একটা ভিডিও অনেক শেয়ার হচ্ছে। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য। সর্বজনীন পেনশন চালুর ঘোষণা দিতে গিয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করছেন, এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে তাদের জন্য, যাদের জন্য কোনো রকম অবসরভাতার ব্যবস্থা নেই। যারা পেনশনের আওতাভুক্ত আছেন, তাদের জন্য এটা প্রযোজ্য হবে না। যে ‘সর্বজনীন’ পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে এই মুহূর্তে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে আছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য অনুসারে তো সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য হওয়ারই কথা নয়; কেননা সেখানে অবসরভাতার সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু রয়েছে। তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই তথাকথিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা এত জরুরি হয়ে পড়ল?
বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশনের এই ব্যবস্থাটি চালুর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে হয়তো খানিকটা আভাস পাওয়া যেতে পারে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সব শ্রেণির নাগরিকের জন্য একটি অবসরভাতা প্রচলনের। এর অনেক দিন পরে, ২০১৬ সালের ৩০ জুন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন ও দেশের পেনশন ব্যবস্থা সংস্কারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তবে এ নিয়ে সত্যিকার অর্থে কাজ শুরু হয় অবশ্য আরও তিন বছর পর, ২০১৯ সালের বাজেট বক্তৃতায় এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বছরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সেল এ নিয়ে কাজ শুরু করে। এ নিয়ে প্রস্তুতকৃত কৌশলপত্রটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেন এবং দ্রুত এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেন। আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয় ওই বছরেরই মার্চ মাসে এবং জাতীয় সংসদে অনুমোদনের পর ১৩ আগস্ট তারিখে আইনটি গেজেটভুক্ত হয়।
কী আছে এই আইনে? আইনটি কাদের জন্য প্রযোজ্য সেটা ব্যাখ্যা করা হয়েছে ধারা ১৪ (২)-এ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতিতে সরকারি অথবা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করিতে পারিবে....।’ লক্ষণীয়, এই ধারায় ‘করিতে পারিবে’ বলা হয়েছে, ‘করিতে হইবে’ নয়। অর্থাৎ, আইন অনুসারে এই পদ্ধতি কোনো সংস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, এটা ঐচ্ছিক।
গেজেট অনুসারে এই পদ্ধতিতে যে চারটি স্কিমের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ছিল প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা। স্কিমগুলো যথাক্রমে প্রবাসী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময় অর্থ মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে প্রত্যয় নামের এই নতুন স্কিম চালু করে; যেখানে আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল করে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন এই স্কিমের আওতায় আনার কথা বলা হয়। এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত কেবল তখনই নেওয়া যৌক্তিক হতে পারে, যদি সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, দেশের সামগ্রিক পেনশন ব্যবস্থারই সংস্কার করবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলাবস্থা শুরুর পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা এবং এ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে সরকার সত্যি সত্যিই সে রকম একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
কিন্তু সরকারের এত বড় একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত কি এভাবে নেওয়া যায়? সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আইনটি তৈরি করতে গিয়ে যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে, একটি খসড়া প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে আইনটি পাস হয়েছিল। সেই আইনের ধারা বদলে এ রকম একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় একা একাই নিতে পারে? সরকারের যে কোনো নীতি তৈরি করতে হলে আসলে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। হাতে থাকতে হয় পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, যার আলোকে এই নীতির সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে গবেষণা করে, তবেই এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু যারা এই নীতিগত সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন, তাদের কথাবার্তা শুনে মোটেই মনে হচ্ছে না এ ধরনের কোনো প্রক্ষেপণ তারা করেছেন। জাতীয় পেনশন কর্র্তৃপক্ষের একজন সদস্য গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, এই ব্যবস্থা প্রচলন হলে মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাবেন, এমন ধারণা নাকি অমূলক। কারণ? তার ভাষায়, ‘মেধাবীরা সব পেশাতেই আছেন। এটা আসলে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। অনেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও শিক্ষকতা পেশায় যান না.... পড়াশোনা বেশি করেও অনেক ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে অনেকে ব্যবসা করছেন, তাদের আপনি মেধাবী বলবেন না? সুতরাং এটা কোনো কাজের কথা না।’ এই জ্ঞান নিয়ে যদি কেউ সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে বসেন, তার তৈরি করা নীতি তো এ রকমই হবে!
শিক্ষকদের আন্দোলন শুরুর পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আবার একটা ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। সেই ব্যাখ্যায় তো বটেই, সরকারের আমলা এবং মন্ত্রীরাও বলছেন, এই ব্যবস্থা সম্পর্কে নাকি শিক্ষকরা ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছেন, আসলে এই ব্যবস্থায় আগের চেয়েও নাকি লাভ হবে। ছেলেভুলানো কিছু হিসাবও প্রকাশ করে যাচ্ছেন তারা। আর ওই হিসাব দেখেই আরও নিশ্চিত করে বলা যায়, হয় তারা আসলে সাধারণ পাটিগণিতটাও করতে জানেন না, নইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই মূর্খ বলে মনে করেন।
একটা সরল হিসাব থেকেই বিষয়টা জলের মতো পরিষ্কার বোঝা যায়। এই মুহূর্তে একজন অধ্যাপকের বেতন নির্ধারিত হয় সরকারের বেতন স্কেলের তৃতীয় ধাপে। সেকেন্ড গ্রেডে তিনি যদি না-ও যান, অবসরের সময় থার্ড গ্রেডের সর্বোচ্চ ধাপে তার বেতন থাকে ৭৪,৪০০ টাকা। অন্যান্য পাওনার কথা বাদ দিই। বর্তমান নিয়মে অবসরের সময় তার শুধু হিসাবে আনুতোষিক পাওনা দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮০০ টাকা। এই টাকার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ তিনি নগদায়ন করতে পারেন, অর্থাৎ ৭৭ লাখ ৪০০ টাকা নগদ বুঝে নিতে পারেন; নিলে তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন অবশিষ্ট আনুতোষিক থেকে প্রতি মাসে অবসরকালীন বেতনের অর্ধেক মানে ৩৭,২০০ টাকা+চিকিৎসা ভাতা পাবেন। প্রতি বছর এই টাকার ওপর ৫% ইনক্রিমেন্ট হবে। ইনক্রিমেন্টটা বাদ দিই। ওই ৭৭ লাখ টাকা যদি তিনি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, তাহলে প্রতি মাসে মুনাফা পাবেন ৬৭ হাজার টাকা। এবার দুটি অঙ্ক যোগ করুন, যোগফল ১ লাখ ৪ হাজার টাকার কিছুটা বেশি। সহজ হিসাবে একদম বর্তমান টাকার মানে অবসরের পর একজন শিক্ষক, পেনশন হিসেবে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা নগদ পেতে পারেন, সেই সঙ্গে তার হাতে নগদ বিনিয়োগকৃত ৭৭ লাখ টাকা থেকে যাবে। এ জন্য কিন্তু তার বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা যাবে না। ধরা যাক, তিনি বেতন থেকে মাসে ৩ হাজার টাকা বাঁচিয়ে একটি জীবন বীমা পলিসি করলেন। সে ক্ষেত্রে ৩০ বছর পর তিনি প্রতি মাসে অন্ততপক্ষে আরও ২৫ হাজার টাকা পেতে পারেন ওই পলিসি থেকে। সব মিলিয়ে অঙ্কটা দাঁড়াল কত? ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে প্রত্যয় স্কিমের আওতায় একজন শিক্ষক যদি বছরে ৫ হাজার টাকা করে জমা করেন (স্কিমে বলা আছে বেতনের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজারের মধ্যে যেটা কম সেই পরিমাণ অর্থ জমা রাখা যাবে) তাহলে একদিকে বর্তমানের চেয়ে তিনি মাসে দুই হাজার টাকা কম বেতন পাবেন (প্রত্যয়ের চাঁদা ৫০০০-বীমার চাঁদা ৩০০০) কিন্তু ৩০ বছর পর অবসর নিলে মাসে পাবেন ১ লাখ ২৬ হাজার চারশ টাকা। মানে বর্তমানের বেতন স্কেলেই মাসিক লোকসান চার হাজার টাকা; ৩০ বছর পর টাকার মানে অবচয় ধরলে সেটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? শুধু তা-ই নয়, বর্তমান ব্যবস্থায় তার হাতে নগদ ৭৭ লাখ টাকা থাকবে, তিনি মারা গেলে যেটা তার উত্তরাধিকারী পাবেন।
এই সহজ হিসাবটা বুঝতে কিন্তু গণিতবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার যদি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেই থাকে যে, এখন থেকে সব সরকারি কর্মচারীকেই এ ধরনের কন্ট্রিবিউটরি পেনশনের আওতায় যেতে হবে; তাহলে অন্তত হিসাব কষে কর্মচারীদের যেন লোকসান না হয় সেই ব্যবস্থা তো নিতেই হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, স্কিমটা নতুন তাই নাকি ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। তাহলে সেই ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রেখে, তড়িঘড়ি করে কেন এটা চাপিয়ে দিতে হবে? অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, শিক্ষকদের প্রচলিত বেশ কিছু সুবিধা চালু রাখা হবে, এ জন্য নাকি আইন সংশোধন করে নিলেই হবে! এই ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায়, আসলে কতটা তড়িঘড়ি করে এই নতুন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন এমনিতেই এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বনিম্ন। তার ওপর রাজনীতির মারপ্যাঁচসহ নানা কারণে মেধাবীরা এখনই আগ্রহ হারাচ্ছেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে। পিএইচডি করতে বিদেশে গিয়ে কাজের সুযোগ পেলে অনেকেই যে আর ফিরে আসছেন না, এই তথ্য কি পেনশন কর্র্তৃপক্ষের কাছে আছে? তারা কি কখনো বিবেচনা করে দেখেছেন, বিসিএস পরীক্ষায় কোটা রাখার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনটা কেন এত জোরালো হচ্ছে? গত কিছুদিন ধরে সুযোগ-সুবিধায় নানা বৈষম্য তৈরি করে বিসিএস-ক্যাডারের চাকরিটাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এখন সবাই ওই চাকরিটাই পেতে চায়। সেখানে সীমিত সুযোগকে আরও সীমিত করার বিরুদ্ধে তাই এমন জোরালো বিক্ষোভ। সরকারের ভুল নীতিই আসলে একই সঙ্গে শিক্ষক ও ছাত্র সমাজকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
