকের মাধ্যমে গোল করেন। কিকটি জনপ্রিয়ও হয় তার সুবাদে।

গত এক যুগে বাইসাইকেল কিকে জাল ভেদ করেছেন একাধিক ফুটবলার। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হন পর্তুগাল মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তখন তিনি রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়। চ্যাম্পিয়নস লিগের ২০১৮ আসরে জুভেন্তাসের বিপক্ষে তার ওই চোখধাঁধানো শটে বিমুগ্ধ হতে হয়েছিল ফুটবল বিশ^কে। জুভেন্তাসের কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইগি বুফনও চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন সেই শটে বলের জালে জড়ানোর দৃশ্য। বিবিসির ফুটবল বিশ্লেষক প্যাট নেভিন ওই গোলটি নিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগের নয়, ফুটবলের সেরা গোলগুলোর অন্যতম।’

রোনালদোর দেখাদেখি ওই আসরের ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে গ্যারেথ বেলও নিজেকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করিয়ে নেন বাইসাইকেল কিকে গোলদাতা হিসেবে। রিয়াল ফুলব্যাক মার্সেলো ডান পায়ে দুর্বল একটি ক্রস বাড়িয়ে ছিলেন। রোনালদো ও বেনজেমাকে সামলাতে থাকা লিভারপুল ডিফেন্ডারদের ফাঁক দিয়ে কোণ তৈরি করে হাওয়ায় ভেসে ওঠেন বেল। বাঁ পায়ে নেন সেই বিখ্যাত কিকটি। যার ফলে বল গিয়ে থামে লিভারপুলের জালে।

২০২২ বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বাইসাইকেল কিকের দেখা মেলে পেলের উত্তরসূরি রিচার্লিসনের পায়ে। ম্যাচের ৭২ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাছ থেকে পাওয়া বলটি খুব ঠাণ্ডা মাথায় রিসিভ করেন তিনি। এরপর হাফ টার্নে নিজেকে খোলেন এবং হাওয়ায় ভেসে স্বপ্নের একটি গোল উপহার দেন। ৭৮ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠ ছাড়ার সময় গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিল তাকে।

বাইসাইকেল বা ওভারহেড কিকের গোলদাতাদের তালিকায় ওয়েইন রুনি,জলাতান ইব্রাহিমোভিচ, রিভালদো, ফিলিপ মেক্সেস, এমরি ক্যান, ট্রেভর সিনক্লেয়ার, মার্কো ফন বাস্তেন, আলেহান্দ্রো গারনাচোদের সঙ্গে রয়েছে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির নামটিও। ২০২২ সালে পিএসজির খেলোয়াড় হিসেবে ক্লেরমঁ-এর বিপক্ষে ম্যাচে দূর থেকে পাওয়া বল বুক দিয়ে রিসিভ করে একই ফ্লোতে শূন্যে ভেসে কিক করে জালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মেসি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত